image

বিড়ালবিষয়ক

মোহাম্মদ আবদুল মাননান

মিম্মিরা চারপ্রাণি ক’দিন ধরেই বেশ অস্থির। সেটা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারেন আয়েশা। ওদের প্রকৃত প্রতিপালক সপ্তাহ ধরেই হরেক প্রকারের ব্যস্ত সময় কাটিয়েছে। ফলে মা-সহ চার প্রাণিকে এই ক’দিন সেই অর্থে সময় দিতে পারেনি মৃত্তিকা। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেই সে ঘুমিয়ে পড়ছে। মিম্মি আর তিন সন্তান পুষ্পি-পুষ্টি-পপি মৃত্তিকার ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই বারান্দা থেকে চলে এসেছে; পায়ের নিকট ঘুরঘুর করেছে, কিন্তু মৃত্তিকা তখন ক্লান্ত, চোখে ঘুম-ওদের দূর দূর করে বারান্দায় ওদের নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিয়েছে মৃত্তিকাই; দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে। এমন আগে হয়নি কখনো। মৃত্তিকা বাসায় ফিরে ওদের দেখভালই আগে করত, কতকটা সময়ও কাটাত এই চার প্রাণির সঙ্গে। চলত খুনসুটি। এই ক’দিন সেটার ব্যত্যয় হচ্ছে।

বিড়ালকুলের কারণে একাধিক বিয়ের প্রস্তাব চূড়ান্ত রূপ পেতে গিয়েও শেষতক হয়নি, ফসকে গেছে। এখনো বিয়ে হয়নি মৃত্তিকার। মামা রাকিব আলিও ভাগ্নির বিয়ে দিতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়েছে ক’টাবছর। আসলে রাকিব আলি ব্যর্থই হয়েছে; অথচ বোন আর ভাগ্নি থেকে সেইই দায়িত্ব নিয়েছিল। একদিন বোন আয়েশাকে বলেই দিল,

‘আপু, বিড়াল কিন্তু মৃত্তির বিয়ের জন্য একটা সমস্যাই।’

‘কী বলতে চাস তুই?’

‘না, আপু, তুমিই তো দেখলে কয়েকটা ভাল সম্বন্ধ ওই বিড়াল বিড়াল করেই হলো না।’

‘ওর এই বিড়ালকে না মেনে নিলে বিয়েতেই রাজি হবে না মৃত্তি।’

‘বলছিলাম কি আপু, ক’দিনের জন্য ওই চারটাকে কোথাও রেখে আসলে হয় না।’

‘তোর মাথাটা একদমই গেছে রে, রাকিব। বিড়াল নিয়েই তো বাসার একমাত্র ছেলে আলাদা থাকছে, সেটা ভাল করেই জানিস তুই। ভাই-বোনের সেই যুযুধান ভুলে গেছিস? কাউকেই কি বুঝাতে পেরেছিলি তখন? মির্মিরটা বাসাই ছেড়ে গেল। এই যে বলছিস্, ওদেরকে অন্য কোথাও রেখে আসতে; মৃত্তি শুনলে এই বাসায় আসতে পারবি আর! ভাগ্নির সঙ্গে তো তোর মহা-মহা সম্পর্ক, তা বলেই দেখ্ না ওকে।’ রাকিব আলি আর কথা বাড়ায় না। ভাগ্নিকে বেশ চেনা আছে তার।

আজ রাতে আবার ওরা চারপায়া কেমন যেন আচরণ করছে। একটু পরপরই মৃত্তিকার রুমে ঢুকছে। মৃত্তিকার বিছানায় কতক্ষণ গড়াগড়ি করছে। ওয়াশরুমের দরজায় অপেক্ষা করছে মৃত্তিকার জন্য; যদি বেরিয়ে আসে ওদের প্রতিপালক! আবার দরজার কাছে গিয়েও বসে পড়ছে-মূল দরজা বন্ধ বলে সিঁড়ি কিংবা লিফটের দিকে যেতে পারছে না। রাত আড়াইটা পর্যন্ত এসবই খেয়াল করেছেন আয়েশা রহমান। বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরতেই দেড়টা বেজে গেছে বাসার সকলের। ফিরেই আয়েশা ওদের কাছে গেছেন। মৃত্তিকা বরের সঙ্গে গাড়িতে ওঠার সময়েও মায়ের কানে কানে বলেছিল, ‘মা, ওদের দেখ কিন্তু। দু’দিন বাদেই ওদের নিয়ে যাব। জানই তো, ওদের ব্যাপারে আপত্তি নেই তাহশানের।’

এই বিয়েটাও হবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন মৃত্তিকার বাবা সিদ্দিক রহমান। চাকরিতে থাকতে থাকতেই ডাক্তার মেয়ের বিয়ে দেয়ার ইচ্ছে ছিল তার। সে হয়নি। একাধিক বিয়ে হচ্ছিল না ওই বিড়াল বিড়াল করেই। ক’খান ভালো পাত্রও যখন হাতছাড়া হয়ে গেছিল, তখন সিদ্দিক রহমান আদতেই মুষড়ে পড়েছিলেন। তখন আবার মৃত্তিকার তিরিশ পেরিয়েছে। একদিন স্ত্রীকে বললেন,

‘শরীরটাও ভাল যাচ্ছে না, আয়েশা, জানিনে, মেয়েটার কপালে কী আছে!’

‘এত ভাবনার কিছু নেই। একটা কিছু হবেই। আর বিড়াল বিড়াল করছ যে, গোড়াতে কিন্তু তোমার আশকারাতেই এ-বাসায় বিড়াল ঢুকেছিল।’

‘সে বলে আর লাভ নেই এখন। একমাত্র মেয়ের ইচ্ছেতে তুমিও তখন সায় দিয়েছিলে। আর না দিয়েও কি কোনো উপায় ছিল তখন!’

‘ভেবে ভেবে শরীর খারাপ করো না। এইবারের প্রস্তাবটি বেশ ভাল; ইঞ্জিনিয়ার, বাইরে থেকে এমএস করে এসেছে-জবটাও ভাল। ছেলের নাকি বিড়ালে কোনো আপত্তি নেই।’

‘ছেলের নেই, এমন প্রস্তাব তো আগেও ক’টা এসেছিল। কিন্তু ছেলের পরিবারের অন্যরাই সমস্যা ছিল। এবার দেখ কী হয়!’

‘হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ। এতো ভেব না তুমি।’

মৃত্তিকার সঙ্গে তাহশানের বিয়ের আনুষ্ঠানিক আলোচনার শুরুতেই বিড়াল প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছিল। এই বিষয়ের উত্থাপক মির্মির। এইবারে মির্মির বউসমেত হাজির হয়েছে বোনের বিয়ের আলোচনায়। বাবা-মা ওদের দেখে একদিকে খুবই অবাক হয়েছেন-বেজায় খুশিও হয়েছেন। এক-বিড়াল বিড়াল করে মির্মির বাসায় আসাই বন্ধ করে দিয়েছিল। বিয়ের পরই আলাদা বাসা নিয়েছিল, ভাইবোনের গলায় গলায় সম্পর্কও উবে গেছে ওই বিড়ালকে কেন্দ্র করেই। রাজধানীর একটা নামি-দামি হোটেলে পাত্র-পাত্রীর প্রথম দেখা। এর আগে নানা রকমের খোঁজ-খবর হয়ে গেছে দুই পক্ষেরই। একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, আজ কিছু একটা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে। ফলে ছেলের পক্ষে মা-বাবাসহ ক’জন যেমন এসেছে; এদিকে পাত্রীপক্ষেও সিদ্দিক রহমান-আয়েশাসহ মৃত্তিকার ছোট মামা রাকিব আলি ও ভাই মির্মির আছে বউকে নিয়ে। মৃত্তিকার এক-দু’জন বান্ধবীও এসেছে। পাত্রের বোন আছে, আছে পাত্রের দু’বন্ধু। মুরুব্বিরা রেস্তোরাঁর এককোনায় বসে নানা কথা বলছে। অন্য এককোণে পাত্র-পাত্রী, উভয়ের ভাইবোন-বান্ধবীরা নানা আলাপে মত্ত তখন। কিছুক্ষণ আগে কেবল পাত্র-পাত্রীরও একান্তে কথা বলার ব্যবস্থা ছিল। মির্মির ওঠে গিয়ে রাকিব আলিকে বলল, ‘মামা, বিড়ালের কথাটা কিন্তু এখনই বলে নেয়া দরকার। না হলে হয়তো আগের মতো ঘটনা ঘটবে।’

‘সে তো মৃত্তিকারই বলার কথা।’

‘এই সময়ে মৃত্তি কী করে বলবে, মামা?’

‘তুই কি বলতে চাস, মির্মির?’

‘একজনকে বলতে হবেই।’

‘তুইই তাহলে বল্, মির্মির।’

পাত্র-পাত্রী আর পাত্রীর বান্ধবীদ্বয়, সঙ্গে পাত্রের একমাত্র বোন। তুমুল আর হার্দিক আলোচনাই হচ্ছিল ওদের। এসব থামিয়েই মির্মির বলল, ‘একটা ব্যাপার আছে। বলতেই হচ্ছে। মৃত্তি তাহশানকে কলেছে কিনা ঠিক জানিনে।’

সবাই কথা থামিয়ে মির্মির রহমানের দিকে তাকাল। কেউ আবার অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে, কী বলতে চাইছে কনের ভাই!

‘না, তেমন সিরিয়াস কিছু না’। সবাইকে একটু হালকা করে দিতে মির্মির এ-কথা বলে। এরপর বলে,

‘আমার বোনের বিড়াল পোষার শখ আছে। এটা একটু মানিয়ে নেয়ার আছে।’ কথাটা শুনেই পাত্রের বোন ঐশিকা নাসিকা কুঞ্চিত করল, যেন কাছেই বিড়াল দেখছে, যেন এখনই তাকে ছুঁয়ে যাবে একটি বিড়াল।

‘না না। ওতে সমস্যা নেই। ছোটকালে আমিও ক’দিন একটা কুকুর পুষেছিলাম। ক’দিনই সেটা। আমার সেজ খালার বাসায় চার-পাঁচটা মার্জার আছে। ওখানে গেলে ওরা আমার কাছে আসে।’

‘মার্জার! সে আবার কী?’ প্রশ্ন করলেন মৃত্তিকার মামা।

‘ওই বিড়ালই, মামা। ওটা একটা প্রতিশব্দ।’ পাত্র তাহশানের গলায় মামা শব্দ শুনে মৃত্তিকার পক্ষের সবাই খুব আশান্বিত হলো, কিন্তু কিছুই প্রকাশ করল না।

‘আমার কিন্তু ওসবে বেশ অ্যালার্জি আছে। আমি নিতে পারি না।’ ঐশিকা বলল।

‘তুই আবার কথা বলছিস কেন, ঐশি? আমি তো বলেই দিয়েছি।’ ভাইয়ের মৃদু ধমকটা বুঝে নিয়েছে ঐশিকা। বলল, ‘সরি, ভাইয়া। আমার কথা বলেছি আমি। তুমি আব্বু-আম্মুর সঙ্গে একটু কনসাল করতে পার।’

‘তুই কিন্তু ক’দিন বাদেই বরের বাড়ি যাচ্ছিস, ঐশি। সে ব্যবস্থা অচিরাৎ হচ্ছে। বাবা-মা, সে আমি বুঝে নেব।’

‘ভাইয়া! বিদেয় করতে পারলেই তোমার ভাল।’ দ্বিতীয় বাক্যটি খুব ক্ষীণস্বরে উচ্চারণ করে ঐশিকা।

খাওয়ার সময়ে ঐশিকাকে মায়ের কানে কিছু বলতে দেখা যায়। ঐশিকার মা সেটা আবার নিজের স্বামীকে কানে কানে চালান করেন।

‘এসব ছাড় তো। বিয়েতেই রাজি হচ্ছিল না তোমার ছেলে। এবার বিয়ে করতে যাহোক মত দিয়েছে। এসব বিড়াল-ছিড়াল তুলে সবটা ভ-ুল কর না, তাহশানের মা। ওর আপত্তি না থাকলেই হলো। এসব ওরাই সামলাবে।’

‘ঠিকই তো। ছেলে চাইলে আমাদের কী!’ বিড়বিড় করে তাহশানের মা বললেন।

বিয়ের রাতেই চারপ্রাণিকে নিয়ে যেতে চাইছিল মৃত্তিকা। তার আগেই ওদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। ঠিক হয়ে আছে বিয়ের তারিখ। দু’পক্ষের তখন নানা প্রস্তুতি। কেনাকাটায় অঢেল সময় দিতে হচ্ছে ডাক্তার মৃত্তিকাকেও; বন্ধ আছে চেম্বার। সে কারণেই মিম্মিরা চার মা-সন্তানরা পাচ্ছিল না মৃত্তিকাকে। কথাটা শুনে তাহশান বলছিল,

‘একটু ধীরে মৃত্তি। বিয়ের দিনই ওদের নিয়ে গেলে লোকজন বলবে কী! পরে নিয়ে এসো। আর চারটাকেই আনা দরকার কী! ভেবে দেখ, তবে তোমার ইচ্ছেই শেষকথা।’

‘পপিটা কিন্তু পুরুষ। ওকে আলাদা করতে চাই। কিন্তু পারছিনে।’

‘বল কী! বছর বছর তো তাহলে অনেকটি বাচ্চা পয়দা হবে। সামলাবে কী করে?’

‘সে ভয় নেই। মিম্মি, মানে মা-বিড়ালটার বাচ্চা হবে না। অপারেশন করা আছে। পুষ্পি-পুষ্টি এখনো বাচ্চা দেয়ার বয়সে পৌঁছেনি। ওদেরও অপারেশন করিয়ে বন্ধ্যা করে দেয়া হবে।’

‘এসব কে করবে গো?’

‘আগেরবার তো বাবাই পশু হাসপাতাল থেকে করিয়েছেন। এবারও করবেন। তোমার এই নিয়ে ভাবতে হবে না। ওই মার্জার নাকি যেন বলেছিলে, ওদের প্রতি একটু সহায় হলেই চলবে।’

মৃত্তিকার ফোন। সিদ্দিক রহমান সময় দেখলেন। রাত আড়াইটা। অবাক হলেন। আজকালের ছেলেমেয়ের কিছু বোঝা যায় না। আজ তো বিয়ের প্রথম রাত। এই সময়ে! মনে মনে বললেন সিদ্দিক রহমান। কিন্তু মেয়ে ফোনটা করেছে মাকে।

‘হ্যাঁ, মা, এখানেও নানা কিসিমের ফর্মালিটিজ আছেই। মিষ্টি জাতীয় খাবারে এখন বমি আসার উপক্রম। এই মাত্রই বিয়ের কাপড় ছাড়লাম। তাহশান ক’জনকে বিদায় জানাতে নিচে নেমেছে।’

‘আচ্ছা।’

‘মা, ওদের কী অবস্থা? ঘুমিয়ে গেছে কি?’

‘আরে না। বারবার তোর রুমে আসছে আর যাচ্ছে। বারান্দায় থাকতেই চাচ্ছে না। তোকেই খুঁজছে, মা।’

‘আহা! ওদের একটু দেখাও তো, মা।’

ভিডিও কলে মেয়েকে বিড়াল দেখানো এইই প্রথম না। তখন ওরা আজিমপুর সরকারি বাসায়। মিম্মিকে এই বাসায় নিয়ে আসার পর থেকে মির্মিরের সঙ্গে মৃত্তিকার লেগেই থাকত। বাবা সিদ্দিক রহমান আর মা আয়েশাও ছেলেমেয়ের এই মহারণ সামাল দিতে হিমশিম খেতেন। মেডিক্যাল কলেজ থেকে মৃত্তিকারা দেশের বাইরে গেছে ছ’সাতদিনের জন্য। এর ক’দিন আগেই মিম্মি তিন-চারটে বাচ্চা দিয়েছে। এই নিয়েও মির্মির মহা-খ্যাপা- এতগুলো কেন ঘরে রাখতে হবে! কোনো কোনো দিন রাগ করে বের হয়; বুয়েটের হলে একাধিক্রমে পাঁচ-সাতদিন কাটিয়ে তবে বাসায় ফেরে। মৃত্তিকা বাইরে গেলেও মন পড়ে আছে বাসায়। ঠিক বাসার জন্য নয়, মন টানছে মিম্মি আর নতুন চার অতিথির জন্য। মনে মনে এই আশঙ্কাও আছে, ভাইয়া মেরেটেরেও ফেলতে পারে দু’একটাকে। সেই সময়ে প্রতিরাতে একবার মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে ওদের পাঁচকে দেখতে চাইত মৃত্তিকা। চার বাচ্চা আর মাকে গুনে গুনে দেখেই মৃত্তিকা ঘুমাতে যেত। যদিও ওই চারের একটা পরে অক্কা পেয়েছিল।

‘বিয়ের প্রথম রাতে বরের বাড়ি থেকে ওদের দেখতেই হবে, মা মৃত্তি?’

‘হ্যাঁ, দেখতে হবে মা।’

‘তাহশান কী মনে করবে?’

‘কিছু মনে করার নেই। সব ওকে বলা আছে।’

‘তোর ননদ কিন্তু এই নিয়ে রসিয়ে রসিয়ে সবাইকে বলবে। ও তো এমনিতেই বিড়াল-বিরোধী।’

‘রাখ ওসব। তাহশানই বোনকে সামলাবে। আমার ভাবতে হবে না, মা।’

এর আগে কিন্তু ভিডিওতে বিড়াল দেখানো নিয়েই মহা-বিপত্তি দেখা দিয়েছিল। হল থেকে রাতের দিকে মির্মির বাসায় ফিরেছে সেদিন। মৃত্তিকে ভিডিও কলে বিড়াল দেখাচ্ছিলেন আয়েশা। মির্মির দেখেই চটে গেল-

‘আদিখ্যেতা হচ্ছে।’ বলেই একটা বাচ্চাকে ছুঁড়ে মারলো মির্মির। চিল্লাপাল্লা করেই আবার বুয়েটের হলে ফিরে গেল সে রাতে। সেই আধমরা বিড়াল নিয়ে পরদিন সকালেই কেন্দ্রীয় পশুহাসপাতালে ছুটতে হয়েছিল বেচারা সিদ্দিক রহমানকে।

দুই

একই রকমের দুর্বিপাক আবারো দেখা দিল-বিড়াল বদলি সেই বিপত্তির নাম। অবসরজীবনে এসে এসব যেন পিছু ছাড়ছে সিদ্দিক রহমানের। আজিমপুর সরকারি বাসা থেকে উত্তরা রাজউক এপার্টমেন্টে এই চারটাকে আনতে অনেক ঝামেলা নিতে হয়েছিল তার। বস্তায় নেয়া যাবে না; মৃত্তিকার বারণ। খাঁচায় আবার কিছুতেই থাকতে চাচ্ছিলো না এই চার প্রাণি। খাঁচায় ঢুকালেই চেঁচামেচি শুরু। এরপর কান্না। এসব দেখেই মৃত্তিকা বলত, ‘বের কর, র্বে কর। চেঁচাচ্ছে, দেখছে না?’ ওদিকে আবার মির্মিমের অব্যাহত চিৎকার, ‘এই গুলারেও নিতে হবে?’ এসবের পর নানাকিছু করেই চারপ্রাণিকে আজিমপুর থেকে উত্তরায় বদলি করতে সক্ষম হয়েছেন সিদ্দিক রহমান। এবার মেয়ের বাড়িতে এসব পাঠাতে হবে। সিদ্দিক রহমান বলছিলেন, ‘ক’দিন পরপর তো এখানেই আসবি। ওরা এখানেই থাক। তোর মা আর আমি কিন্তু ওদের ঠিকঠাক দেখে রাখছি।’

‘না, বাবা। আমার সঙ্গে যাবে। আবার আমি যখন আসব, ওরা আসবে।’

‘শ্বশুরবাড়ির লোকজন কী বলবে, মা।’

‘সে তোমাদের ভাবতে হবে না। বুঝেছো।’

ওদিকে ঐশিকা ভাইয়ের ভয়ে কিছ্ ুআর বলছে না আর বিড়াল বিষয়ে। কিন্তু তাহশানের মা কিন্তু সর্বোচ্চ দুটোর পক্ষে। নতুন বউকে কিছু বলতে পারছে না। বলছে ছেলেকে, ‘মৃত্তিকাকে একটু বুঝিয়ে বল্, বাবা। চারটা নিয়ে আসার কী দরকার। একটা বা দুটো।’

‘দেখি, মা।’ এর বেশি তাহশানের বলা সম্ভব হয় না। তাহশানের বাবা এসব নিয়ে কিছুই বলেন না।

তিন

ঢাকা ক্যাট সোসাইটির পুনর্বাসন কেন্দ্রে পপিকে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। আয়েশা রহমান সোসাইটির সদস্য বলেই এমন সম্ভব হয়েছে। পাঠিয়ে দেয়ার আগে পপির কিছু আচরণ মৃত্তিকার বিরক্তির কারণ হয়েছিল। যখন-তখন বাইরে চলে যেত। পুষ্পি-পুষ্টির অবর্তমানে পপির অস্বাভাবিক আচরণ চরমে পৌঁছে যায়। তখন পুষ্পি-পুষ্টির বন্ধ্যাত্বকরণ সম্পন্ন হয়েছে। ওদের যৌনতাও কেড়ে নেয়া হয়েছে হরমোন পুশ করে। পপি তখন বাইরের বিড়ালের সঙ্গে মেলামেশার জন্য প্রায়ই সিঁিড় বেয়ে নেমে যেত। ফিরত কেবল রাতে। এতেই বিরক্ত হয়ে পপিকে রাখা হয়েছে পেট অ্যানিমাল পুনর্বাসন সেন্টারে। সে আর এই বাসায় ফিরে আসবে না। এদিকে মিম্মি নানা অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। পুষ্পি-পুষ্টি না থাকলে একাকীত্বও মিম্মিকে সারাক্ষণ মনমরা করে রাখত। এরপর দেখা গেল, মরণঘাতী ফেলাইন ইমিউনোডিফিসিয়েনসি ভাইরাসে আক্রান্ত সে। মেয়ের কথায়-কান্নায় বাবা সিদ্দিক রহমান দুই-তিনবার ভ্যাটারনারি সার্জনের শরণাপন্ন হয়েছেন বটে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ডাক্তার বলেছেন, ‘দেরি হয়ে গেছে। রোগটি বাইরের কোনো বিড়াল থেকে এসেছে।’ বাবা বুঝলেন, পপির বাইরে যাওয়া-আসা থেকেই এই ঘটনা।

চার

সার্টিফিকেট আর কিছু পুরনো কাগজের জন্য সেদিন বাসায় এসেছিল মির্মির। ক’দিন আগেই শুনেছে সে, মা বিড়ালটা মরেছে আর এ-জন্য মৃত্তিকার সঙ্গে বাবা-মাও খুব কেঁদেছেন। এক-রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বাসার ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করেছিল মির্মির, ‘তা মৃত্তির বরটাও কেঁদেছে রে?’

‘হ, ভাইয়া। দুলাভাইও কানছে।’ শুনে কী আর বলবে মির্মির। কেবল মুখ দিয়ে বের হলো, ‘পাগল।’

আজ বাসায় ঢুকেই দেখছে অভিনব এক ঘটনা। রাগ-ক্ষোভ একাকার হয়ে আছে মির্মিরের। কী সব কাগজ নিতে এসেছিল তাও ভুলে গেছে। প্রচ- রেগে ফেটে পড়ছিল মির্মির। মির্মিরের রাগ দেখে কেউই আজ কথা বলছিল না। তাহশানও এই বাসায়। মির্মিরের উচ্চৈঃস্বরের বাক্যবাণে এক-ফাঁকে লিফট ধরে নিচে নেমে গেছে তাহশান।

‘সবাই কি গাগল হয়ে গেছ তোমরা? বিবেক-বুদ্ধি কি এভাবে লোপ পায় কোনো মানুষের? ছি বাবা! ছি মা! মেয়ের কথায় দেখছি তোমরা অনেক নিচেও নামতেও পার।’ জোর গলায় আর উঁচুশব্দে বলছিল মির্মির। বলতে বলতে রাগে গজরাতে গজরাতে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছে সে। খোলা দরজার ওপাশ থেকে এখনো শোনা যাচ্ছে, ‘পুরো বাসাটাই হেমায়েতপুর হয়ে আছে। পাগল না হলে ঘটা করে কেউ বিড়ালের শ্রাদ্ধের আয়োজন করে!’ লিফটের দরজা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত মির্মিরের এসব কানে আসছিল। আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকজনও শুনছিল মির্মির এসব কথাবার্তা।

মির্মির কিন্তু জেনে গেল না-এই শ্রাদ্ধ মানে লোকজনকে দাওয়াত দিয়ে ঘটা করে খাওয়ানো নয়। এটি হচ্ছে এই বৃহৎ এপার্টমেন্টের সব ক’টি ফ্ল্যাটের বিড়ালগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত বিড়ালখাদ্য খাইয়ে দেয়া; তৎসঙ্গে বাইরের বিড়ালগুলোর জন্যও ফ্রী ভোজের ব্যবস্থা। গত তিনদিন ধরে মৃত্তিকা এই ফ্ল্যাট এবং নিচের বেওয়ারিশ বিড়ালের জরিপ করেছে। গোটা ষাটেক বিড়ালকে আজ খাওয়ানো হবে-সবই হবে পুষ্পি-পুষ্টি-পপির মা মিম্মির স্মরণে; সে শ্রাদ্ধই হোক, কিংবা চল্লিশা। মিম্মির আত্মা-টাত্মা বলে কিছু নেই-স্বস্তি পাবে একমাত্র মৃত্তিকা; আপাদমস্তক একজন বিরল বিড়ালপ্রেমিকা হিসাবে শ্বশুরবাড়িতে খ্যাতি পেয়েছে সে।

বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ে মির্মির এটাও জেনে যায়নি যে, আজ সকালে বিড়ালের সমাধিতে ফুল দিয়ে এসেছে সহোদরা মৃত্তিকা; তার সঙ্গে ছিল তাহশানও। আর আজও একবার মিম্মি নামের মৃত বিড়ালের জন্য মেয়ে মৃত্তিকার সঙ্গে তার বাবা-মাও কেঁদেছে। জানলে কী হতো-বলত, ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ অথবা বোনকে হেমায়েতপুর পাঠানোর ব্যবস্থা করত কি মির্মির? সেই সঙ্গে বাবা-মাকেও কি হেমায়েতপুর পাঠাতে চাইত মির্মির?

সম্প্রতি