যান্ত্রিক জোছনা
জিললুর রহমান
মাঝরাতে ঘুলঘুলিজুড়ে
যান্ত্রিক জোছনা
মেশিনের খটমটে শব্দ জেগে আছে-
ঝিঁঝি নেই, পেঁচা নেই,
দীর্ঘশ্বাস আছে ঢের।
চলো উড়ি-
কৃত্রিম চন্দ্রালোকের দড়ি বেয়ে
মত্ত হই,
ভীষণ অসুস্থ হই,
অন্ধকার হই আলোর গভীরে-
ব্ল্যাকহোল ছাড়া
আলোকের আর কোনো ভবিতব্য নেই।
সবার আগে বাংলাদেশ
হাসানাত লোকমান
শ্যামল হেম হাওরের কোমল জলছায়ায়
ভেসে আসে আমার হৃদয়, শিশুদের গান নিয়ে।
বিকেলের নীরব বাতাসে, মিষ্টি আমের সুবাসে
আমার রক্তের ঢেউ নেমে আসে মাটির মায়ায়।
পাহাড়ের চূড়ায় সূর্যের রোদ পড়ে
যেন প্রতিটি কণায় স্বাধীনতার দীপ জ্বলে।
নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকালে
প্রতিটি ফেনায় লুকানো আছে বীরের গল্প,
প্রতিটি বালি দানায় ভরা আছে ত্যাগের রূপকথা।
আমার শহর, আমার গ্রাম, আমার পথের ধুলো
সবই বলে- আমি তোমার জন্য জন্মেছি।
আমার চোখের আকাশ, আমার হাতের বাতাস,
সবই আঁকড়ে ধরে তোমার ছবি,
বাংলাদেশ, আমার হৃদয়ের প্রথম ঢেউ।
রঙিন ফুলের ঘ্রাণে, জোছনার রাতে,
মাছের ঝিলমিল চোখে, পাখির উড়ান পথে,
তোমার রক্তের লাল, তোমার মাঠের সবুজ,
তোমার নদীর নীরব স্রোত
মিশে গেছে আমার শ্বাসে, আমার কবিতায়,
মিশে গেছে আমার অথৈ ভালোবাসায়।
সবার আগে বাংলাদেশ-
যে নাম শুনলেই বুকে বাজে সবুজ শান্তির দীপ্ত ধ্বনি,
যে নদীর ঢেউয়ে বাজে ইতিহাসের রক্তিম শপথ,
যে আকাশে উড়ে অমর স্বাধীনতার অগ্নিপাখা,
যে মাটির বুকে জ্বলে প্রাণের পিদিম,
আমার শ্বাসে আগুন, আমার রক্তে বাংলাদেশ।
প্রশ্নাঞ্জলি
আসিফ নূর
আহত ও নিহত আকাশপ্রেমী পাখিদের পাশে
রক্তমাখা পালকের রূপে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে
অসংখ্য দীর্ঘশ^াস। হাহাকারের এই ভাগাড়কে
কেন তুমি বিহঙ্গের উদার অভয়ারণ্য বলো?
মৃত্যুভূমির রঙে করুণ এই নিরাক প্রান্তরে
বৃক্ষরোপণের নামে কেন সবুজের ডাক পাড়ো?
দ্বিধাহীন মিথ্যের কুহকে সত্য ডাকছ প্রত্যহ,
ছাইচাপা আগুনের প্রতিশোধ কী করে ঠেকাবে?
কী দিয়ে নেভাবে জল; জ¦লে যদি তুমুল তুফান?
জোনাকদ্বীপ
এমরান কবির
ভাসমান রেখা ধরে একটি জোনাক পোকা
ভুল করে ঢুকে গেলো বালিকার বক্ষদ্বীপে
তারপর প্রজ¦লিত শিখা আলো ঝলমল তীরে
খানিক আঁধার তার দোলায়িত নীড়ে
জোনাক দেখতে থাকে যমজ পাহাড়ে
কীরূপ সহ¯্র পাখি ওড়ে শুধু ওড়ে
তবু কেন এই ছেদ, তবু কেন বেঁধে রাখা বাঁধা
জোনাক জানবেও না জোনাকের মাঝে জোনাকের ধাঁধা
বালিকার দ্বীপেদ্বীপে অথই সন্ধ্যা অগাধ
জোনাক হারিয়ে যায় হারিয়ে জোনাক-বাঁধ
দ্বীপ-স্বপ্নে দেখা হবে যত দূরেই থাকো-না সাবালিকা
একটি জোনাক একটি জোনাক কখনো থাকে না একা
কবি, ওহে কবি
জলিল আহমেদ
প্রেমের কবিতা তুমি এঁকে দিও আমারই শরীরে
তারুণ্যের উতলা ক্যানভাসে
না-হয় তা রেখে দিয়ো তুলির আঁচড়ে যৌবনের আনাচে কানাচে
ঘামের শরীরে মাখা ফুলের গতরে, তুমি এঁকো।
বয়সের ভার নিয়ে মধ্য বয়সে এসে যে শিশুরা আহ্লাদে থাকে
তাদেরও পাঞ্জাবিতে তুমি গেঁথে দিয়ো প্রেমের বোতাম
অথবা শাড়িতে রেখো ফুল করা পাড়-ভালবেসে।
বৃদ্ধেরা শৈশবে যায়- তাদেরকে আগলে রেখো সোহাগের কোলে।
এইভাবে লিখে যেয়ো প্রেমের কবিতা-
ওহে একবিংশের কবি পরত্রিংশেও পা ফেলে ফেলে।
তামাটে শহর
ফকির আবদুল মালেক
রাজপথ শুয়ে আছে সমতল পৃথিবীর বিছানায়-
আকাশে সাদা আগুনের লেলিহান শিখা,
তৃষ্ণার্ত শকুনের চোখ আটকে যায় রাজপথের দিকে।
কংক্রিট আর পিচের সেই আষ্টেপৃষ্ঠে আলিঙ্গন-
গলে গিয়ে একে অপরকে ছেড়ে দিতে চাইছে।
নেড়িকুত্তার জিহ্বা-লালাহীন, পানিশূন্য, একখ- মাংসপি-
পলিথিনের ব্যাগের নেশায় মত্ত কুত্তার সহচর বালকেরা।
এয়ার কন্ডিশন চিকন নলে তিরতির করে পেচ্ছাপ করে যাচ্ছে-
সেই নোনা জলে মুখ ধুয়ে নিচ্ছে একদল পলিথিন-মত্ত উত্তরাধিকার।
অবাক হবার দিন শেষ
শারদুল সজল
রাস্তায় পিটিয়ে পিটিয়ে
কোনো মাকে হত্যার দৃশ্য
কিম্বা ধর্ষণ শেষে শিশুর ছিন্নমস্তক রাস্তায় পড়ে থাকলেও
অবাক হইনা
অবাক হইনা
প্রেমিক প্রেমিকা একে অন্যকে খুন করলে
কিম্বা বৃদ্ধ মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে দিলেও
চমকে উঠিনা
চমকে উঠিনা
মানুষের মুখে দাঁতাল শকুনের ছায়া দেখে
থানা-হেফাজতে নিরিহ মানুষের ওপর অত্যাচারে
প্রতিবাদ করি না
প্রতিবাদ করিনা
সন্ত্রাসে...সর্বগ্রাসী লুণ্ঠনে
হত্যাগুলো পরিবেশন হচ্ছে নাস্তার টেবিলে টেবিলে
সকাল বিকেল দুপুরে
তবুও মানুষ খাচ্ছে... নাচছে...
মৃত্যুগুলো হজম করে বাঁশির সুরে বাজছে
কিন্তু অবাক হচ্ছে না...
এভাবেই অবাক হবার দিন শেষ
এভাবেই চমকে ওঠার দিন শেষ
এভাবেই আমাদের প্রতিবাদ করার দিন শেষ
রাষ্ট্র
ঋজু রেজওয়ান
মরা কান্না করে...
পাড়া শুদ্ধ ক্ষীর
কাঁধে লেগেছে চোট
হাতও ভাঙা খুব।
ঘাড়ও বাকি নেই,
অতটুকু শরীরে...
ব্যথায় জরজর
চলে না, দু’খানি পা
কোমর গেছে ভেঙে!
চলো, হাসপাতালে...
ডাক্তার সাহেব
নিজ কাজে মগ্ন
করে না শুশ্রƒষা
আমার প্রিয়, ভাঙা!
সেকেলে সাইকেল।