জোবায়ের মিলন
পিয়াস মজিদের কবিতায় ব্যক্তি-আমার জীবন-যাপন ও প্রত্যক্ষণ দুনিয়ার অনেক কথারই সুরধ্বনি পাই বলে তাকে পাঠ করতে হয়। অনেকটা নিয়মিতই বলা চলে। তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ বইটি নেড়ে দেখতে দেখতে দেখলাম অনেকগুলো কবিতা পূর্বে পড়া। তবু বইটি সংগ্রহে নিতে ইচ্ছে হলো। কেননা, কবির নির্বাচনটা দেখে নেয়া বাঞ্ছনীয়।
একটানে পড়াটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।বিধায় কখন খাওয়া, কখন ঘুম তা ভুলে গিয়ে যেকোনো বইই শেষ না করা পর্যন্ত শান্তি মেলে না। এখানেও ২২৩ পৃষ্ঠায় ৩টি অগ্রন্থিত কবিতাসহ ১৯টি কাব্যগ্রন্থের ১১৮টি কবিতা শেষ না করা অবধি আরাম মিলছিল না। অতঃপরপাঠ পূর্ণতা এলো।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এই ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থের অনেকগুলো কবিতাই এরও আগে ইতোপূর্বে পঠিত, যেহেতু নাচপ্রতিমার লাশ, মারবেল ফলের মওসুম, কুয়াশা ক্যাফে, গোলাপের নহবত, মির্জা গালিব স্ট্রিট, এইসব মকারি, ভুলে যাওয়া স্কার্টের সিঁড়ি, রূপকথার রাস্তাঘাটসহ আরও ককেটি কবিতার বই সংগ্রহে আছে। অবিশ^াস্য যে, ফের পড়ে ক্লান্তি এলো না একটুও। কিংবা পড়েছি বলে আড়াআড়ি পেরিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো না। বরং নতুন পড়ার মতোই নিমগ্ন হলাম। ওই যে কবি পিয়াস মজিদকে পছন্দ করা...এখানেই হয়তো কারণ। করণ, পিয়াস মজিদ যখন লেখেন, ‘মৃত্যু একটি মিউজিক, মেঘভূমি, রক্তঋব্ধ, সমাধিবিতান, অমলজীবন, বিনয় মজুমদারের হারিকেন, যে যেখানে আছি, নভেম্বর রেইন, মির্জা গালিব স্ট্রিট’ ইত্যাদির মতো কবিতা- তখন অসমাপ্ত একটা মিউজিক বহুদিন বেঁধে রাখে তার নিজস্ব কাব্যসংগীতের আবহে, যেখান থেকে বের হলেও অনেকদূর যাওয়ার প্রস্তাব ক্ষীণ; এখানেও হয়তো পিয়াস মজিদের বিশেষত্ব এবং তাকে ফিরে ফিরে পড়ার বা তার কবিতার সঙ্গে থাকার আবশ্যকতা। সরল ও সারল্যময় ভাষাভঙ্গি, অকপটে বলে যাওয়া, একটি ছবি এঁকে এঁকে অগ্রসরতা, ভ্রমণের বৈচিত্র্য, অভিজ্ঞতা, দেখার দূরদর্শিতা ও তা মার্জিত প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা সকলের থাকে না, কারো কারো থাকে-পিয়াসের সুনির্বাচিত কবিতাগুলো তারই গ্রাফিতি। ফলে তাকে বা তার কবিতা পূর্বে পড়া হয়েছে বলে আর পড়তে ইচ্ছে করছে না- এমনটি মনেই হয় না। কোথাও কোথাও ভিন্নভাবে আবিষ্কারের দাবি নিয়ে জেগে ওঠে তার টেক্সট। অমল নেশা ধরিয়ে দেয় নতুনভাবে। যার জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়ার টান এড়িয়ে যাওয়ার কোনো ফুরসত পাওয়া যায় না।
‘নির্বাচিত কবিতা’ বলতে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে ভ্রম করে থাকেন বেশিরভাগ পাঠক। ধরে যাক, কবির নির্বাচিত মানে কবি তার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোই জড়ো করেছেন তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থে। কিন্তু আদতে তা নয়। এই নির্বাচিত কেবলমাত্র কবির নিজের নির্বাচনে উত্তীর্ণ কবিতার আধার। প্রকৃত প্রস্তাবে কবির নির্বাচনের সঙ্গে পাঠকের নির্বাচনের যে হুবহু মিল হবে তার তো কোনো কথা নেই। কথা থাকেও না। যেমন, এই নির্বাচনের দায়িত্ব যদি আমাকে দেওয়া হতো হয়তো আরও কিছু, অন্যকিছু কবিতা যোগ করতাম বা এখান থেকে বিয়োগ করতাম। আবার অন্য কাউকে দায়িত্ব দিলে তিনি হয়তো আরও অন্য কোনো, অন্য কিছু কবিতা সংযোজন করতেন, বিয়োজন করতেন। আর কবির কাছে তো তার ‘নির্বাচিত কবিতা’ একটা মহাযুদ্ধ ডিঙ্গিয়ে যাওয়ার মতো। ‘নির্বাচিত’ আর ‘শ্রেষ্ঠ’ এক নয়। শ্রেষ্ঠ হলেও একেক দৃষ্টে একেক।
এ গ্রন্থটি হয়তো সংগ্রহে নাও থাকতে পারত। হয়তো অপঠিত থাকত। এর অনেকগুলো কবিতা তো আগেই পড়া আছে। তবে কেন এই পুনঃসংগ্রহ? যেহেতু পিয়াস মজিদের ১৯টি কাব্যগ্রন্থের সব গ্রন্থ সংগ্রহ করা হয়নি, পড়া হয়নি, তাই এ গ্রন্থটিকে আপাত তার সম্পর্কে একটি ধারণা নেওয়ার উত্তম সুযোগ মনে হয়েছে। কেননা, যখন কোনো অপরিচিত রাস্তা দিয়ে যাই বা একটি আধাপরিচিত রাস্তা পার হতে হয় কিংবা নতুন বা আধানতুন এলাকায় হাঁটতে হয়, তখন চারদিকে খুব যতœ করে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকাতে হয়- ওই রাস্তা বা এলাকাটি সম্পর্কে একটি ধারণা নেওয়ার জন্য, একটু জানার জন্য, বোঝার জন্য; তেমনি একজন লেখকের ‘নির্বাচিত’ পড়ার মধ্যদিয়ে মূলত ওই কাজটিই করা হয়। যেকোনো কবির ‘নির্বাচিত কবিতা’ পেলে সবার আগে সংগ্রহ করে পড়তে চেষ্টা করি।কারণ, ওই নির্বাচিতর মাধ্যমে ওই কবি বা লেখককে অনুমান করা যায়, তার সম্পর্কে গোটা না হোক, কাছাকাছি ধারণা নেওয়া যায়, একটি সিদ্ধান্তে উপস্থিত হওয়া যায়। আরও সহজ কথায় যদি বলতে গেলে কবিকে মাপা যায় যে, আগামীতে তাকে কতটুকু পড়তে হবে বা পড়ার ক্ষেত্রে কতটুকু অগ্রে রাখতে হবে। তাই ‘নির্বাচিত’ প্রকাশ করা একজন লেখকের জন্য একদিকে যেমন আনন্দের তেমনি আরেকদিকে ভয়ানক সিদ্ধান্ত। পাঠকের জন্য একটি মূল্যায়নের, জানার-বোঝার সুযোগ।
কবি পিয়াস মজিদের ‘নির্বাচিত কবিতা’ পাঠ এক সুখকর সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে। তার অপঠিত গ্রন্থগুলো সম্পর্কে হালকা ধরিয়ে দিয়েছে, তাকে একসঙ্গে সংগ্রহে পাওয়ার আনন্দে অভিভূত হওয়া গেছে। তার কবিতা সম্পর্কে এখানে অধিক বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না এই কারণে যে, সমকালে পিয়াস মজিদ একজন প্রতিনিধিত্বকারী কবি, তার কবিতার একটি নিজস্ব গমন-পথ আছে, রূপ আছে, গন্ধ আছে। অনেকের মাঝে তাকে দূর থেকে চিহ্নিত করার চিহ্ন তার কবিতার গায়ে আঁকা হয়েছে এরমধ্যে। তার নিজস্ব পাঠক আছে। তাকে গ্রাম-নগরের যেকোনো বেঞ্চিতে বসা দেখেলেও অনুমান করা যায় তার শব্দ ব্যবহারের শৈলীপুঞ্জ-কর্মগুণে। ফলে অতীতে যারা পিয়াস মজিদের কবিতা সম্পর্কে অবহিত না, তাদের জন্য এ ‘নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থটি একটি মোক্ষম গ্রন্থ। আর আমার জন্য অনেকগুলো ভালোলাগার কবিতা আবার যেন মস্তিষ্কের সেতারের তারে ঝঙ্কার তুলে আরও একবার আমাকে বাজিয়ে নিল-বাজনাহীন সময়ে। আমি চিলতে শান্তি পেলাম।
নির্বাচিত কবিতা: পিয়াস মজিদ। প্রকাশক : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। প্রকাশকাল : ডিসেম্বর, ২০২৫। প্রচ্ছদ : মানব, মূল্য : ৬০০ টাকা। পৃষ্ঠা : ২২৪।