ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-৩৩
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
হাবানা পৌঁছলাম মায়ামী থেকে সরাসরি ফ্লাইটে- মাত্র ৪০ মিনিটে- যেন ঢাকা থেকে চাঁটগাঁর ফ্লাইট।
কিউবার উপকূল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কী ওয়েস্ট সমুদ্র পথে মাত্র ৯০ মাইল- তবু মনে হয় অনেক দূরে। ইতিহাস ও রাজনীতি যে কাছের জিনিসকে দূরে ঠেলে দেয়, এটি তার এক নমুনা। মনে হলো আরেক বিশ্বে আসলাম।
হোজে মার্টি বিমান বন্দর থেকে শহরে যেতে দেখি দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্বাগত জানাচ্ছে শত শত পাম গাছ- কিউবার জাতীয় বৃক্ষ, এখানে বলে পালমা রিয়াল। শহরে ঢুকতে প্রথমেই চোখে পড়ল আমেরিকার পুরনো গাড়ির সারি, মনে হচ্ছে এখানে চলছে এক ভিনটেজ কার শো। আর হাবানার কেন্দ্রকে মনে হলো স্পেনের এক শহর- স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসনের চিহ্ন পুরনো শহরের সবদিকে ছড়িয়ে আছে।
ক্যারিবিয়ানের এক দ্বীপ কিউবা, আর তার রাজধানী হাবানা১ সাগরের পাড়েই। তাহলে চলেই আসলাম লোরকার স্বর্গরাজ্যে, তিনি যেমন বলেছিলেন, ‘দ্বীপটি স্বর্গরাজ্য। কিউবা। আমি যদি কখনও হারিয়ে যাই আমাকে যেন খোঁজা হয় আন্দালুসিয়ায় অথবা কিউবায়।’২তবে কিউবাকে এখন এদের মতো করে বলা শুরু করলাম কুবা।
শহরের উত্তরে সাগর তীরের এলাকাটি এল মালেকোন নামে পরিচিত। এখানে হোটেলে চেক ইন করে সামনের সাগর ও আশেপাশে দেখতে গেলাম। সেখানে ৫ মাইল লম্বা প্রমেনেড- বসার, হাঁটার, দৌড়ানোর এক চমৎকার জায়গা। হাজারো মানুষের জমায়েত, বেশিরভাগ পর্যটক। কয়েকজন ভায়োলিন, ট্রাম্পেট ও গিটার বাজাচ্ছে, সাথে দুয়েকজন গান গাচ্ছে, অনেকে দিচ্ছে হাত তালি। তার সাথে মিশে যাচ্ছে সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। নোনা জলের ঝাপটা এসে পড়ছে গায়ে। সাঁই সাঁই করে মাঝে মধ্যে যাচ্ছে সাইকেল। কেউ কেউ দেখি মাছ ধরছে- একজন তুলেও ফেলল একটি মাছ। পাশের রাস্তায় দেখি লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘোড়ার গাড়িতে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে ভিনটেজ কার- সবই আমেরিকার পুরনো মডেল- শেভ্রোলেট, ওল্ডসমোবাইল, ফোর্ড, বুইক- কত রঙের, কত আকারের। মজার ব্যাপার হলো, ভিনটেজ কার শো ছাড়া এসব গাড়ি খোদ আমেরিকার রাস্তাতেই তেমন দেখা যায় না। হাভানার রাস্তা এসব গাড়িতে ভর্তি। ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নিয়ে পর্যটকরা এসব গাড়িতে ঘুরে, ছবি তোলে, সিনেমা বানায়। সাগর পাড়ের ভিলাগুলিতে রয়েছে ঐতিহ্যের ছাপ- নকশা করা স্তম্ভ ও খিলান, কারুকাজ করা ব্যালকনি, রঙিন জানালা ও শাটার- স্পেনীয় স্থাপত্যের চিহ্ন। তবে বেশির ভাগ বাড়ির রঙ হয়ে পড়েছে ফ্যাকাশে, প্লাস্টার খসে পড়েছে, জানালার কাঁচ ভাঙ্গা। আর অনেকগুলি বাড়ি পরিত্যক্ত। মাত্র ৯০ মাইল দূরে অপর পাড়ের কী ওয়েস্টে সাগের পাড়ের এ রকম এক একটি বাড়ির দাম মাল্টিমিলিয়ন ডলার।
এল মালেকোন হাভানার দুইটি প্রান্তকে সংযোগ করেছে- পূর্বদিকে ঐতিহাসিক শহর, পশ্চিম দিকে আধুনিক অংশ।
এল মালেকোন এর প্রমেনেড ধরে হাঁটতে হাঁটতে পূর্ব প্রান্তে চলে গেলাম। সেখানে হাভানা হারবার, তাকে পাহারা দিচ্ছে দুইটি বাতিঘর ও দুর্গ- কাস্তিয়ো দেল মরো ও কাস্তিয়ো দে সান সালভাদোর দে লা পুনতা।
সন্ধ্যে নামতেই বাতিঘর, দুর্গ ও হারবারে বিশ্রাম নেয়া জাহাজগুলি থেকে জ্বলে উঠল হাজারো বাতি। তার সাথে যোগ দিল আশেপাশের ভবনের সমুজ্জল বাতি। সাগরের জলে পড়েছে তাদের মিলিত প্রতিবিম্ব। জল ও বাতির এ মিলিত রূপ দেখছে বহু মানুষ, তাদের সাথে আমিও যোগ দিলাম। পরে পাশের এক রেস্তোরাঁয় খেয়ে হোটেলে ফিরে আসলাম। রুমে ফিরেও কানে আসতে লাগল সাগরের ঢেউ ও বাতাসের শব্দ- তা শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়লাম।
ভোরে উঠে সাগরের হাওয়া ও ঢেউ উপভোগ করছি হোটেলের দোতলার ব্যালকনিতে বসে। বেশ উত্তাল সে সাগর- তার ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাথরের সুদৃঢ় দেয়ালে। আমার সাথে সে দৃশ্য উপভোগ করছে হাজারো মানুষ- কেউ সাগর পারে বসে, আর কেউ-বা হোটেলের ব্যালকনি থেকে। এদের মধ্যে নাবিল, নাতাশা ও ফারজানা নেই- মনটা খারাপ হয়ে গেল। তাদের আনা হয়নি, কারণ এবার নিশ্চিত ছিলাম না ভিসা পাব কিনা, তবে কোনো অসুবিধে হয়নি।
এল মালেকোন-এর সমুদ্র-দেয়ালের পাড়ে হোটেলের সামনে রাস্তা, এ সাগরকে দেখার সাথে দেখছি রাস্তায় গাড়ির আসা-যাওয়া। মানুষ, গাড়ি ও সাগরের এক সাথে পথ চলা বেশ ছন্দোময়, মনে হয় সারাদিন এ দৃশ্য দেখি। এত পুরনো সুন্দর গাড়ি- এতগুলি এক সাথে রাস্তায় চলতে পৃথিবীর আর কোথাও দেখিনি। অভ্যেস মতো এ স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য ভিডিও করতে শুরু করি। রাস্তা-গাড়ি-সাগর-দিগন্ত হয়ে আবার রাস্তায় নিয়ে আসি ক্যামেরা। চমকে উঠলাম নিচ থেকে আসা এক বুয়েনোস দিয়াস ডাকে, সাথে আমার নাম। আমার ভিডিও করা দেখে মেয়েটি গাড়ির সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে হাসতে হাসতে বলল- ‘আমি লিয়ানা জুনিগা, আমার ভিডিও কর।’ মেয়েটির সাথে কাল দেখা হয়েছিল এয়ারপোর্টে, বলল সে একজন গাইড, সাথে ভিনটেজ কার আছে, শহর ঘুরে দেখাতে পারবে। ভাবলাম একজন গাইড হলে ভালই হয়, আর এখানকার জগদ্বিখ্যাত ভিনটেজ কারে একবার চড়তেই হবে। তাই সেখানেই কনফার্ম করে ফেললাম, সকাল ১০টায় হোটেল থেকে তুলে নেবে। সে ঠিক সময়েই এসে গেছে। বললাম, ‘একটু অপেক্ষা কর, নিচে নামছি।’
নিচে নামতেই বলল, ‘এর মধ্যে তোমার ২০ মিনিট চলে গেছে। আমি এখানে এসেছি ঠিক ১০টায়, তখন থেকেই টাইম হিসেব করা শুরু। এখন টুরিস্ট সিজন, তাই ভিনটেজ কারের অনেক ডিম্যান্ড, প্রতিটি মিনিট তাই হিসেব করতে হয়। তোমার সাথে চুক্তি ২ ঘণ্টার, প্রতি ঘণ্টায় ৬০ ডলার। ১২টায় গাড়ি চলে যাবে, এরপরও আমি থাকব বিকেল ৫টা পর্যন্ত তোমার গাইড হিসেবে। এখন সময় নষ্ট না করে গাড়ি চলতে চলতেই বাকি আলাপ করতে পারবে।’ কী চমৎকার পেশাদারিত্ব, ভালোই লাগল। কিউবার এখন বড় আয় আসে পর্যটন থেকে। উত্তর ও দক্ষিণ- দুই আমেরিকা থেকেই প্রচুর পর্যটক আসে, বেশিরভাগ কানাডা থেকে।
লিয়ানা পরিচয় করিয়ে দিল গাড়ির ড্রাইভার রিভাস হুরাডোর সাথে। এক লম্বা, সুদর্শন তরুণ- মাথায় কাউবয় হ্যাট, নকশা করা দামি বুট জুতা ও বেল্ট, হাতে সুন্দর ঘড়ি, আঙ্গুলে আংটি, গলায় সোনার লম্বা চেন- মনে হচ্ছে ওয়েস্টার্ন ছবির এক নায়ক। হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করল।
স্টাইলে ও সৌন্দর্যে গাড়িটি তার ড্রাইভার ও গাইডের ঐতিহ্যকে অনুসরণ করল। দারুণ এক গাড়ি। রিভাস হুরাডো তার গাড়িটি হাতে স্পর্শ করে বলল, ‘এটি হলো এখানকার সবচেয়ে দামী গাড়ি- ১৯৫৫ বুইক রোডমাস্টার কনভার্টিবল।’ লাল রঙের গড়িটি চকচক করছে, মনে হচ্ছে এইমাত্র শো রুম থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। বললাম, ‘চমৎকার। এত পুরনো গাড়ি, এত ভালো রেখেছ, দারুণ ব্যাপার।’ রিভাস হেসে বলল, ‘গাড়িটির নাম ও নকশাই শুধু ১৯৫৫ সালের- বাকি সব কয়েকবার বদলানো হয়ে গেছে। আমেরিকার গাড়ি, তবে আমেরিকার পার্টস আনা নিষিদ্ধ- ১৯ অক্টোবর ১৯৬০ সাল থেকে, ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের ফল। তাই আমরা অন্যন্য গাড়ির পার্টস লাগাই। এ গাড়িটির ইঞ্জিন রাশিয়ার লাডোর, গিয়ার বক্স সে দেশের ভলগার, আর অনেক পার্টস আমি ও আমার বাবা ওয়ার্কশপে তৈরি করেছি। কিউবায় সবচেয়ে মূল্যবান ও পবিত্র জিনিস হলো একটি এনটিক আমেরিকান গাড়ি। এটি থাকলে আয়ের জন্য কোনো চিন্তা করতে হয় না। শুধু বংশানুক্রমে এর যত্নআত্তি করলেই হলো। আমার বাবার আছে পদার্থ বিজ্ঞানের পিএইচডি, বোটানির মাস্টার্স আমার- কিউবার বিপ্লবের বড় সুফল- সবাই শিক্ষিত। কিন্তু আমি চাকরি না করে এ গাড়ি চালাই।’ বললাম, ‘কেন?’ তার ত্বরিৎ জবাব, ‘আমি চাকরি করলে মাসে ২০০ ডলার পেতাম, এখন আমি দিনে ২০০ ডলার আয় করি।’
লিয়ানা বলল, ‘দেখ, আমাদের ভাড়া ঘণ্টায় ৬০ ডলার। তোমার সময় অনেক মূল্যবান, এসব ইতিহাস ও গল্প বইতে পাবে, পরে তুমি দেখে নিতে পার। আমি এখন বর্ণনা করা শুরু করব। তুমি ভিডিও অন করতে পার, তাহলে বর্ণনা রেকর্ড হবে, আর মনে থাকবে।’ বললাম, ‘আমি সামনের সিটে রিভাস হুরাডোর পাশে বসতে চাই। এতে দৃশ্য দেখতে ও ভিডিও করতে সুবিধা হবে।’ লিয়ানা ও আমি সিট পরিবর্তন করে নিলাম। গাড়ি চলতেই লিয়ানার বর্ণনা শুরু হলো, সাথে শুরু আমার ভিডিও রেকর্ডিং। রিভাস চালাচ্ছে ১৯৫৫ বুইক রোডমাস্টার কনভার্টিবল, আমি আছি পাশে, পেছনের সিটে লিয়ানার মতো এক সুন্দরী, সাগরের পাড়ে রাস্তা দিয়ে আমরা ছুটে চলেছি- মনে হচ্ছে হলিউড ফিল্মের একটি দৃশ্য।
এল মালেকোন দিয়ে যেতে যেতে গতকাল দেখা দৃশ্যগুলি আবার আসতে লাগল। বললাম, ‘এগুলি সব গতকাল দেখেছি, এখানে রাত ১২টা পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করেছি।’ লিয়ানা চেঁচিয়ে বলল, ‘এটা ঠিক করনি। তোমাকে বলেছিলাম ৭ টার পর হোটেল থেকে বের হবে না। এখানে আজকাল অনেক ক্রাইম হয়।’ বললাম, ‘দেখ, ওরা আমার ক্ষতি করবে না। কারণ ওদের রঙ আর আমার রঙ একই, ওদের আর্থিক অবস্থা আর আমার অবস্থা প্রায় একই।’ লিয়ানা বলল, ‘সাবধানে থাকা ভালো। তোমার জন্য সব অপরিচিত জায়গা, অপরিচিত মানুষ।’
এল মালেকোন ধরে পশ্চিম দিকে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে রিভাস, আমি পাশে বসে ডান পাশের সাগর ও বাম পাশের জনপদের দৃশ্য দেখছি, পেছনে বসে ধারা বিবরণী দিচ্ছে লিয়ানা। একটু যেতেই দেখি মার্বেল পাথরের এক অনিন্দ্য সুন্দর মনুমেন্ট। রিভাস গাড়ির গতি একটু কমাতেই লিয়ানা বলল, ‘এখানে কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সেনানী জেনারেল আন্তোনিও মাসেও এর ভাস্কর্য। কৃঞ্চাঙ্গ এ সেনাপতিকে সাহসিকতার জন্য বলা হতো কিউবার স্পার্টাকাস। কিউবার স্বাধীনতাপ্রাপ্তির কয়েক বছর আগে ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে এক গুপ্ত হামলায় তিনি নিহত হন।’
আরো একটু যেয়ে এক ভবন দেখিয়ে লিয়ানা বলল, ‘দেখ, থাগানানা পাহাড়ের ওপর ঐতিহাসিক হোটেল নেসিওনাল দে কুবা।’ এল মালেকোন থেকে বেরিয়ে বাঁয়ে ওপরের দিকে উঠে রিভাস গাড়ি থামাল হোটেলটির সামনে। সবুজ পার্কের সাথে চমৎকার স্থাপত্যের বিশাল এক ভবন। লিয়ানা আবার শুরু করল তার বর্ণনা, ‘১৯৩০ সালে নির্মিত এটি কিউবার সবচেয়ে নামকরা হোটেল- অনেক কারণে একই সাথে সুনাম ও দুর্নাম কুড়িয়েছে। তবে সুনামের ভাগ অনেক বেশি। এর শুরু তার স্থাপত্যে- যা সেভিলিয়ান, রোমান, মুরিশ ও আর্ট ডেকোর এক চমৎকার সংমিশ্রণ। এখানে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি অবস্থান করেছিলেন, তার মধ্যে কিছু নাম বলি- আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, ইউরি গ্যাগারিন, উইনস্টন চার্চিল, ফ্রাঙ্ক সিনাত্রা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জিমি কার্টার। এ লিস্ট আরো অনেক লম্বা, সব মনে নেই। আর এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে অনেক নামকরা সভা-সম্মেলন।’ এখান থেকে শহর ও সাগরের এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তার কিছু ভিডিও করলাম। পরে লিয়ানাকে বললাম, ‘তুমি শুধু হোটেলের সুনামের অংশটি বলেছ, দুর্নামটি বলোনি।’ সে হেসে বলল, ‘ভাবলাম তুমি শুনতে পছন্দ করবে না। যাক, তুমি যখন শুনতে আগ্রহী, বলি। বিপ্লবের আগে হোটেলটি ছিল মাফিয়াদের বড় মিলনকেন্দ্র। লাকি লুসিয়ানো ছিল এক মাফিয়া বস, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেয়ার পরে সে ইতালিতে থাকত। সেখান থেকে এসে আমেরিকার মব বসদের এক সভা সংগঠিত করে ২০ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে- এই হোটেলটিতে। নিউ ইয়র্ক, শিকাগোসহ আমেরিকার সব বড় শহরের মাফিয়া সর্দাররা এতে যোগ দেয়। এটিই সেই কুখ্যাত হাভানা কনফারেন্স- তাকে সেলুলয়েডে ধরে রেখেছে হলিউড ফিল্ম গডফাদার- পার্ট ২। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফিল্মটিতে তোলা হাভানা কনফারেন্স এর ছবিটি কি এ হোটেলের? অনেক আগে দেখেছিলাম, তাই মনে নেই।’ লিয়ানা যোগ করল, ‘না, এ হোটেলে মাফিয়াদের নিয়ে ছবি করার অনুমতি কিউবার বিপ্লবী সরকার দেয়নি। পরে এ দৃশ্যের জন্য পরিচালক ফ্রান্সিস ফোর্ড কোপলা বেছে নিয়েছিলেন ডোমিনিকান রিপাবলিকের এক হোটেলকে। যাক, আমাদের আরো অনেক কিছু দেখার আছে, গড ফাদারদের নিয়ে এত সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না।’ বলে লিয়ানা হাসতে লাগল।
ওরা এর পর নিয়ে গেল প্লাসা দে লা রিভলুসিয়ন-এর বিশাল চত্বরে। বললাম, ‘কত দেখেছি টিভির পর্দায় এ বিখ্যাত প্লাজা, এখানে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সে কি জ্বালাময়ী ভাষণ। বিপ্লবের সাথে এ বড় স্থাপনা করা ফিদেলের এক বড় কীর্তি।’ লিয়ানা বলল, ‘এটি বিপ্লবের আগে নির্মিত হয়েছিল, বাতিস্তার শাসনের শেষ দিকে। এই যে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫৮ ফিট উঁচু হোসে মার্টি মেমোরিয়ালটাওয়ার; এর কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে- কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা হোসে মার্টির জন্মশতবার্ষিকীতে। কাজ শেষ হয় ১৯৫৮ সালে- বিপ্লবের ১ বছর আগে। ফিদেল ক্যাস্ট্রো শুধু নাম বদলিয়েছেন- আগের নাম প্লাসা সিভিকা থেকে বর্তমান প্লাসা দে লা রিভলুসিয়ন-তে।’ বললাম, ‘বিপরীত দিকের ভবনে চে গুয়েভারার বিশাল ম্যুরাল নিশ্চয়ই পরে যোগ করা হয়েছে।’ লিয়ানা বলল, ‘দেখ, তাঁর নামের সঠিক উচ্চারণ হবে চে গেভারা। হ্যাঁ! তাঁর ম্যুরাল পরে যোগ করা হয়। আরেক বিখ্যাত বিপ্লবী ক্যামিলো সিয়েন ফুয়েগোস-এর ম্যুরালও পরে যোগ করা হয় পাশের ভবনের ওপর।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘ফিদেল কাস্ট্রোর ভাস্কর্য বা ম্যুরাল কোথায়? গত দুই দিন তাঁকে হাভানার কোথায়ও দেখিনি।’ একটু গর্বিতভাবে লিয়ানা বলল, ‘দেখ, ফিদেল কাস্ট্রো বলতেন, কোনো ভাস্কর্য বা ম্যুরাল লাগবে না, আমি থাকব মানুষের হৃদয়ে। তাই তাঁর স্মরণে শুধুমাত্র এক স্মৃতি যাদুঘর আছে, আর কিছু নেই।’
বিপ্লবের নামে এ চত্বর প্লাসা দে লা রিভলুসিয়ন- এখানে প্রায়ই বক্তৃতা দেয়া হয় আমেরিকার বিরুদ্ধে। মজার ব্যাপার হলো, চত্বরটি আমেরিকান এনটিক গাড়িতে ভর্তি, সব ছাপিয়ে এগুলিই শুধু দেখা যাচ্ছে।
এরপরের গন্তব্য এল ক্যাপিথোলিও নেসিওনাল পৌঁছে ভিনটেজ কার ছেড়ে দিতে হলো। এখানে এসে মনে হলো ওয়াশিংটন ডিসিতে আছি। বললাম, ‘এ দেখি আমেরিকার ক্যাপিটল-এর ডুপ্লিকেট। কে কাকে নকল করেছে?’ লিয়ানা অসহায় ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি ঠিক জানি না।’ বললাম, ‘হয়তো কেউ নকল করেনি। তবে পরের স্থাপত্যে অবশ্যই আগের স্থাপত্যের প্রভাব আছে। দুইটি বিখ্যাত ভবনের মধ্যে এ রকম মিল আমি আগে দেখিনি।’ বিশাল সুন্দর ভবনের ভেতরে গেলাম। মাঝখানে ৩০২ ফিট উচ্চতার সুদৃশ্য গম্বুজ, যাতে প্যারিসের বিখ্যাত প্যান্থিয়ন এর ছাপ আছে। এর ঠিক নীচে অনিন্দ্যসুন্দর এক স্থাপত্য- লা এসথাথুয়া দে লা রিপাবলিকা। ইতালীয় ভার্¯‹র এনজেলো জানেলি প্রায় ৫০ ফিট উঁচু এ ভাস্কর্য সৃষ্টি করেছেন গ্রিক দেবী এথেনার অনুকরণে। সব দেখে বের হয়ে আসলাম প্রশস্ত রাস্তার প্রান্তে, বিশাল এক চত্বরে।
এ চত্বরে বহু মানুষের ভিড়, সাথে বিচিত্র সব ভিনটেজ কার- সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পর্যটকদের ডাকের অপেক্ষায়। হাভানার এক বড় আইকন হয়ে গেছে ভিনটেজ কার।
পাসেও দেল প্রাদো-র গাছের ছায়া ঘেরা প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশে প্রমেনেড- সেখানে কারুশিল্পীদের মহামেলা। কেউ বিক্রি করছেন তাঁর আকা পেইন্টিং, কেউ তার হাতে তৈরি সুই-সুতোর নকশা, চামড়ার কাজ, হাতে তৈরি স্যুভেনির, আর রঙ বেরঙের জুয়েলারি তো আছেই। হাতির হাড় দিয়ে হাতে তৈরি একটি সুন্দর নৌকা বেশ পছন্দ হলো। লিয়ানাকে বললাম, ‘যে দেশ থেকে আমার আসা- বাংলাদেশ- তাকে জালের মতো জড়িয়ে আছে অনেক নদী- আর নদীগুলিতে বয়ে যায় এ ধরনের নৌকা। একে দেখলে আমার দেশকে মনে পড়ে।’ লিয়ানা হেসে বলল, ‘কেউ তার জন্মের দেশকে ভুলতে পারে না।’
তবে একটি বিষয় লিয়ানা ভোলেনি। বলল, ‘তোমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য বলেছিলে গ্রান থ্রিয়েথ্রো দে লা হাবানা- এটি পাশেই, এখন যেতে পারি।’
গ্রান থ্রিয়েথ্রো দে লা হাবানাআলিসিয়া আলনসো-র শুরু থিয়েথ্রো থেকন হিসেবে ১৮৩৮ সালে। এরপর একে ঘিরে আরো সুন্দর ও আরো বিশাল করে ১৯০৭ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে করা হয়েছে বর্তমান স্থাপত্য। বেলজিয়ামের ন্থপতি পল ভেলাউ এর মূল নকশা করেছেন। তাকাতেই দেখি কী দারুণ শিল্পকর্ম। সামনের দেয়াল-স্তম্ভে অনেক ছোট স্থাপত্যের মাঝে ৪টি সাদা মার্বেলের স্থাপত্য, তা চারটি বিষয়কে তুলে ধরে- দানশীলতা, শিক্ষা, সঙ্গীত ও থিয়েটার। লবিতে রাখা আছে লোরকার হাবানা সফরের স্মরণে এক প্লাক। ১৫০০ আসনের মূল হল ঘরকে লোরকার সম্মানে নাম দেয়া হয়েছে সালা গার্সিয়া লোরকা। লবির আরেক প্রান্তে রাখা আছে প্রখ্যাত নৃত্য শিল্পী আলিসিয়া আলনসোর৩ এক ভাস্কর্য। আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম, ছবি তুললাম। লোরকার স্মৃতিমাখা অনবদ্য এক থিয়েটার দেখে মুগ্ধতার অনুভূতি নিয়ে বের হয়ে আসলাম।
নিউ ইয়র্ক থেকে হাবানা আসা ছিল লোরকার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি হাবানা এসে পৌঁছেন ৭ মার্চ ১৯৩০-এ, উচ্ছ্বসিত হয়ে তার পরদিনই বাবা-মাকে চিঠি লিখেন: ৪
‘লা হাবানা’য় আমার পৌঁছানো এক বিশাল ঘটনা। এখানকার মানুষের আদরের শেষ নেই, এমন আতিশয্য কমই দেখা যায়। কিন্তু হাবানা আশ্চর্য সুন্দর, যেমন পুরোনো তেমনই নতুন এলাকাগুলো। মালাগা এবং কাদিস-এর সংমিশ্রণ, কিন্তু আরও প্রাণবন্ত, আরও শিথিল, ট্রপিক্যাল জীবনের ধারা। শহরের ছন্দোময়তায় আছে আয়েশ, স্নিগ্ধশান্ত, ইন্দ্রিয়পরতায় আচ্ছন্ন, পুরোপুরি স্পেনীয় উচ্ছ্বাসে ভরপুর, বলা ভালো আন্দালুসিয়ো। হাবানা আদতে স্পেনীয় সভ্যতা, সংস্কৃতির সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। স্বভাবতই মনে হচ্ছে, আমি বাড়িতে এসেছি।’
আবার ফিরে আসি হাবানার ঐতিহাসিক এলাকায়। লিয়ানা বলল, ‘শহরের পুরনো এলাকাটি লা হাবানা ভিয়েহা নামে পরিচিত। ১৪৯২ সালে কলম্বাস কিউবা আসার পর ১৫১৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা। এখন যাব এর কেন্দ্রে- প্লাসা দে ভিয়েহা-তে।’
এ চত্বরের মাঝখানে এক ফোয়ারা, চারদিকে ক্যাফে-রেস্তোরাঁ-বুটিক শপ- এ এক স্পেনীয় ঐতিহ্য। পর্যটকের ভিড়ে ফোয়ারাটি প্রায়ই ঢেকে আছে। প্লাসা দে ভিয়েহা-র আশে পাশে যেন চলছে গান-বাজনার আসর। লিয়ানাকে বললাম, ‘হাবানা আসার পর থেকেই সঙ্গীতের এ আসর উপভোগ করছি। তুমি যদি বাদ্যযন্ত্রগুলির নাম বল, ভালই হয়।’ লিয়ানা বেশ খুশি হয়ে বলল, ‘অবশ্যই। একটি ছোট বাজনা দলের সামনে যাই। সেখানে শুনতে শুনতে বোঝাব। তবে এসব বাজনা মূলত কিউবানদের ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত- সন কুবানো।’ কাছেই দুই জনের একটি দল বাজাচ্ছে ড্রাম। লিয়ানা শুরু করল তার সঙ্গীত শিক্ষা, ‘যে ড্রাম দুইটি নিচু, হাঁটু দিয়ে ধরা, তার নাম বংগো। আর লম্বা উঁচু ড্রাম দুইটির নাম কংগা।’ এরপর দেখি একটি বক্স জাতীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে একলা বাজাচ্ছে এক শিল্পী। জানলাম যন্ত্রটির নাম কাহন। লিয়ানা বলল, ‘এরপর বড় এক দলের বাজনা শুনি। ৫ জনের একটি দল চমৎকার সন কুবানো বাজনা বাজিয়ে চলছে। লিয়ানার সঙ্গীত শিক্ষা চলল, ‘গিটারের মতো বাদ্যযন্ত্রটির নাম থ্রেস। তুমি এতদিনে জেনেছ স্পেনীয় শব্দ থ্রেস মানে তিন। এ যন্ত্রটির ৩টি তার আছে, তাই এই নাম। বলা যায় থ্রেস কিউবার জাতীয় বাদ্যযন্ত্র, যা সন সঙ্গীতের প্রাণ। আগেই দেখেছ, শুনেছ- লম্বা ড্রামটি কংগা, হাঁটুতে ধরা ড্রামটি নাম বংগো। এরপর খুবই পরিচিত স্পেনিশ গিটার। একজন ছোট ঝুনঝুনি দুইটি তালে তালে বাজাচ্ছে, তার নাম মারাকাস। আজ এতটুকুই থাক।’ এতটুকু জেনেও বেশ ভাল লাগল। বললাম, ‘পৃথিবীর কোনো শহরের পথে পথে, মোড়ে মোড়ে এরকম গানবাজনা জীবনে শুনিনি, এ রকম আনন্দ দেখিনি। মনে হচ্ছে পুরো শহরে চলছে এক উৎবব, তোমাদের ভাষায় ফিয়েস্তা।’ লিয়ানা একটু ম্লান হেসে বলল, ‘কিউবায় সাধারণ মানুষের অনেক অভাব, অনেক কষ্ট। নাচ-গান দিয়ে তারা কিছু আয় করে, এতে অভাব কিছুটা ঘুচে, আর কষ্টটা কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকে।’
একটু হেঁটে গেলাম প্লাসা দে লা কাথেদ্রাল চত্বরে। এখানেই ঐতিহ্যবাহী এক গীর্জা- কাথেদ্রাল দে সান ক্রিস্টোবাল।
লিয়ানা বলল, ‘ইতিহাসে একটু ফিরে যাই। ২০ মে ১৫০৬ সালে কলম্বাস মারা গেলে তাঁর দেহাবশেষ স্পেনে ছিল। পরে এই কাথেদ্রালে সমাহিত রাখা হয় ১৭৯৫ থেকে ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত। কিউবা স্বাধীন হয়ে গেলে কলম্বাসের দেহাবশেষ আবার স্পেনের সেভিয়া কাথেদ্রালে নিয়ে সংরক্ষিত রাখা হয়। এখানে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের স্মরণে একটি মনুমেন্ট আছে। এখন আমরা সেখানে যাব।’ এরপর আমরা একটু হেঁটে গেলাম পাশের এক বড় চত্বরে, এক কোনায় নাম লেখা আছে প্লাজা দে আরমাস। নামটি পরিচিত মনে হচ্ছে। মনে পড়ল, এ রকম এক চত্বর আছে আমাদের টেক্সাস এর এক ঐতিহাসিক শহর সান এন্টিনিওতে। লিয়ানাকে তা বলতেই সে জিজ্ঞেস করল শহরটি কোন সময় স্পেনীয় শাসনে ছিল কিনা। বললাম যে, সান এন্টিনিও শহরটি প্রায় ১০০ বছর স্পেনের অধীনে ছিল। লিয়ানা বলল, ‘স্পেন যে সব দেশ শাসন করেছে তার অনেকগুলিতে প্লাজা দে আরমাস চত্বর আছে। এর সোজা ইংরেজি অর্থ হলো আর্মস স্কোয়ার। এটি ছিল স্পেনীয় শাসকদের মূল সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। আর এখানে হতো সৈন্যদের কুজকাওয়াজ, বা বিশেষ কোন জমায়েত। হাবানার এই প্লাজা দে আরমাস এর সবচেয়ে পুরনো স্কোয়ার। এর চারটি অংশ আছে, প্রথমটি দিয়ে আমরা শুরু করি।’
প্লাজা দে আরমাস এর অংশ বারোক স্থাপত্যের এ বিখ্যাত ভবনটিতে থাকতেন স্পেনিশ গভর্নররা। সেজন্য এর নাম ছিল প্লাসিও দে লস কাপিথানেস জেনারেলেস, আর এখনকার নাম মুসেও দে লা সিয়ুদাদ- শহরের যাদুঘর। গভর্নরদের ব্যবহার করা আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র এখানে রাখা আছে। মাঝখানের আঙ্গিনায় আছে ক্রিস্টোফার কলম্বাস এর এক উঁচু মনুমেন্ট। স্পেনীয় শাসনামলে এটি নির্মাণ করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল, তা এখনো সুরক্ষিত আছে।
যাদুঘরের সামনের রাস্তা দেখিয়ে লিয়ানা বলল, ‘দেখ, এটি বুঝতে পার কিনা’। রাস্তাটির পাথরগুরি একটু অন্য রকম মনে হলো। তবে এটি কিসের ঠিক ধরতে পাররাম না। সমাধান করে দিল লিয়ানা, ‘রাস্তাটির টাইলসগুলি কাঠের। স্পেনীয় আমলে এটি ছিল নুড়ি পাথরের রাস্তা। এর ওপর ঘোড়ার চলাচলে বেশ শব্দ হতো, যা কোন এক গভর্নরের সিয়েস্তার৫ ব্যাঘাত ঘটায়। তাই তার নির্দেশে পাথর সরিয়ে এখানে বসানো হয় কাঠ।’
বললাম, ‘নুড়ি পাথরের রাস্তায় ঘোড়ার চলাচলের শব্দ আমার কাছে খুবই ভালো লাগে, মনে হয়ে সঙ্গীতের মতো। আমি সেভিয়াতে তা দেখেছি, শুনেছি।’
কাঠের রাস্তার ওপর পুরোনো বইয়ের অনেকগুলি দোকান। কিউবার বিপ্লবের আগের সময়েরও দুস্প্রাপ্য অনেক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, ম্যাপ, বই বিভিন্ন তাকে সাজিয়ে রাখা আছে বিক্রির জন্য। সাথে আছে ভিনাইল এলবাম, মনোগ্রাম, মুদ্রা, তৈজসপত্র এবং আরো হাজারো রকমের জিনিস। এখানে বেশ দরকষাকষিও চলে। দুইটি স্যুভেনির নিলাম প্রিয় দুইজন ব্যক্তির- আর্নেস্ট হেমিংওয়ের চিনামাটির এক ছবি, আর চে গেভারার একটি বই- The Motorcycle Diaries: A Journey Around South America।
লিয়ানা হাসতে হাসতে বলল, ‘এত সব পুরনো জিনিস দেখতে দেখতে আমার মাথা ধরে গেছে। এখন একটু বিশ্রাম দরকার।’ বললাম, ‘চল, কাছের কেনো রেস্তোরাঁয় কিছু স্ন্যাকস খেয়ে নিই।’ ফোন দেখে বলল, ‘আমাকে ২০ মিনিটের মধ্যে যেতে হবে। তোমার সাথে কনট্র্যাক্ট টাইম-এর মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আর আমার ছেলেকে স্কুল থেকে পিক আপ করতে হবে। বরং চল হাঁটতে হাঁটতে কোকোনাট ওয়াটার পান করতে থাকি। অসুবিধে নেই তো?’ বললাম, ‘এটি দেশে থাকতে আমার খুব প্রিয় ছিল।’ পাশের এক স্টল থেকে দুইটি কচি ডাব নিলাম। ওরা কেটে স্ট্র দিয়ে হাতে দিল। হাতে নিয়ে লিয়ানা বলল, ‘সামনেই একটি পার্ক- প্লাজা দে আরমাস-র কেন্দ্রে। ভালই হলো, সবুজ গাছপালার মাঝে একটু রিফ্রেস হওয়া যাবে। এই পার্কে অনেক সিভ গাছ আছে, এ গাছের হাওয়া খুব স্বাস্থ্যকর। লিয়ানা পার্কের কেন্দ্রে একটি সাদা মার্বেলের মনুমেন্টের সামনে এসে থামল। কিছুক্ষণ শ্রদ্ধার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এ মনুমেন্টে দাঁড়িয়ে আছেন কার্লোস মানুয়েল দে সেসপেদেস৬- ১০ অক্টোবর ১৮৬৮ সালে কিউবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে এ দেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেন।’ এরপর লিয়ানা নিয়ে গেল এক ছোট উপাসনা কক্ষের সামনে, বলল, ‘এ হচ্ছে হাবানা-র জন্মস্থান, এর নাম এল থেমপ্লেথ-এ স্থানেই ১৫১৯ সালে স্পেনীয়রা হাবানা শহরের পত্তন করে এক সিভ গাছের ছায়ায়, খ্রিস্টীয় ধর্মীয় উপাসনা ও সিটি কাউন্সিলের সভার মাধ্যমে।’ একই স্থানে আছে লোহার বেড়া দেয়া এক সিভ গাছ, সে সময়ে এই গাছ লাগানো ছিল। যোগ করল, ‘শত বছর পরে গাছটি জরাজীর্ণ হয়ে গেলে নতুন একটি সিভ গাছ লাগানো হয়। এভাবেই চলে আসছে ১৫১৯ সাল থেকে। কিউবার কালোদের কাছে এ গাছ খুবই পবিত্র। প্রতি বছর ১৬ই নভেম্বর সান ক্রিস্তোবাল দে লা হাবানা-র ভোজের দিনে লোকজন এখানে লাইন ধরে ৩ বার এ সিভ গাছটি প্রদক্ষিণ করে সুখ ও স্বাস্থের জন্য প্রার্থনা করে।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ কালোরা কি কিউবার আদি বাসিন্দা?’ লিয়ানা ম্লান মুখে বলল, ‘এ কালোরা হলো ক্রীতদাসদের বংশধর। কিউবার মূল অধিবাসী হলো তায়িনো গোষ্ঠী, যারা স্পেনীয় শাসনে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে রোগশোক ও বাধ্যতামূলক শ্রমের কারণে। একই অবস্থা পুরো দক্ষিণ আমেরিকায়। তাই স্পেনীয়দের তামাক, আখ ও কফি খামারে কাজ করার জন্য জন্য লোক ছিল না। আফ্রিকা থেকে কালোদের কিউবায় আনা হয়েছিল এসব কৃষি ক্ষেত্রে কাজ করানোর জন্য। তারা ছিল ক্রীতদাস। অনেক সংগ্রামের পর ক্রীতদাসদের সরকারিভাবে মুক্তি দেয়া হয় ৭ই অক্টোবর ১৮৮৬ সালে।’ একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিয়ানা বলল, ‘ঔপনিবেশিক শাসন বহু দুঃখ নিয়ে আসে। স্পেনের ৪০০ বছরের শাসনে আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এক মজার কথা বলি। স্পেনীয় কলোনিয়াল রক্ত আমার মধ্যেও আছে। আমার দাদার বাবা ছিলেন স্পেনের এক সাদা লোক, তার স্ত্রী ছিলেন আফ্রিকার কালো মেয়ে। তাদের বংশধর আমি- তাই আমার মধ্যে সাদা ও কালো রক্ত দুইটিই আছে। কিউবাতে আমাদেরকে ডাকা হয় মুলাতা বলে- আদর করে হোক, বা ঘৃণা করেই হোক।’ বলেই লিয়ানা হাসতে লাগল। মনে পড়ল এই শব্দটি এক বইয়ে আগে দেখেছি। বললাম, ‘আমার প্রিয় কবি লোরকা তোমাদের সৌন্দর্যের অনেক প্রশংসা করেছিলেন। তোমাকে দেখে মনে হলো তিনি একটুও বাড়িয়ে বলেননি।’ লিয়ানা বলল, ‘গ্রাসিয়াস! তোমার কবি কি বলেছেন তা কি শুনতে পারি?’ বললাম, ‘তা হলে শোন।’ লোরকা বলেছেন, ‘পৃথিবীর সুন্দরীশ্রেষ্ঠাদের সেদিন দেখতে পেলাম। এই দ্বীপের নারীদের মধ্যে আসল সৌন্দর্য দেখা যায় কারণ কিউবার মানুষদের মধ্যে কালোদের রক্ত মিশে আছে। যত কালো তত সুন্দর। সৌন্দর্য আর রূপের নিখুঁত দৃষ্টান্ত ‘মুলাটা’ মেয়েরা (কালো ও সাদার সংকর)।’৭ লিয়ানা হাসতে হাসতে বলল, ‘কবিরা সবকিছু একটু রঙ লাগিয়ে বলেন। যাহোক, লোরকার মতো এক কবি যখন বলেছেন, কথাটির মূল্য অবশ্যই আছে।’
পার্ক থেকে বের হয়ে এ্যাভেনিদাদেল পুয়ের্থো সড়ক ধরে লিয়ানাকে অনুসরণ করে আসলাম হাবানা হারবারের সামনে। বুকে ক্রস এঁকে সামনের পাহাড়ের ওপর এক মনুমেন্ট দেখিয়ে সে বলল, ‘জেসাস এখানে দাঁড়িয়ে পুরো হাভানাকে দেখছেন, আর আমাদের জন্য প্রার্থনা করছেন। ৬৬ ফুট উঁচু এ মনুমেন্টটি কিউবার স্থপতি হিলমা মাদেরার সৃষ্টি। এটি তৈরি করা হয়েছে ৬৭টি মার্বেলের খ- দিয়ে, যা ইতালি থেকে আনা, তার আগে মার্বেলগুলি আশীর্বাদপুষ্ট করেছেন স্বয়ং পোপ এল পাপা পিও ডসে৮। যে পাহাড়টি দেখছ তার নাম লা কাবানিয়া। এর ওপরে জেসাস এর মনুমেন্টটির নাম এল ক্রিস্টো দে লা হাবানা। এটি উদ্বোধন করা হয় ২৮ ডিসেম্বর ১৯৫৮। এর মাত্র ১৫ দিন পর ফিদ্রেল কাস্ট্রো কিউবার বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে হাবানা প্রবেশ করেন।’
যিশুখ্রিস্টের ভাস্কর্যের দিকে ঝুঁকে বুকে আরেকবার ক্রস করল লিয়ানা। এরপর বলণ, ‘এখন আমাকে যেতে হবে। কিউবার ইতিহাস ও মানুষ নিয়ে তোমার আগ্রহ দেখে খুশি হলাম। ভাল থাকবে, নিরাপদে থাকবে।’
লিয়ানা একজন অসাধারণ গাইড ও ভাল মনের মানুষ। তার কথা অনেকদিন মনে থাকবে।
এ্যাভেনিদাদেল পুয়ের্থো সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে হেঁটে চলেছি। হোটেল কাছেই,এল মালেকোন এর শুরুতে, তবে ফেরার তাড়া নেই। ভাবছি হাবানা হারবারে সূর্যাস্ত দেখে ডিনার সেরে হোটেলে ফিরব। পড়ন্ত বিকেলের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে, সূর্যাস্তের বেশি দেরি নেই। এরপর ব্যালকনিতে বসে রাতের সাগর দেখব।
এ্যাভেনিদা দেল পুয়ের্থো যেখানে মিশেছে এল মালেকোন এর সাথে, সেখানে বাঁয়ে চোখ পড়ল এক মনুমেন্টে। হয়তো স্পেনের বা কিউবার ইতিহাসের বিখ্যাত কারো ভাস্কর্য। ভাবলাম এক পলক দেখে আসি। কাছে যেতেই চেনা চেনা মনে হলো। সামনে যেয়ে পলকহীন দাঁড়িয়ে থাকলাম বিস্ময়ে, আনন্দে, ভালোবাসায়। উনি আর কেউ নন, আমাদেরই কবিগুরু- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সূর্যের সোনালি আভা তাঁর চোখেমুখে পড়ে তাঁকে লাগছে আরো সুন্দর, আরো মহান। এ রাস্তা দিয়ে অনেকবার আসা যাওয়া করেছি, কিন্ত তখন তাঁকে দেখতে পাইনি। তাই গুন গুন করে গেয়ে উঠলাম: ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি।’
হাবানার হারবারে পশ্চিম দিগন্তে রবি অস্ত যাচ্ছে, কিন্ত আমাদের রবি আছেন, থাকবেন হিয়ার মাঝে লুকিয়ে যুগ-যুগান্তর। ক্রমশ...
Ref:
হাবানা শহরটির অবস্থান এক সংযোগ স্থল, স্ট্রেট অফ ফ্লোরিডায়- যেখানে গালফ অফ মেক্সিকো মিশেছে আটলান্টিকে। সেভাবে কিউবার অবস্থান ভৌগলিক ও সামরিক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর অবস্থান আটলান্টিক, গালফ অফ মেক্সিকো ও ক্যারিবিয়ান সাগরের সংযোগস্থলে। তাই দেশটি ছিল স্পেন থেকে নিউ ওয়ার্ল্ডের প্রবেশপথ- Gateway to New World। ফ্লোরিডা, দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় স্পেনের অভিযান, কলোনি স্থাপন ও শাসনে কিউবা ছিল স্পেনের মূল সামরিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। এ সব কলোনি থেকে জাহাজে করে সম্পদ হাভানা বন্দর থেকে স্পেনে পাঠানো হতো।
লোরকার চিঠি: হাবানা, ৫ এপ্রিল, ১৯৩০ সালে মা-বাবাকে লেখা: অনুবাদ: তরুণ কুমার ঘটক: গ্রন্থ: লোরকার চিঠি, প্রকাশক: অনুষ্টুপ প্রকাশনী, কলকাতা।
আলিসিয়া আলনসো (Alicia Alonso) ছিলেন কিউবার অসাধারণ প্রতিভাময়ী একজন নৃত্য শিল্পী। তাঁকে দেয়া হয়েছিল দুর্লভ সম্মান- প্রিমা ব্যালেরিনা আসুলুতা (Prima Ballerina Assoluta)। ছোট বেলা থেকে আংশিক অন্ধ হলেও স্টেজে বিশেষ আলোর সহায়তায় তিনি নাচ প্রদর্শন করতেন। ৭২ বছর বয়সে আলিসিয়া আলনসো স্টেজে শেষ বারের মতো নাচে অংশ নেন। নৃত্য শিল্প নিয়ে তাঁর আগ্রহে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যালে নেসিওনাল দে কুবা- যার প্রধান থিয়েটার গ্রান থ্রিয়েথ্রো দে লা হাভানাআলিসিয়া আলনসো।
লোরকার চিঠি: হাবানা, ৮ মার্চ, ১৯৩০ সালে মা-বাবাকে লেখা, অনুবাদ: তরুণ কুমার ঘটক, গ্রন্থ: লোরকার চিঠি, প্রকাশক: অনুষ্টুপ প্রকাশনী, কলকাতা।
সিয়েস্তা (Siesta): দিবানিদ্রা, যা স্পেনে জনপ্রিয়।
কার্লোস মানুয়েল দে সেসপেদেস (Carlos Manuel de Cespedes) ছিলেন কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা। তিনি মূলত ছিলেন এক বড় কৃষি খামারের মালিক। তাঁর খামারের ক্রীতদাসদের মুক্তি দিয়ে তিনি ১০ অক্টোবর ১৮৬৮ সালে কিউবার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৮৬৯ সালে তাঁকে যুদ্ধকালীন সময়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এতে শুরু হয় স্পেনের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ১০ বছরের যুদ্ধ। ফেব্রয়ারি ১৮৭৪ স্পেনীয় সৈন্যরা কার্লোস মানুয়েল দে সেসপেদেস-কে হত্যা করে। এ যুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা হেরে যায়। এর পরে স্পেনের শাসনের বিরুদ্ধে কিউবানরা দ্বিতীয়বার যুদ্ধ করে ১৮৭৯ থেকে ১৮৮০ সালে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৫ সালে শুরু হয় তৃতীয় দফায় স্বাধীনতা যুদ্ধ। এর নেতৃত্বে থাকেন হোজে মার্টি, এন্তোনিও মাচেও এবং ম্যাক্সিমো গোমেজ। এ সময়ে স্পেন ২,২০,০০০ সৈন্যের এক বাহিনী পাঠায় কিউবায় তার স্বাধীনতা যুদ্ধকে দমন করতে। ১৮৯৮ সালে কিউবার পুরো গ্রামাঞ্চল স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দখল করে নেয়, স্পেনীয় সৈন্যরা শহরে আবদ্ধ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক সে সময় কিউবায় ছিল। কৃষি খামারে তাদের ছিল বড় বিনিযগে। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবন ও স্বার্থ সংরক্ষণে নৌ বাহিনীর জাহাজ USS Maine ২৫ জানুয়ারী ১৮৯৮ সালে পাঠানো হয় হাবানায়। এ সময় একটি ঘটনা যুদ্ধের পুরো মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৮ সালে হাবানা হারবারে টঝঝ গধরহব ডুবিয়ে দেয়া হয়। স্পেনের এক মাইন দিয়ে তা করা হয় বলে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে। (পরে ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন আধুনিক পরীক্ষা নিরিক্ষার সাহায্যে সংঘটিত অনুসন্ধানে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, কোনো মাইন নয়, বরং এক দুর্ঘটনার ফলে জাহাজটি ডুবে যায়)। জাহাজডুবির ঘটনার প্রতিক্রিয়ায এপ্রিল ১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবাবাসীর পক্ষে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, শুরু হয় স্পেনীয়-আমেরিকান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যরা কিউবা, পোর্টিরিকো ও ফিলিপাইনে অবতরণ করে। সে বছরই প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে স্পেন কিউবা পরিত্যাগ করলে সেখানে তার প্রায় ৪০০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সেই সাথে প্রোর্টিরিকো ও ফিলিপাইনের অধিকারও হারায় স্পেন। এ হলো বিশাল স্পেনীয় সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়। ২০ মে ১৯০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র কিউবা ত্যাগ করলে সে দেশ অবশেষে স্বাধীনতা লাভ করে।
লোরকার চিঠি: হাবানা, ৫ এপ্রিল, ১৯৩০ সালে মা-বাবাকে লেখা, অনুবাদ: তরুণ কুমার ঘটক, গ্রন্থ: লোরকার চিঠি, প্রকাশক: অনুষ্টুপ প্রকাশনী, কলকাতা।
এল পাপা পিও ডসে (El Papa Pio Doce): Pope Pius Xii-এর স্পেনীয় নাম।