উত্তাপ, স্মৃতি ও প্রতিরোধের কবিতা

সেঁজুতি বড়ুয়া

কবি নভেরা হোসেনের কাব্যগ্রন্থ ‘গরম অথবা আইসবার্গের শীতলতায়’ পড়তে গিয়ে প্রথমেই যে অনুভূতিটি তৈরি হয়, তা এক ধরনের দ্বিমুখী তাপমাত্রাগত বিভ্রান্তি। এখানে “গরম” কেবল ঋতুর অতিরিক্ত উষ্ণতা নয়; এটি দহনশীল সময়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমবন্ধ বাস্তবতার প্রতীক। আর “আইসবার্গের শীতলতা” নিছক তুষারশুভ্রতা নয়; এটি জমাটবাঁধা ইতিহাস, ফ্রিজ হয়ে থাকা স্মৃতি, অপ্রকাশিত কান্নার স্তর।

কবিতাগুলো যেন একইসাথে উষ্ণ ও ঠা-া। এই উত্তাপ ও শীতলতা পরস্পরের বিপরীত নয়, বরং একে অন্যকে উন্মোচন করে। দগ্ধ শহর থেকে কবরের নীরবতা, ব্যক্তিগত বিষাদ থেকে সামষ্টিক গণহত্যা¬- সবকিছু একই আবহে জড়িয়ে যায়। কখনও গরমে “কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়”, কখনও স্মৃতি এসে জমে থাকে “বরফ হয়ে”; কখনও টর্নেডো ঢুকে পড়ে বেডরুমে, আবার কখনও কবরগুলো খুলে গিয়ে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।

নভেরা এই কাব্যগ্রন্থে ব্যক্তিগত অনুভূতিকে কখনও আলাদা করে রাখেন না। প্রেম, শরীর, অপেক্ষা, নস্টালজিয়া- সবই বৃহত্তর সময়ের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে তাঁর কবিতায় আবেগ একা থাকে না; তা দ্রুত রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। আবার রাজনৈতিক উচ্চারণও কেবল স্লোগান হয়ে ওঠে না; তা ফিরে আসে ব্যক্তিগত অনুশোচনা, না-বলা কথার দিকে।এই দ্বৈত সুরই বইটির কেন্দ্রে- উত্তাপ ও জমাট শীতলতার টানাপোড়েনে তৈরি এক জটিল, সমকালীন কবিতাভাষা। শিরোনামেই তাপমাত্রা ধীরে ধীরে শুধু আবহাওয়ার নয়, সামাজিক ও মানসিক সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে।

“লোকজন বলছে এবার গরমটা বেশি পড়েছে” (গরম অথবা আইসবার্গের শীতলতায়-)

-এই সাধারণ উচ্চারণ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে শহরের অগ্নিকা-, কবরখানার ভিড়, অসুস্থ শরীর আর ভেঙে পড়া স্নায়ুর ভেতর। একে একে সব কিছু অস্থির হয়; বিদ্যুৎ, ফ্যান, জেনারেটর বাড়লেও তাপ কমে না, চোখে পড়ে মেয়েদের হিমালয়ে ওঠা, শেরপারদের মৃত্যু, শহরের লু হাওয়া, আর সব মিলিয়ে গরম হয়ে ওঠে মানসিক চাপ। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন আসে-

“টর্নেডো কি আমার বেডরুমে ঢুকে পড়ল? / নাকি মস্তিষ্কের শিরোপশিরায়?” (গরম অথবা আইসবার্গের শীতলতায়-)

এখানে টর্নেডো আর প্রাকৃতিক কোনো ঘটনা নয়; এটি সময়ের অস্থিরতা, রাজনৈতিক দাহ, ব্যক্তিগত উৎকণ্ঠা এবং জীবন-চাপের সম্মিলিত প্রতীক। প্রতিটি মুহূর্তে ব্যক্তি অনুভব করে যে, তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত- যেমন ঘর, শহর বা শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণে নেই। ভেতরের ভাঙন, বাইরের অগ্নিকা-, রাজনৈতিক অস্থিরতা- সব মিলিয়ে একটি মানসিক ভূমিকম্প তৈরি করে, যা শুধু দেহ নয়, মনকেও সেঁকে দেয়।কবিতাগুলোয় প্রেম বা সম্পর্ক কখনো সরল নয়। আকর্ষণ আর দূরত্ব একসঙ্গে কাজ করে- একই সময়ে টানে, আবার বিকর্ষণ করে: “দুজন দুজনকে অনেক পেতে চাই / আবার এড়িয়ে এড়িয়ে চলি” (ক্রোকোডাইল)

এখানে প্রেমের ভেতরে দ্বৈততা স্পষ্ট। একপাশে আছে দখলের আকাক্সক্ষা, অন্যপাশে স্বাধীনতার সংরক্ষণ। ভালোবাসা মানে একে অপরের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার নয়, আবার পুরো মুক্তিও নয়। দুইজনই ঘনিষ্ঠ হতে চায়- শরীর, স্পর্শ, রেশমি ঘ্রাণে মিলিত হতে চায়- কিন্তু একই সঙ্গে নিজেদের মানসিক এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা রক্ষা করতে চায়।

বৃষ্টিতে ছাতার নিচে, গরমে এসিতে, সাঁতার কাটা শেষে বেলাভূমিতে শুকানোর মুহূর্ত- সবকিছুই এই টানাপোড়েনকে ফুটিয়ে তোলে। তারা একে অপরের ভেতরে ঢুকে যায়, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি মিশে যায় না; দুজনই নিজের স্থান বজায় রাখে। সম্পর্কের এই জটিল খেলা, দখল আর মুক্তির সেতুবন্ধন, কবিতার প্রতিটি লাইনেই লুকিয়ে আছে।আরেক জায়গায় নিয়ন্ত্রণের ভ্রম ভেঙে পড়ে-

“আমরা ভাবি সব সুতো আমাদের হাতে

জীবন খুব বেশি নিজের দখলে”

(সুতো কাটা ঘুড়ি)

এই কবিতায় জীবনের এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে। আমাদের মনে হয়, আমরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করি, প্রতিটি সুতো আমাদের হাতে আছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘুড়িটা উড়তে-উড়তে নিজেদের সীমারেখা ছাড়িয়ে চলে যায়। কখনো ভেতরের অলি-গলি, কখনো ঝড়ো বাতাস- সব কিছু আমাদের কব্জা ছাড়া চলে। মানুষের কর্তৃত্ব সীমিত; ঘুড়িটা কেটে পড়ে পাশের বাড়ির ছাদে, এবং আমরা সেটি ছুঁতেও পারি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যেন এই ঘুড়ির মতো- আংশিক নিয়ন্ত্রণ, আংশিক অনিশ্চয়তায় ভরা। সুখ, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা- সবকিছুই আমাদের হাতে নেই, আবার সবসময় হারিয়ে যায় না; কিছু মুহূর্তই শুধু আমাদের অধিকার, কিন্তু তাতেও মুক্তির স্পন্দন লুকানো থাকে।

দেখা যায় শুধুই স্মৃতির ছায়া, হারানো দিনের প্রতিচ্ছবি, বায়োস্কোপের মতো উঁকি দেয় অতীতের ভয়ানক ছবি। এই চোখ আর চেনা যায় না; শীতের রোদে টুপটাপ ঝরে পড়া জলের মতো, আয়নার পারদ গলে ঢাকা পড়ে গেছে বিস্তৃত জীবনের ভেতরে। তবু, অমাবস্যার রাতে সেই চোখ ঝলসে ওঠে- একটা নিঃশব্দ, ব্যথাবিহীন, কিন্তু স্মৃতির প্রলয়ঘন দীপ্তি।

এখানে ময়দান শুধুই ইতিহাসের এক স্থল নয়; বরং এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্মৃতির সংযোগস্থল। তাই তো কবি লিখছেন- “পঁচিশে মার্চের গণহত্যা কখনো বন্ধ হয়নি, এখনো রক্তে সয়লাব কারবালার ময়দান।” (পঁচিশে মার্চ )

এ কবিতায় প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি ছায়া যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একাত্তরের ভয়, নির্যাতনের আর্তনাদ এখনও রয়ে গেছে। সময় এখানে অতীত নয়। পঁচিশে মার্চের মতো গণহত্যা বা নূহের প্লাবনের মতো জল শুধুই ইতিহাস নয়; এটি চলমান অভিজ্ঞতা, যা প্রতিটি মুহূর্তে ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্মৃতির সঙ্গে মিলেমিশে উপস্থিত থাকে।

“রায়েরবাজার বধ্যভূমিতেও এক হাঁটু জল, নূহের প্লাবন শুরু হলো এক” (মনের জানালা, পৃষ্ঠা)

- জল এখানে স্মৃতির প্রতীক। ইতিহাস কখনো ডুবে যায় না; বরং জমে থাকে, স্তর স্তর করে, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে। জল মানে শুধু নদী বা বন্যা নয়; এটি সেই সমস্ত স্মৃতি, সেই সমস্ত আঘাত, সেই সমস্ত নিঃশব্দ আর্তনাদ, যা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘন হয়ে আসে।

তীব্র রাজনৈতিক বয়ানের মাঝেও কবি হঠাৎ করে ব্যক্তিগত বিষাদের দিকে ফিরে যান। মায়ের সঙ্গে না বলা কথা, নস্টালজিক ক্যাফের বিভ্রান্ত স্মৃতি, সম্পর্কের সুতো কেটে যাওয়া- এসব অংশ কবিতাগুলোকে মানবিক গভীরতা দেয়। সেখানে শুধু থাকে এক ধরনের অনুশোচনা- “মা’র সাথে ভালো করে কোনো কথাই হলো না / একা একজন মানুষ কত কী করলো জানা হলো না”(মা’র সাথে ভালো করে কথাই হলো না)

এই লাইন দু’টি প্রমাণ করে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সহিংসতাও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতর গিয়েই সবচেয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে। যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় চাপ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে একজন মা কীভাবে একা সব দায়িত্ব সামলেছেন- তার স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং নিঃশব্দ ত্যাগ আমরা জানি না।

শেষে, নভেরা হোসেনের কবিতা এক ধরনের প্রতিরোধের ভাষা হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত বেদনা, সম্পর্কের ক্ষয়, সময় ও স্মৃতির চাপ- সবই হঠাৎ করে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিশে যায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই একটি বৃহত্তর, মানবিক প্রতিরোধের স্পন্দন ধরা দেয়।

এই বইয়ের প্রতিটি কবিতা অনুভবের সূক্ষ্ম রেখা ধরে- কখনো শারীরিক তাপ বা শীতলতা, কখনো প্রেম ও বিচ্ছেদ, আবার কখনো ইতিহাসের ক্ষত ও মৃত্যুর ছায়ায় আবদ্ধ অনুভূতি। নভেরা দেখান, আমাদের প্রতিদিনের ছোট ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো বিশাল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। পাঠকের কাছে শেষ বার্তাটি স্পষ্ট হয়: জীবন বদলাচ্ছে, সময় কেটে যাচ্ছে, কিন্তু স্মৃতি, শরীর, সম্পর্ক এবং অভিজ্ঞতার অবসান হয় না- অন্তহীন এই অভিজ্ঞতার ভিতরেই আমরা দাঁড়িয়ে থাকি।

গরম অথবা আইসবার্গের শীতলতায়: নভেরা হোসেন। প্রকাশক: পু-্র প্রকাশন। মূল্য: ২৬০ টাকা।

সম্প্রতি