যথাসময়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীসহ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তারা।
এতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীসহ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) সন্ধ্যা ৭টায় উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় শাকসু নির্বাচনের দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকে তারা।
এর আগে স্বতন্ত্র এক প্রার্থীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দুপুরে শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই নির্দেশনা জানার পরপরই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা।
দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক অবরোধ করে তারা। এতে সড়কের উভয়পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি চালিয়ে যায়। এরপর ক্যাম্পাসের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। এ সময় ‘শাকসু আমার অধিকার, রুখে দেয়ার সাধ্য কার’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে তারা।
বিক্ষোভে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য প্যানেল’, ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল, বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর আজ সকাল ৯টায় শাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুর কথা ছিল। তবে সোমবার হাইকোর্টের আদেশে নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত হয়।
সোমবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। এ সময় তারা নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিটকারী সহ-সভাপতি (ভিপি) পদপ্রার্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুমিনুর রশীদ শুভকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে। প্রার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী ফয়সাল হোসেন।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়েছে।
এদিকে শাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষক সমাজেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নেই’- এমন অভিযোগ তুলে শাকসু নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন বিএনপিপন্থি আটজন শিক্ষক। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি আশরাফ উদ্দিন জানান, পদত্যাগকারী কমিশনারদের পাশাপাশি ১৫০ জন শিক্ষক নির্বাচন সংক্রান্ত সব দায়িত্ব থেকে বিরত থাকবেন।
পদত্যাগকারী কমিশনারদের মধ্যে ছয়জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন- অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, রেজোয়ান আহমেদ, মো. মাহবুবুল আলম, মো. আশরাফ সিদ্দিকী, মুহ. মিজানুর রহমান ও জি এম রবিউল ইসলাম।
অন্যদিকে একই দিন দুপুর দেড়টার দিকে জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সাস্ট চ্যাপটারের পক্ষ থেকে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংগঠনের সদস্যসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রিটের রায় শাকসু নির্বাচনের বিপক্ষে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সে বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।’
এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিলে উপাচার্য এ এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সহ-উপাচার্য মো. সাজেদুল করিম এবং কোষাধ্যক্ষ মো. ইসমাইল হোসেন সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তারা প্রশাসনিক ভবনেই অবস্থান করছিলেন।
তোপের মুখে বিএনপিপন্থি শিক্ষক, ‘দালাল-দালাল’ স্লোগান
এদিকে, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বের হতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন।
সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ফটক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
তখন বিভিন্ন প্যানেলের সমর্থক শিক্ষার্থীরা সেখানে শাকসু নির্বাচন নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত ও আজ ভোটের দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক কিলো পার হয়ে ফটক এলাকায় পৌঁছান। তখন তিনি বিক্ষোভের মুখে পড়েন। রাস্তা পার হওয়ার সময় তার পেছনে পেছনে ‘দালাল- দালাল, ভুয়া-ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে চলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। একটি দোকানে গেলে সেখানেও বিক্ষোভ করেন তারা।
পরে কয়েকজন শিক্ষার্থী আশরাফ উদ্দিনকে দোকান থেকে বের করে নিরাপদে চলে যেতে সাহায্য করেন।
শিক্ষার্থীদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘আমি ক্যাম্পাস থেকে আসার সময় তারা (শিক্ষার্থীরা) ভুয়া-ভুয়া বইলা চিৎকার করতেছে। আমি দাঁড়ায় গেছি। আমার ডাইরেক্ট ছাত্র, ক্লাসের ছাত্র, শিবিরের নাকি লিডার! সে আমার সামনে এসে বলতেছে, ভুয়া-ভুয়া-ভুয়া। তারা এটা করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘তাদের যত ক্ষোভ থাক, কষ্ট থাক, সবকিছু করতে পারে। এটা করতে পারে না। ফরিদ উদ্দিনের (সাবেক ভিসি) আমলে একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম, যে ছাত্রদের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওদের যদি কিছু বলার থাকে, ওরা আমার কাছে আসুক, অফিসে আসুক। কিন্তু শিক্ষকদের সঙ্গে এটা করতে পারে না। তাদের এত সাহস কেন?’
শাকসু নির্বাচনের ভিপি পদপ্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভসহ তিনজনের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে ভোট চার সপ্তাহের জন্য স্থগিতের আদেশ দেন হাইকোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর আজ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল।