image

সোমেন চন্দ

সমাজ পরিবর্তনের কথাশিল্পী

শেখ রফিক

সোমেন চন্দ। বাংলা সাহিত্যের তিন উদীয়মান তরুণ সাহিত্যিকের একজন। সুকান্ত কবি হিসেবে, সোমেনচন্দ আধুনিক কথাশিল্পের স্থপতি হিসেবে এবং খান মোহাম্মদ ফারাবী উভয়কে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই তিন সাহিত্যিকের কেউই ২২ বছরও বাঁচতে পারেননি। অর্থাৎ ২২ বছরের পূর্বে, ২১-এর ঘরে তাদের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। সোমেন চন্দকে হত্যা করা হয়। আর অন্য দু’জন মরণব্যাধি যক্ষ্মা ও ক্যান্সারে মারা যান।

তারুণ্যের গান, সৃষ্টির উন্মাদনা ও বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন সোমেন চন্দ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সোমেন নচন্দ সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি’।

সোমেন চন্দ অন্যায়, অত্যাচার, অসঙ্গতি ও অসহায়ত্বের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন। রাজপথে শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আর লেখালিখির মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে আনার অবিচল প্রত্যয়ে তিনি ছিলেন ইস্পাতদৃঢ়। সোমেন চন্দের সাহিত্যের বিস্তার কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে ঘিরে। শোষণ-বৈষম্য থেকে মানুষকে মুক্ত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে নিয়েজিত করেন সেই শৈশব থেকে। ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। সোমেন চন্দের সাহিত্য সৃষ্টি হতাশাগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে জাগ্রত করে নতুন উদ্যমে পথ চলতে সহায়তা করে।

বিপ্লবী রোমান্টিসিজম বা প্রথাগত কমিউনিজমের ফ্যাশনের মোড়কে নয়, সত্যিকারার্থে কমিউনিজম ছিল তার প্রেরণা। কমিউনিজমের দর্শনের আলোয় চেতনাকে শান দিতেন প্রতিনিয়ত। কমিউনিজমই ছিল তার মূল জীবনদর্শন। কলম ছিল তার সংগ্রামের পাথেয়। আর খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ ছিল তার বেঁচে থাকার প্রেরণা ও সৃষ্টির মৌলিক কাঁচামাল। খাঁটি কমিউনিস্ট বলতে যা বোঝায়, সোমেনচন্দ ছিলেন তাই।

নির্মল ঘোষকে লেখা এক পত্রে সোমেন জানিয়েছিলেন, ‘আর এই বিপ্লবের অনুভূতি কেবল আমার নয়। আরো অনেক সাহিত্য-সেবকের মনেই জেগেছে মনে হয়, তার মধ্যে অনেকেই প্রকাশ করতে পারছেন, বা অনেকেরই কণ্ঠ ক্ষীণ হয়ে গেছে তথাকথিত সাহিত্য ডিক্টেটরদের গোলমালে। কিন্তু সেই অনুভূতির অস্তিত্ব আছে অনেকের মনেই। এইসব দেখে মনে হয়, আগামী দশ বছরে বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস হবে একটা উজ্জ্বল অধ্যায়, এটা একটা বৈপ্লবিক অপূর্ব সৃষ্টি’।

সোমেন চন্দের জন্ম ১৯২০ সালের ২৪ মে, মাতুলালয়ে। ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে। তবে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সোমেনচন্দ (জীবনী গ্রন্থমালা) বইয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন- ‘সোমেন চন্দের জন্ম কেরানীগঞ্জ থানার অধীনস্থ পারজুয়ার এলাকায় অবস্থিত ধিতপুর গ্রামে’। তার বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দ। আর মায়ের নাম হিরণবালা। সোমেন চন্দের পিতামহের নাম রামকুমার। নরেন্দ্রকুমার চন্দের আদিনিবাস ছিল ঢাকার নরসিংদী জেলার বালিয়া গ্রামে।

নরেন্দ্রকুমার চন্দ ঢাকার মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতালের স্টোরস বিভাগে চাকরি করতেন। মা হিরণবালা। তিনি ছিলেন কেরানীগঞ্জের মেয়ে। মাত্র ৪ বছর বয়সে সোমেন চন্দ তার মাকে হারান। হিরণবালার মৃত্যুর পর নরেন্দ্রকুমার শিশু ছেলে সোমেনকে লালন-পালনের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তিন মাইল পশ্চিমে ‘ধউর’ গ্রামের ডা. শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা সরযূদেবীকে বিয়ে করেন। সোমেন এই সৎ মা সরযূদেবীকে মা বলে জানতেন। আর সরযূদেবীও সোমেনকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে বড় করেছেন। পিতার চাকরির কারণে ঢাকায়ই সোমেনের বেড়ে ওঠা। এখানেই তার শৈশব-কৈশর ও মানস চেতনা গড়ে ওঠে। সোমেনচন্দ শহরের বাইরে অর্থাৎ গ্রামে একনাগাড়ে কখনো বসবাস করেননি। তবে মাঝে মাঝে তিনি মামা বাড়ি ‘ধউর’ গ্রামে বেড়াতে যেতেন। তার শৈশব-কৈশোরের বেশ সময় কাটে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে।

সোমেন চন্দের পড়াশোনার হাতেখড়ি পরিবারে। বিশেষ করে বাবার কাছে। তারপর অশ্বিনীকুমার দত্ত মহাশয়ের কাছে পড়েন। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে ১৯৩০ সালে তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেয়া হয় পুরান ঢাকার পোগোজ হাই স্কুলে। এই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন ঢাকা মিটর্ফোট মেডিক্যাল স্কুলে। কিন্তু খারাপ স্বাস্থ্যের কারণে পড়াশোনা আর চালিয়ে যেতে পারেননি।

১৯৩৫ সালের নভেম্বরে লন্ডনে ভারতীয় ও ব্রিটিশ লেখকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ই. এম ফরস্টার, হ্যারল্ড লাস্কি, হার্বাট রিড, রজনী পাম দত্ত, সাজ্জাদ জহির, মূলক রাজ আনন্দ, ভবানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। নানা আলোচনার পর তারা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন ডিসেম্বরে। এরই সূত্র ধরে ভারতে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়। চার বছর পর ঢাকায় স্থাপিত হয় এর শাখা। লন্ডন বৈঠকে সাহিত্যিকরা এ সংগঠনের নাম ‘প্রগতি সাহিত্য সংঘ’ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যখন ইশতেহার প্রকাশিত হয় তখন প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুন্সী প্রেমচান্দ। সভায় সংগঠনের নামকরণ করা হয় ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এর সভাপতি নির্বাচিত হন প্রেমচান্দ, সম্পাদক সাজ্জাদ জহির।

১৯৩৭ সালে সোমেন চন্দ প্রত্যক্ষভাবে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ওই সময় তিনি কম্যুনিস্ট পাঠচক্রের সম্মুখ প্রতিষ্ঠান প্রগতি পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। তিনি ও তার পরিবার এসময় শহরের দক্ষিণ মৈশ-িতে থাকতেন। প্রগতি পাঠাগার-এর পরিচালক হন তিনি ১৯৩৮ সালে। তিনি বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর মতো আজীবন বিপ্লবী শিক্ষকের রাজনীতি ও দর্শনের পাঠ নেন। রণেশ দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, ম্যাক্সিম গোর্কী, মোপাঁসা, রঁলা, বারবুস, জিদ, মারলো, কডওয়েল রালফ্ ফক্সসহ আরো অনেকের লেখা বই পড়েন। তিনি রালফ্ ফক্স নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেটি নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

রালফ্ ফক্সের নাম শুনেছো?

শুনেছো কডওয়েল আর কনফোর্ডের নাম?

ফ্রেদরিকো গার্সিয়া লোরকার কথা জান?

এই বীর শহীদেরা স্পেনকে রাঙিয়ে দিল,

সবুজ জলপাই বন হলো লাল,

মার বুক হলো খালি-

তবু বলি, সামনে আসছে শুভদিন।

চলো, আমরাও যাই ওদের রক্তের পরশ নিতে,

ওই রক্ত দিয়ে লিখে যাই

শুভদিনের সংগীত।

১৯৪১ সালের ২২ জুন। হিটলার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। বিশ্বযুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। এ সময় ভারত উপমহাদেশের প্রগতিবাদী জনতা ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সংগ্রামরত দেশপ্রেমিক সোভিয়েত যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তির লক্ষে হীরেন মুখোপাধ্যায় ও স্নেহাংশু আচার্যকে আহ্বায়ক করে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে বঙ্গদেশে গড়ে উঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে গড়ে উঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও দেবীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই সমিতির প্রধান প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটা অন্যতম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অগ্রগতি প্রসঙ্গে চিত্র প্রদর্শনী করা। এই প্রদর্শনীতে প্রগতি লেখক সংঘের সোমেন চন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য। তার অবিরত শ্রমের কারণে ঢাকায় অল্পদিনের মধ্যে প্রগতি লেখক সংঘ ও সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি ফ্যাসিবাদবিরোধী জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন, ‘সোমেন হত্যার ব্যাপারটি, বিশেষ করে তখনকার পটভূমিতে এবং প্রেক্ষিতে এই হত্যাকা- গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী। সোমেন ছিলেন সে সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সোভিয়েত সুহৃদ সমিত, আর প্রগতি লেখক সংঘের অনেকখানি’। ১৯৪২ সালে সোমেনচন্দের মৃত্যুর পর কলকাতায় সম্মেলনের সময় প্রগতি ‘লেখক সংঘের’ নামকরণ হয় ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় আবার এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’।

সোমেন চন্দের মৃত্যু সম্বন্ধে সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিচারণ, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়েপড়ে,যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিল অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবী, লেখক এক ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে যান। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়এবং রাজনৈতিক মহল প্রায়তিন ভাগে বিভক্ত হয়েপড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয়যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয়যারা মোটামুটিভাবে তুষ্টিভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয়দলে ছিলেন জাতীয়বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেনচন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। কিন্তু এই হত্যাকা-ের পরও যথারীতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়এবং আমাদের প্রতি আরও লোক আকৃষ্ট হয়।’

১৯৪২-এর ৮ মার্চ ঢাকায় এক সর্বভারতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করা হয়। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী কিছু দল এ সম্মেলন বিঘিœত করার চেষ্টা করে। রেল শ্রমিক সাধারণ সম্পাদক সোমেন চন্দ রেল শ্রমিকদের মিছিল নিয়ে তখন সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। ওই দিন ঢাকার সুত্রাপুরে সেবাশ্রম ও লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাস লেনের কাছে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির (আর. আস. পি) গু-ারা তার ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।

‘সোমেন চন্দ ছিলেন ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে। হিটলার-মুসেলিনী ফ্যাসিস্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিল পৃথিবীকে শাসন করার জন্য। তারা স্পেনের ফ্যাসিস্ট ফ্র্যাঙ্কোর সঙ্গে সে সময়ে মিত্রতা গড়ে তোলে। এই ফ্যাসিস্ট চক্রের হাতেই সোমেন চন্দ শহীদ হয়। সোমেনের তাজা রক্ত ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করে আন্দালুশিয়া আর স্পেনের রাজপথের সঙ্গে মিত্রতা গড়ে তোলে’- চৌধুরী সুধীর নাথ।

প্রগতি লেখক সংঘের নেতৃত্বে ১৯৪১-এ ঢাকায় তৈরি হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠন- সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি। একপর্যায়ে তিনি এ সমিতির অন্যতম সক্রিয় সংগঠক হয়ে ওঠেন। ওই বছর সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রগতি লেখক সংঘের প্রধান সংগঠক ছিলেন তিনি। সংঘের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক বৈঠকগুলোতে নিয়মিত লেখা উপস্থাপনের তাগিদ থেকেই তার সাহিত্যচর্চার বিস্তারলাভ। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে কম্যুনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নে আন্দোলনের কাজ শুরু করেন। সোমেনের স্বপ্ন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া। ১৯৪১ সালে সে স্বপ্ন তার পূরণ হয় মাত্র বিশ বছর বয়সে।

‘ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের শাখা স্থাপিত হয়েছিল একটা সন্ধিক্ষণে। শাখা স্থাপনের প্রস্তুতির মুখে ছিলেন কয়েকজন তরুণ লেখক। যারা ভাবছিলেন প্রগতি লেখক সংঘের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও গণমুখী ঘোষণাপত্র অনুযায়ী অবিলম্বে কিছু করা দরকার। যারা এ প্রয়োজন অনুভব করছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে তরুণ বয়সী ছিলেন সোমেন চন্দ, যার বয়স তখন আঠারো আর সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন সতীশ পাকড়াশী বাংলার অগ্নিযুগের পথিকৃৎদের একজন, যার বয়স সে সময়ে পঁয়তাল্লিশ অতিক্রম করেছে। সোমেনের দুই সমবয়সী বন্ধু একেবারে গোড়ার দিকে উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন। একজন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অতি আধুনিক কবিতা লিখে নাম করেছিলেন অপরজন অমৃত কুমার দত্ত। এদের সঙ্গে একত্রিত হয়েছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, তার বয়স তখন ২৭। ‘পুরানো ঢাকা শহরের দক্ষিণ মৈত্রী মহল্লায় প্রগতি পাঠাগার ছিল সংঘের প্রথম কেন্দ্র’-রণেশ দাশগুপ্ত।

১৯৪০ সালের মাঝামাঝি গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে সম্মেলন করে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কাজী আবদুল ওদুদ। রণেশ দাশগুপ্ত সংগঠনের সম্পাদক ও সোমেনচন্দ সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সোমেনচন্দের লেখক জীবনের পরিধি মাত্র পাঁচ বছরের ১৯৩৭-৪২ সাল পর্যন্ত। ২৬টি গল্পের রচনাকাল, বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে গল্পগুলোকে দুটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে- প্রাথমিক পর্ব ১৯৩৭-৩৯ সাল এবং ১৯৩৯-৪২ সাল মৃত্যুকাল পর্যন্ত। প্রথমকাল পর্বে আমরা তার গল্পগুলোর মধ্য বিভুতিভূষণের কিছুটা প্রভাব দেখতে পাই। আর দ্বিতীয় পর্বে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ২৬টি গল্প, একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, তিনটি কবিতা, দুটি একাঙ্কিকা, আটটি চিঠি। বিভিন্ন পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তার আরও কিছু রচনা। কিন্তু পত্রিকাগুলো দুষ্প্রাপ্য। ফলে এসব রচনা আজও উদ্ধার করা যায়নি।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সোমেনচন্দ পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন বিপ্লবে। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবেই রাজনীতি চলে আসে তার লেখায়। নিত্যদিনের ঘরকান্নার মধ্য দিয়ে তিনি অবলীলায় দেখিয়ে দেন শাসনযন্ত্রের কুটিল চালপ্রয়োগ, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতার সূক্ষ্ম জাল। তার সৃষ্টি চেতনার কারফিউ ভেঙ্গে জাগিয়ে দেয় মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা বলতে। যোগায় আত্মপরিচয় খোঁজার অনুপ্রেরণা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যবনিকা পতনের কিছু পরেই বিশ্বমঞ্চে তার আবির্ভাব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু তাকে প্রচ- ক্ষুব্ধ করে। আঞ্চলিক সমস্যা যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণের একটি উপাত্ত তা বলতে ‘একটি রাত’ গল্পের অবলম্বন নেন। সনাতনী মা ছেলের রাজনৈতিক মতাদর্শ বুঝে নিতে বই খুলে বসেন।

‘দাঙ্গা’ গল্পে দুই ভাইয়ের আদর্শগত বিরোধের মধ্য দিয়ে রূপক আকারে বেরিয়ে আসে উপনিবেশবাদের শেষ ছোবল জাতিগত বিভেদের ভয়াবহ চেহারাটি। দাঙ্গা গল্পের ‘অজয়’ একটি বাস্তব চরিত্র।

ওই সময় আমি এমনটাই ছিলাম। -কল্যাণ চন্দ।

ইঁদুর গল্পের ইঁদুরগুলো যেন দারিদ্র্যেরই কিলবিলে রূপ যা এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয় না। ক্রমাগত শ্রেণিস্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রত নিম্ন মধ্যবিত্তদের। নিরেট প্রেমের গল্প রাত্রিশেষেও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে শ্রেণিসংঘাত যা থেকে মুক্ত নয় আপাত সংস্কারত্যাগী বৈষ্ণবরাও।

‘অকল্পিত’ গল্পে তিনি দেখান ‘যারা রাষ্ট্রদেবতার মন্দিরের কাছাকাছি থাকেন, যারা বিশ্ব মানচিত্রে নিজের ক্ষুদ্র অবস্থান সম্পর্কে বেশ সচেতনই বলা চলে, যারা দেখতে পায় কিংবা দেখেও না দেখার ভান করে ‘আমাদের চারিদকে চাপা কান্নার শব্দ, আমাদের চারিদিকে জীবনের হীনতম উদাহরণ, খাদ্যের অভাবে, শিক্ষার অভাবে কুৎসিত ব্যারামের ছড়াছড়ি, মানুষ হয়ে পশুর জীবন-যাপন। আমাদের চারিদিকে অবরুদ্ধ নিঃশ্বাস, কোটি কোটি ভয়ার্ত চোখ, তারা যেন খুনের অপরাধে অপরাধী একপাল মানুষ’।

‘প্রত্যাবর্তন’ গল্পে তিনি গাঁয়ের কথা বলেন- ‘পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে। তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল’।

জীবনের এই স্বল্প পরিসরে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন শেষের কয়েকটি বছর। প্রতিটি রচনাতেই রয়েছে সৃষ্টিশীলতার ছাপ। তার ‘ইঁদুর’ গল্প বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইঁদুর প্রসঙ্গে লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেন, ‘সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প ‘ইঁদুর’ পড়ার পর নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘মনসুবিজন’ নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি।’

১৯৪০-এ প্রকাশিত সংঘের সংকলন ‘ক্রান্তি’তে তার বিখ্যাত গল্প ‘বনস্পতি’ প্রকাশিত হওয়া ছিল বিরল ঘটনা। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ভাল একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন, নাম-বন্যা। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি।

‘উৎসব’ গল্পে সোমেনচন্দ বলেন, ‘এমন আশ্চর্য ব্যাপার আর দেখি নাই, লোকটা সরবে রোদন করিতে লাগিল- ভেউ ভেউ ভেউ! কান্নার কয়েকটি নামই জানি, জীবনের এতগুলি বছর ধরাপৃষ্ঠে অবস্থান করিয়া কান্না সম্বন্ধে অনেক অভিজ্ঞতাই লাভ করিয়াছি, কিন্তু এটি কোন জাতীয়, তাহাই ভাবিতে লাগিলাম। অথচ পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধে অচেতন হইয়া এখন কোনো ভাবনাই যে ভাবা উচিত নয়, এই তথ্যটি অতি সহজেই ভুলিয়া যাওয়ায় সহজেই বাধাপ্রাপ্ত হইলাম। চিন্তার সূত্র ধরিয়া বেশি দূর অগ্রসর হই নাই, হঠাৎ একটা প্রকা- দীর্ঘ নিঃশ্বাসযুক্ত ফোঁপানির শব্দে সভয়ে মুখ তুলিয়া দেখি, কান্নার পর্ব সশব্দে সমাপ্ত করিয়া লোকটা এবার ফুঁপাইতেছে এবং জামার আস্তিনে চোখ মুছিতেছে।

তাড়াতাড়ি বলিলাম, দেখুন এমন করে কাঁদবেন না, ও দেখে আমারও যে ভারি কান্না পায়। ছোটবেলায় ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্রই মা হারিয়ে কত কেঁদেছি, বড়ো হয়ে পরীক্ষায় পাস করে কেঁদেছি, আর বিয়ে করে যা কেঁদেছি, তার তো তুলনাই হয় না, আর সে দিন সাহেবের সঙ্গে বচসা করে যা কেঁদেছি সে কথা মনে করে এখনও যে আমার ভয়ানক কান্না পাচ্ছে। দেখুন আমি বড়ো আর বলিতে পারিলাম না, কণ্ঠরোধ হইয়া আসিল’।

সোমেনচন্দের ‘উৎসব’ গল্পটি প্রথম মুদ্রিত হয় সিলেট থেকে প্রকাশিত ১৩৪৮ সালের স্মৃতির শরৎ সংখ্যায়। স্মৃতির সম্পাদক ছিলেন জীতেশমাধব দত্ত ও হিরন্ময় দাশগুপ্ত। স্মৃতির ১৩৪৮ সালের শারদীয় সংখ্যায় লেখকম-লীতে সোমেন চন্দ ছাড়াও ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, সুরেন্দ্র মৈত্র, অজয় ভট্টাচার্য, গোপাল ভৌমিক, জগদীশ ভট্টাচার্য, বরদা দত্তরায়, সত্যভূষণ চৌধুরী, নরেন্দ্রচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, জীতেশমাধব দত্ত ও রবীন্দ্র চৌধুরী। লেখকসূচি থেকেই স্মৃতির উচ্চমান সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কলকাতার জাতীয় শিক্ষা পরিষদ পাঠাগারের যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য সংগ্রহশালায় স্মৃতি সাময়িকীটি পাওয়া যায়।

‘মার্ক্সবাদী জীবনদৃষ্টিই সোমেন চন্দকে সমকালীন সাহিত্যিক পরিম-লে বিশিষ্ট করে তুলেছে। জীবনকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন ইতিবাচক প্রেক্ষিতে। সমকালীন সাহিত্যিকেরা দুই বিশ্বযুদ্ধের আবর্তে পড়ে জীবনের শুভ্রতা আর স্বস্তির পরিবর্তে অঙ্কন করেছেন কেবল গ্লানি, হতাশা ও যৌনতার শব্দছবি। জীবনে তারা খুঁজে পাননি আশার কোনো আলো। বিপন্ন এই যুগ ও পরিবেশে দাঁড়িয়েও সদ্য কৈশোর-অতিক্রান্ত এক যুবক জীবনকে দেখেছেন অনিমেষ আলোর দৃষ্টি দিয়ে- শত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি সাঁতার কেটেছেন জীবনের মহাসমুদ্রে, জীবনকে জয় করার জন্য। বস্তুত জীবনকে জানাই ছিল সোমেন চন্দের প্রধান ব্রত। তিনি জানতে চেয়েছেন গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনকে, যে জীবন মানুষের অগ্রযাত্রার মহাসড়ক নির্মাণে এগিয়ে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

মার্ক্সবাদী শ্রেণিচেতনার আলোকে সোমেন চন্দ নির্মাণ করেছেন তার ছোটগল্পের প্রিয় মানুষদের। বাংলা সাহিত্যে সাম্যবাদী চিন্তার প্রকাশ সোমেন চন্দের ছোটগল্পেই প্রথম সচেতনভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তার ‘সংকেত’, ‘একটি রাত’, ‘দাঙ্গা’, ‘বনস্পতি’, ‘ইঁদুর’ প্রভৃতি গল্পের কথা স্মরণ করা যায়। নিম্নবর্গের সংগ্রামশীল জীবন সোমেন চন্দের ছোটগল্পের প্রধান শিল্প-উপকরণ; ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী সংগ্রামে নিম্নবর্গের দীপ্ত অভ্যুত্থানই সোমেনের ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়।’- অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অসাধারণ উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই-এর এক স্থানে সোমেন চন্দের কথা উঠে আসে। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হায়াৎ মামুদের সোমেন চন্দ গ্রন্থটিও উল্লেখযোগ্য। তবুও বাংলাদেশের সাহিত্যে সোমেন চন্দকে খুঁজে পেতে সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ হাতে নিতে হবে। সোমেনচন্দকে জানতে এ উপন্যাস প্রয়োজনীয়। লেখিকা উপন্যাসটিতে সযতেœ ফুটিয়ে তুলেছেন সোমেন চন্দের জীবনচরিত।

সোমেন চন্দ সাহিত্যেও বিপ্লবের ¯্রােতধারা আশা করতেন। বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য দ্বারা ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন করার অনুপ্রেরণা মানুষের মধ্যে সঞ্চার করা সম্ভব। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে মানুষের মুক্তির কথা চেতনায় ধারণ করে রচনা করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের কথাশিল্প।

সম্প্রতি