ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন বিএনপিপন্থী পাঁচ কর্মচারী।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বরাবর আবেদন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ করেন তারা। আর নির্বাচন পর্যন্ত নিয়োগ বন্ধ রাখার দাবি করেন।
একদিন পর আজ বৃহস্পতিবার এই আবেদনে স্বাক্ষর করা কর্মচারীদের কর্মস্থলে দলবেঁধে উপস্থিত হয়ে হুমকির অভিযোগ এসেছে একদল কর্মচারী ও ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামের একটি সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে। আবেদনকারী এক কর্মচারীর সঙ্গে তাদের বাকবিতন্ডা ও গায়ে হাত তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলের আবেদনকারী এক কর্মচারীর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই কর্মচারী হলেন হলের নিন্মমান সহকারী ও আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী কর্মচারী ফেডারেশনের যুগ্ম-আহ্বায়ক মাসু্দুর রহমান।
নিম্নমান সহকারী কর্মচারী স্বাক্ষর ‘জালিয়াতি করে’ ওই আবেদন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ‘জুলাইয়ের বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামের সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকর্মী। আজ বৃহস্পতিবার ‘এখতিয়ার বহির্ভূত ও প্রমাণহীন’ অভিযোগ উল্লেখ করে উপাচার্য বরাবর পাল্টা অভিযোগ দেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
ওই আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেন, কর্মচারী মাসুদুর রহমান ও স্টুয়ার্ড শাখার আরেক কর্মচারী পিয়ারুল ইসলামসহ ৫ জন।
ওই আবেদন তারা বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে রুটিন ওয়ার্ক নিয়মে। অন্যান্য সবই ন্যস্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগ একটি নীতিনির্ধারণী বিষয়। বর্তমানে সরকার এই কাজ থেকেও বিরত রয়েছে। নির্বাচন সংক্রান্ত এই আইন মেনে চলতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের জন্যও প্রযোজ্য’।
তারা আরও বলেন, ‘একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সন্ত্রাসী কর্মী বাহিনীকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী হিসেবে গণহারে দৈনিক মজুরি ও এ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগদানের জন্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম শীর্ষ কর্তাদের একটি অংশ এবং বাইরের উক্তরূপ রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এটি সরকার ও দেশবিরোধী একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র বলে আমরা মনে করি। চাকরি প্রত্যাশীরা সংঘবদ্ধভাবে প্রতিনিয়ত রাজশাহী বিশ্বদ্যিালয়ে দিনে-দুপুরে মহড়া দিচ্ছে, ফলে ক্যাম্পাসে আতঙ্কজনক ও ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা ক্যাম্পাসে তাদের প্রবেশ সীমিত করতে এবং চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধের অনুরোধ করছি।’
কর্মচারীদের এ অভিযোগের পরে দলবেঁধে শহীদ হবিবুর রহমান হলে মাসুদুর রহমানসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে উপস্থিত হন একদল কর্মচারী ও ওই সংগঠনের নেতারা। কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে তারা এই আবেদনের বিষয়ে জবাবদিহি করেন। এ সময় তারা কর্মচারী মাসুদকে কার্যালয় থেকে তুলে আনার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোতাহের হোসেন এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বরাবর একটি আবেদন করেন। আবেদনে হল প্রাধ্যক্ষ বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২ টায় অন্তত ৫০ জনের অজ্ঞাতনামা বহিরাগত একটা গ্রুপ আকস্মিকভাবে হলে প্রবেশ করে মাসুদুর রহমানকে ঘিরে ধরে মারধর করার চেষ্টা চালায়। তারা সন্ত্রাসী আচরণ করে এবং এক পর্যায়ে তাকে হল থেকে উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় তারা মাসুদকে হল গেট পর্যন্ত টেনে হেচড়ে নিয়ে যায়। এতে চরম হৈচৈ শুরু হলে সাধারণ ছাত্র ও অপর স্টাফরা এগিয়ে আসেন। পরে তারা কর্মচারীকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়ে হল ত্যাগ করে।’
জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়ে হল প্রাধ্যক্ষ বলেন, ‘হলে বর্তমানে আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হলের স্টাফ ও শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সংঘটিত ঘটনাটি একটি সন্ত্রাসী ঘটনা এবং প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
এ বিষয়ে কর্মচারী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘একদল বহিরাগত আমাকে হুমকি দিয়েছে এবং টেনে হিচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। হামলা করার ঘটনায় জড়িত সকলের বিচার চাই আমি।’
*পাল্টা অভিযোগ ‘জুলাই বাস্তবায়ন কমিটির’*
কর্মচারী মাসুদুর রহমান স্বাক্ষর জালিয়াতি করে গতকালের আবেদন করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামের সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মী। তারা আজ এ ঘটনার পরে উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন।
ওই আবেদনে তারা বলেন, ‘উদেশ্যপ্রনোদিতভাবে কিছু দিনমজুর ও একটি রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে অসত্য, বানোয়াট ও প্রমাণহীন অভিযোগ সংযোজন করা হয়েছে। উপাচার্যের দায়িত্বকে রুটিন ওয়ার্ক বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কর্মচারী একটি স্মারক লিপিতে সম্মানহানীকর বক্তব্য প্রদান করেছে। একই সঙ্গে তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের পরস্পর সহযোগী দুইটি বন্ধুপ্রতীম সংগঠনের মধ্যে সংঘাতকে উস্কে দিচ্ছে। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটতে পারে। যা প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে গুরুতর আপত্তিকর। উক্ত কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের এখতিয়ার বহির্ভূত এবং সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধি পরিপন্থী। এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
এ বিষয়ে জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক ও স্থানীয় কাটাখালির হরিয়ান এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম এবং নিয়োগ বন্ধ চাওয়া পাঁচ জনের সাথে কথাও বলেছি। তারা এ ধরনের আবেদন করতে পারেন না। তারা কেন এই আবেদন করেছেন আমরা তাদের থেকে সেটি জানতে চেয়েছি। তাদের ৫ জনের মধ্যে দুজন এ আবেদনে স্বাক্ষর করতে না চাইলেও তাদের স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।’
সংগঠনটির ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আছি এই অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য না। আমাদের ছাত্রদল-শিবির সবার সঙ্গেই বন্ধুত্ব আছে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, ‘হবিবুর রহমান হলে ওই কর্মচারীর সঙ্গে তাদের তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটেছে। তারা ওই কর্মচারীকে হুমকি দিয়েছেন এবং গায়েও হাত তুলেছেন বলে অভিযোগ পেয়েছি। যে কেউ যেকোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করতে পারেন। তবে তার জন্য এমন হুমকির ঘটনা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আমরা এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহা. মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনও অবগত না। খোঁজ নিয়ে বিস্তারিত বলতে পারব।’