কবীর হোসেন
নিজের খেয়ে বনের মোষ যারা তাড়ান তাদের মধ্যে সাহিত্য কাগজ ও লিটলম্যাগ সম্পাদকগণও আছেন। তারা গাঁটের পয়সাই খরচ করেন না, ঋণ করেন, জমি বিক্রি করেন, স্ত্রীর স্বর্ণ বা সঞ্চয় ভাঙ্গিয়েও এই ধারা সচল রাখেন। তাদের কাছে এছাড়া বেঁচে থাকা কঠিন।
তবে সোস্যাল মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তির সাম্প্রতিক প্রবণতা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অন্যান্য কারণে এই সময় এই উদ্যোগ কিছুটা ভাটা পড়েছে বলেই মনে হয়। বছরের শুরুত আমাদের মননে ‘ফুল ফুটুক’-এর প্রকাশ তাই আশার সঞ্চার করে।
সাধারণত সাহিত্য কাগজ বা দৈনিক পত্রিকাগুলোর বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রুচির দুর্ভিক্ষের কারণে স্টান্ডার্ড বজায় রাখতে পারে না। ‘ফুল ফুটুক’ সে দিক থেকে ভিন্নতর। অনেক জায়গা ছেড়ে দিয়ে লেখাগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তা পাঠকদের সহজেই নজর কাড়ে। এ/৪ সাইজের বাই কালার পত্রিকাটির ছবি, ইলাস্ট্রেশন, ফন্ট সব কিছুই দৃষ্টিনন্দন। গহনগত কারণে পত্রিকাটি এ পারের থেকে ওপারেরই বেশি মনে হবে।
চব্বিশ পৃষ্ঠার পত্রিকাটিতে শোয়েব শাদাব, নূরুল হক, রবীন্দ্রনাথ ও শামসুর রহমানের ওপরসহ পাঁচটি মননশীল প্রবন্ধ-নিবন্ধ-আলোচনা, একটি মারাত্মক গল্প, একটি কবিতা এবং একগুচ্ছ কবিতা ও একটি আত্মজৈবনিক রচনা স্থান পেয়েছে।
শোয়েব শাদাব আশির বিরলপ্রজ কবি। ‘অশেষ প্রস্তর যুগ’ সভ্যতার পথ পরিক্রমা শিরোনামে এহসান হায়দার শোয়েবের বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রন্থভুক্ত কবিতার পঙ্ক্তিমালা ধরে ধরে আলোচনা, কবিতার প্রস্তুতিপর্বের সমসাময়িক ঘটনা, কবির চিন্তা ও কাঠামো বিশ্লেষণের কারণে লেখক ও লেখা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি গ্রন্থ আলোচনা প্রবন্ধের মর্যাদা পেয়েছে।
চরু হক লিখেছেন তার বাবা কবি নূরুল হকের কবিতা ও জীবনের নানা দিক। আলোচনায় কবি নূরুল হকের কবিতা ও জীবন বিস্মিতভাবে ফুটে উঠেছে। যদিও বাবাকে নিয়ে লেখার কারণে ইতিবাচকতাই বেশি। তবু নূরুল হকের কবিতা বিষয়ক যেসব ভাবনা স্মৃতিচারণটিতে এসেছে তা দুর্দান্ত, ভাবনার রসদে পরিপূর্ণ। তেষট্টি বছর বয়সে নূরুল হকের প্রথম কবিতাগ্রন্থ বেরুলেও তিনি সারাজীবন বয়ে বেরিয়েছেন কবিতার সংক্রমণ।
পত্রিকাটিতে প্রথমেই ‘মা ভৈঃ সহমরণ এবং দ্বৈতপাঠের রবীন্দ্রনাথ: সমগ্রের প্রেক্ষিত’- অনিকেত সুরের রচনাটিতে রবীন্দ্র পাঠের সীমাবদ্ধতা তথা সেকেলে ফ্যাশন বা ভোঁতা ঈশ্বরভক্তির গন্ধ অনুসন্ধান বা বিদ্বেষের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ পাঠের সামগ্রিক প্রেক্ষিতের প্রতি দৃষ্টিপাতের অনুরোধ করা হয়েছে যাতে তিনি খ-িত না হন। এক্ষেত্রে তার ব্যক্তিগত মতামত এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের বাণীসমূহ সপক্ষে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও লেখাটি একটি প্রমোশনাল রূপে আভিভূত হয়েছে।
অদ্বৈত মারুতের ‘ছড়ার শক্তি ও ভূত ভবিষ্যত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। প্রবন্ধে ছড়ার উন্মেষ-প্রেক্ষিত, বিবর্তনের ইতিবৃত্ত ও পরিবর্তনের ধারা তুলে ধরা হয়েছে। এটি একটি মৌলিক রচনা। ছড়া সম্পর্কে এই লেখাটি দারুণ প্রয়োজনীয়। এমনিতেও মারুতের গদ্য ভাষা চমৎকার, তার ওপর নিজে শিশু সাহিত্যিক হওয়ায় ছড়ার নানান দিক গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে।
শামসুর রাহমানকে নিয়ে পারভেজ আহসানের প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ নিঃসংকোচ। এর আগে কবিকে এতটা ব্যবচ্ছেদ খুব কম লক্ষ করা গেছে। শামসুর রাহমানের কারিগরি দক্ষতা স্বীকার করলেও ত্রিশের ও বিদেশি কবিদের প্রভাব, সীমিত নগরায়নের প্রভাবে নাগরিক কবির টাইটেলের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক কবিতায় আবেগ নির্ভরতার অভিযোগও এসেছে যুক্তিতর্কের খাতিরে।
একটি অসাধারণ গল্প ছাপা হয়েছে পাঠককে শ্বাসরুদ্ধ করে। তবে গল্পটির শেষের উপসংহারটি বেমানান লেগেছে। যদিও গল্পটির প্রাবন্ধিক নাম, শুরুতে নজরুলের দুলাইন কবিতার উদৃতি অভিনব।
শেষ পৃষ্ঠার গল্প’ নামে একটি আত্মজৈবনিক রচনার অংশ বিশেষ উন্মুক্ত করা হয়েছে সংখ্যাটিতে। নান্দাইলের ‘বড় স্যার’খ্যাত প্রয়াত মো. আলী আফজাল খানের জীবনী। মরুহম আফজাল নিজে শিক্ষক ছিলেন, সারাজীবন শিক্ষার প্রসার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার একাধিক ছেলেমেয়েও শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়ে বাবার পথে হাঁটছেন। এমনকি তার পূর্বপুরুসরাও শিক্ষকতার সাথে জড়িত ছিলেন। গোটা আত্মজীবনীটি তদানীন্তন ময়মনসিংহের নান্দাইলের শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ, সংস্কৃতির একটি সময়ের দলিল হিসেবে মূল্যায়ন হবে। যদিও একজন শিক্ষকের লেখা গতানুগতিক আত্মজীবনী হয়তো হবে না।কবিতা সংখ্যা কম বা ভালো কবিতার দীনতা ও কিছুটা একরৈখিক মনে হলেও খুব দ্রুতই পত্রিকাটি বিশিষ্ট হয়ে ওঠার দাবি রাখে।
সম্পাদক : অদ্বৈত মারুত, মূল্য: পঞ্চাশ টাকা। একটি শিল্পসাহিত্য ও মননশীলতার ত্রৈমাসিক।
নগর-মহানগর: নামছে বিআরটিসির নারী বাস