আনোয়ার মল্লিক
কাল বিচারে শামস আল মমীন গত শতকের সত্তরের দশকের কবি। যদিও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চিতায় ঝুলন্ত জ্যোৎস্না’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। শামস আল মমীন এক ধরনের সহজবোধ্য, ন্যারেটিভ ফর্মে কবিতার শরীর নির্মাণ করেন। কোনো অপ্রচলিত অথবা দুর্বোধ্য শব্দ দ্বারা ভারাক্রান্ত নয় তাঁর কবিতা।এছাড়া তাঁর কবিতার ভাষা কোমল কিন্তু হৃদয়-স্পর্শী।অনেক কবিতায়তিনি সার্থকভাবে আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার করেছেন।ভাবনাকে উন্মোচনের ক্ষেত্রে শৈল্পিক নিপুণতায় রূপক এবং চিত্রকল্পের অবতারণা করেনতিনি। আর এই চিত্রকল্প উঠে আসে তাঁর চারপাশের চেনা অনুষঙ্গ থেকে। ফলে তাঁর কবিতার সঙ্গে পাঠক সহজেই একাত্ম হতে পারেন। সবমিলিয়ে তিনি নিজস্ব একটা কাব্যস্বর নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন -যার দ্বারা সহজেই তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করা যায়।
শামস আল মমীন শিক্ষা উপলক্ষে ১৯৮২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও রাজ্যে যান।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে দীর্ঘ তিরিশ বছর তিনি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থেকে বর্তমানে এই শহরেই অবসর জীবন যাপন করছেন।
মমীন বাংলার পাশাপাশি মূলধারার ইংরেজি কবিতার চর্চা করেন।বিভিন্ন মার্কিন পত্রিকায় তাঁর কবিতা নিয়মিত ছাপা হয়।এক ব্ল্যাক হিস্ট্রি মান্থে তাঁর বর্ণবাদ বিরোধী ইংরেজি কবিতা নিউইয়র্কের কলেজ পাঠ্যক্রমেও স্থান পেয়েছিলো।
যৌবনের প্রারম্ভে মমীন দেশ ছাড়েন।এ কারণে এদেশের কোনো কাব্য আন্দোলন বা গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি শারীরিকভাবে শামিল হতে পারেননি। কেন্দ্র থেকে এই দূরে অবস্থানের ফলে নব্বইয়ের কাব্য-আঙ্গিকের সঙ্গে তাঁর একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।তবে শামস আল মমীনের যে কাব্য প্রকরণ, সেটাও এক অর্থে অনন্য। এই কাব্য ভাষা একান্তই তাঁর নিজস্ব।কবিতা কখনও একজায়গায় থেমে থাকেনা।সতত পরিবর্তনশীল এর গতিপথ। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থে এ বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। গ্রন্থগুলো যেমন- মনোলগ(২০০১),সাম্প্রতিক আমেরিকান কবিতা (২০০৯),আমি সেই আদিম পুরুষ (২০১২),আমি বন্দী খোলা জানালার কাছে(২০১৪), কেউ হয়তো আমাকে থামতে বলবে (২০১৬),নির্বাচিত কবিতা (২০১৭) এবং টু ফরটি নাইন স্ট্রীট, বেলরোজ(২০২৫)।
শামস আল মমীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম কয়েক বছর খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। মাসের পর মাস কোনো বাংলাভাষী মানুষের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, প্রবাস জীবনের প্রথম কয়েক বছর তিনি দেশীয় খাদ্যের স্পর্শ পর্যন্ত পাননি। খুবই সংগ্রামমুখর ছিল সেই দিনগুলি। এইসব প্রতিকূলতা, বৈরী পরিবেশ তিনি অতিক্রম করে গেছেন স্বদেশকে ভালবেসে, স্বদেশের স্মৃতি রোমন্থন করে।
মমীনের কবিতায় ছড়িয়ে থাকে জন্মভূমিরপ্রতি গভীর অনুরাগ।প্রবল মমতায় তিনি তুলে আনেন তাঁর শৈশব, কৈশোরে দেখা বাংলাদেশের নিসর্গ চিত্রাবলি।আবহমান বাংলার মানুষ এবং জীবনের অনুপুঙ্খ চিত্র অবলীলায় উঠে আসে তাঁর কবিতায়। তিনি যখন দেশ ছাড়েন, সেই আশির দশকে বাংলাদেশে আজকের মতো জৌলুস ছিল না। দুঃখী, হতদরিদ্র ছিল এদেশের জীবন। বাংলাদেশকে নিয়ে লেখা মমীনের ‘কেমন আছো তুমি’ কবিতায় আমরা তার একটি আবেগময় চিত্র ফুটে উঠতে দেখি-“তোমাকে দেখেই বুঝে নিতে পারি তুমি/আছো কেমন।জন্ম দুঃখের নোলক/ পরে কার্তিকের আকালের মত ঘুরেফিরে আসো/ তুমি। তোমার অ-বলা জিভ অকস্মাৎ রোদ ওঠা/ আকাশের চেয়ে তপ্ত।সক্রেটিসের কথার মতো/ তোমাকে আমরা বুকে বুকে রাখলাম। হেমলকে/ তুমি জান কোরবান করোনি।” (কেমন আছো তুমি, নির্বাচিত কবিতা)।
কবি উন্নত বিশ্বের সুউচ্চ অট্টালিকার আলো ঝলমলে এক কসমোপলিটন নগরে বসবাস করেন। বিত্তবৈভব আর প্রাচুর্যের ছড়াছড়ি এই নগরে।জীবন এখানে সকল প্রকার নাগরিক সুবিধায় ভরপুর। বস্তুগত সুখের সকল উপাদান এখানে হাতের মুঠোয়।তারপরও আমরা লক্ষ্য করি,কবির মধ্যে এক ধরনের হাহাকার। যান্ত্রিক নগরের এইসব কৃত্রিম ঐশ্বর্য কবিকে কাছে টানে না। তারচেয়ে বরং তাঁর ফেলে আসা শৈশবের ভাঙ্গা বাড়ি, নির্মল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা এখনো কবিকে স্মৃতিকাতর করে তোলে।
“আমাদের বাগান বাড়ি ছিল না।বাড়ির সামনে
বিষণœ যে ক্ষেতটুকু... সেও
তৃষ্ণায় তাকিয়ে থাকে ভাঙ্গা বাড়িটার দিকে
পথে পথে কারা যেন ফেলে রাখে ব্যথিত বকুল।
আমি বারবার
এখানে এসেই ঝরে পড়ি
এখানে এলেই দেখি উঁকি দিয়ে যায় শীতল বাতাস।”
(স্মৃতি, নির্বাচিত কবিতা)।
শামস আল মমীন স্বল্পপ্রজ কবি।সর্বসাকল্যে সাতটি তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থ।তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থও অনেক বিলম্বে প্রকাশিত হয়েছে।এর পেছনে তিনি দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত আশি এবং নব্বইয়ের দশকে আমেরিকায় বাস করে বাংলায় কবিতা লিখে বই বের করা বর্তমানের মতো এতো সহজ ছিলোনা।দ্বিতীয়ত, আমেরিকার যান্ত্রিক এবং ব্যস্ততাপূর্ণ জীবনও ছিলো তাঁর কাব্য-স্বল্পতার অন্যতম কারণ।
মমীন কবিতায় রংপুরেরপ্রচলিত আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করতে ভালোবাসেন। এবং সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করলে তাঁর কিছু কিছু কবিতার বুননে একটা আঞ্চলিক স্বরভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়।
“এই মাটি, নদীজল, ফলফুল খেতে, জলের নরমে হাত / রেখে,সবুজের গানে শ্বাস নিতে কি যে ভালো লাগছে আমার!/দুনিয়াটা বড়, অন্তত তুমি যা ভাবো তার চেয়ে বড়। / ভিনদেশে গিয়ে কত কিছু দেখি, চোখ বড় করা /দৃশ্য আর আকাশে আকাশে জোছনা ভরা চাঁদ দেখি, ওরা/ চেনে না আমাকে কেউ, ওরা কেউ চেনে না পদ্মা ব্রহ্মপুত্র, কিন্তু/ রংপুর থেকে বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ থেকে / রাধানগর,কুতুবপুর থেকে বিষ্ণুপুর মাইলে মাইলে আমার বন্ধু/আছে, এবং শত্রুও কম নাই; / ওদের সবার সাথে আমার কথা হয় নাই...তবু/আমি জানি হঠাৎ বৃষ্টিতে/ কেউ না কেউ ঘরের ভেতরে বসতে দেবে / কেউ না কেউ বলবে, ফির আইসেন বাহে..” (ফির আইসেন বাহে)।
এই কবিতায় স্বদেশের রুপময় প্রকৃতি এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক জীবনবোধের এক অনুপম চিত্র অংকন করেছেন কবি।
শামস আল মমীন জীবন যাপনে যেসব ঘটনার মুখোমুখি হন অথবা অথবা যেসব ঘটনা তাকে তাড়িত করে, সেইসব চেনা ঘটনাই তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়ে আসে।
মমীনের মনোজগতে মানবিক বেদনাবাধের একটা অনুরণন আমরা লক্ষ্য করি। কবিতায় তিনি কোনো জটিল বিষয়ের অবতারণা করেন না। অথবা প্রকরণের নামে কবিতাকে অকারণ দুর্বোধ্য করে তোলাতেও তাঁর আপত্তি আছে।তাঁর কবিতার শরীর মসৃণ, আকর্ষণীয় এবং মেদহীন।তাঁর কবিতার চিত্রকল্প এক অজানা ভালোলাগায় মনকে ঋদ্ধ করে।তবে একটা কথা স্বীকার করতে হবে,তাঁর কবিতায় ছন্দের বৈচিত্র্য অনুপস্থিত।মুক্তছন্দেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি। সেকারণেই হয়তো তাঁর প্রায় সব কবিতা মুক্ত ছন্দে রচিত।
তাঁর কবিতা সহজ, বর্ণনাধর্মী,তবে চিত্রকল্পময় যা সহজেই পাঠককে আকৃষ্ট করে।পুঁজিবাদী বিশ্বের অমানবিকতা,যুদ্ধের বিভীষিকা এবং বর্ণবাদী বৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখা তাঁর কবিতা প্রবল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে স্বদেশের রূপময় নিসর্গ এবং সাধারণ মানুষের সহজাত জীবনালেখ্য তাঁর কবিতার প্রধান উপলক্ষ হয়ে ওঠে।