image

সুদের হার কমানো ‘খুব সহজ নয়’: অর্থ উপদেষ্টা

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হার চট করে কমিয়ে আনা ‘খুব একটা সহজ কাজ না’ বলে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘খুব সহজ কাজ না রেট অব ইন্টারেস্ট কমিয়ে দেওয়া। এখানে আপনার ব্যাংক রেটের সাথে ট্রেজারি বিলের রেট আছে। এগুলো চট করে একদিকে কমিয়ে দিলে অন্যদিকে বেলুনের মতো। আপনি চাপ দিলেন (এক দিকে) আরেক দিকে ফুলে যাবে, আলটিমেটলি ফেটেই যাবে। অতএব একটু কনসিস্টেন্সি লাগে।’

শনিবার, (১০ জানুয়ারী ২০২৬) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ব্যাংকিং অ্যালমানাকের ৭ম সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে নীতি সুদ হার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ছয়-নয়ের সুদের হার বাজারভিত্তিক করায় নয় থেকে ঋণের সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশে পোঁছছে। এতে করে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিনিয়গ প্রবণতা কমে একদম তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। উল্টোদিকে মূল্যস্ফীতি কমাতে যে সুদের হার বাড়ানো হলো তাতে কিছুটা সুফল মিললে গত দুই মাস ধরে তা উর্ধ্বমূখী হয়ে আছে।’ কেবল সুদের হারই যে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম না তাও এখন মানছেন অর্থ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘তবে ইন্টারেস্ট যে কমে নাই তা না। ট্রেজারি বিল তো কমে গেছে, বোধহয় ১২ ছিল এখন ১০ না? যারা ট্রেজারি বিল কেনেন তারা দেখছেন। তো কমছে তো, এটার রিফ্লেকশন মার্কেটে (আছে)। হয়তো তথ্যটা (এখনো) আসে নাই। আবার ট্রেজারি বিল বা গভর্নমেন্ট বরোয়িং যদি বাড়িয়ে দেয় লোকজন আপনার ব্যাংকেই টাকা রাখবে না। সবাই সঞ্চয়পত্র বা ট্রেজারি বিলে চলে যাবে। সেটা আমরা চাই না। আসলে ব্যাংক ইজ দ্য ইন্টারমিডিয়ারি বা নন-ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন ইন্টারমিডিয়ারি, তারা আপনাদের সঞ্চয় আর ক্রেডিটের মধ্যে একটা ব্রিজ তৈরি করে, তাই তো কাজ ব্যাংকারদের।’

অর্থ উপদেষ্টার ভাষ্য, ‘তবে ব্যাংকিং সেক্টরটা মোটামুটি কিন্তু আমরা যেটা ইনহেরিট করেছি, অনেকটা স্টেবল, বিশেষ করে ম্যাক্রো ইকোনমিক স্টেবিলিটিটা। মানে সামষ্টিক। এখন যদি আপনি দেখেন ইনফ্লেশন বেড়ে গেছে দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ইনফ্লেশনটা খুব সেনসিটিভ জিনিস আই অ্যাগ্রি। কিন্তু ইনফ্লেশন তো শুধু মনিটারি পলিসি, ব্যাংক রেট পলিসি রেট বাড়িয়ে কন্ট্রোল করা যায় না, সাপ্লাই দিয়ে অনেক সময় কন্ট্রোল করতে হয়। আমি সেজন্য সবসময় বলি ইনফ্লেশন ইজ আ পলিটিক্যাল ডাইমেনশন।’

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘ইনফ্লেশন... আপনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের একটা ম্যাজিস্ট্রেটকে পাঠিয়ে দিলেন কারওয়ান বাজারে, গিয়ে একটা ফাইন করল ৫ লাখ টাকা। একটু পরেই সবাই চাঁদা তুলে ৫০০ টাকা করে ৫ লাখ টাকা দিয়ে দিল। ‘তোকে (ওই ব্যবিসায়ীকে) দিলাম ৫ লক্ষ টাকা ফাইন দিয়েছিস, আবার তোর কাজ একইভাবে শুরু কর’। তো এটা তো সমস্যার সমাধান না।’

তিনি বলেন, ‘কমিউনিটি তারপর যারা হোলসেলার ট্রেডার এবং রিটেইলার তাদেরকেও তো সহযোগিতা করতে হবে। একসেস প্রফিট করা বা আউট অব দ্য ওয়ে প্রফিট করা মজুদ করা— সেটা কিন্তু সরকারের পক্ষে কিন্তু করা যায় না। যে কোনো দেশেই কিন্তু যেন মার্কেট স্মুথ হয়, মনিটরিংটা স্মুথ হয়, সবার সহযোগিতা থাকলে হয়। শুধু এই কতগুলো ফিসক্যাল পলিসি, মনিটারি পলিসি আর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বা ক্যাব কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ এগুলো দিয়ে ওরা পারবে না। আমরা চেষ্টা করেছি মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে আসছে আরকি।’

এখন একটা স্থিতিশীল অবস্থায় বাংলাদেশ এর অর্থনীতিকে আনা হয়েছে দাবি করে পরবর্তী সরকার এটি চলমান রাখবে বলে তিনি তুলে ধরেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ছিলেন অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউন্স ডিভিশনের সচিব নাজমা মোবারেক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় শিক্ষাবিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা শিক্ষাবিচিত্রার উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানা’ গবেষণা গ্রন্থটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে।

প্রতিবছর একটি মোড়কে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলী, সেবা এবং কর্মদক্ষতা সূচকের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত সর্বসাধারণের সম্মুখে তুলে ধরা হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত যে বিস্তর তথ্য-উপাত্তের উপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রেখে যাচ্ছে ব্যাংকিং অ্যালমানাক তারই সুসংগঠিত বার্ষিক হালনাগাদ তথ্য-ভা-ার। গবেষক, পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ।

এছাড়া ব্যাংক খাতে বর্তমানে উচ্চ সুদহারের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়- এই দুই উৎস থেকেই তহবিল পাওয়া যাচ্ছে। ব্যাংক খাতকে আরও কার্যকর ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকার থেকেও আসছে। এরপরও কেন সুদহার এতটা বেড়ে গেছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়।’

আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘সাধারণভাবে চাহিদা ও সরবরাহের ভিত্তিতেই সুদহার নির্ধারিত হয়। চাহিদা বেশি হলে সুদহার স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। তবে সরকারি ঋণ গ্রহণ যদি বেসরকারি খাত থেকে কমানো যায়, তাহলে সুদহার কিছুটা কমতে পারে। সম্প্রতি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সরকারি বন্ডের সুদহার কমানোর কথা বলেছেন, যাতে ব্যাংক খাত থেকে তহবিল অন্যদিকে সরে না যায়। ব্যাংক খাতে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও বর্তমানে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ না থাকায় অনেক ব্যাংক উদ্বৃত্ত অর্থ কাজে লাগাতে পারছে না। দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য এখনো অনুকূল নয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা অনেকটাই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’

ব্যাংক খাতে আস্থার সংকটের কথাও তুলে ধরেন আবদুল হাই সরকার। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচার-বিবেচনা ছাড়াই কিছু ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ায় এ খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বড় অঙ্কের অর্থ দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে, যা সুদহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সুদহার বেশি হলে রপ্তানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অনেকটাই নির্ভর করে আর্থিক খরচের ওপর। ফাইন্যান্সিং কস্ট বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।’

ব্যাংকিং অ্যালমানাক প্রসঙ্গে বিএবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘এটি ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা।

এতে দেশের সব ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা, খেলাপি ঋণ (এনপিএল), আর্থিক সূচকসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এই বইটি একটি কার্যকর রেফারেন্স হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে বিদেশে পাঠানোর আগে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।’

‘অর্থ-বাণিজ্য’ : আরও খবর

সম্প্রতি