‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার পর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করায় ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার, (২০ জানুয়ারী ২০২৬)ও রাজধানীর গ্রিন রোডে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন একদল শিক্ষার্থী। তারা এখন ভিসি অধ্যাপক কামরুল আহসানের পদত্যাগসহ ১৬ দফা দাবি জানাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার বিকেলে শিক্ষার্থীদের ইমেইল পাঠিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস বন্ধের সিদ্ধান্ত জানায়। শায়েখ আহামাদুল্লাহর সঙ্গে ছবি তোলার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শমসাদ আহমেদকে শোকজ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে এবং সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশিরের বিরুদ্ধে ‘হিজাব পরায় ছাত্রীকে হেনস্তার’ অভিযোগ তুলে গত রোববার আন্দোলন শুরু করেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত রোববারই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব বেসিক সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির ও বিভাগীয়প্রধান সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীনকে চাকরিচ্যুত করে নোটিশ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীনের বিরুদ্ধে ‘আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ততার’ অভিযোগ এনেছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ‘আমাদের একজন শিক্ষক শায়েখ আহমাদুল্লাহর সঙ্গে ছবি তোলায় তাকে শোকজ করা হয়। সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির শুরু থেকেই ইসলামী মাইন্ডেডদের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেন। সহযোগী অধ্যাপক এ এস এম মহসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তিনি হাদির গুলি খাওয়ার পোস্টে ‘হা হা রিয়েক্ট’ দিয়েছিলেন। ওই দুই শিক্ষককে বরখাস্ত করা হয়েছে। আমরা এখন ভিসির পদত্যাগসহ ১৬ দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছি।’
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ‘লায়েকা বশির ২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় অনলাইন পরীক্ষায় এক নারী শিক্ষার্থী হিজাব পরায় তার সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেন। গত ১০ ডিসেম্বরও তিনি হিজাব নিয়ে কটূক্তি করে ফেইসবুকে পোস্ট দেন। এর জেরে শিক্ষার্থীরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘কোনো রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে? শিক্ষার্থীরা আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগস আনছে তা ঠিক নয়। অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থী যদি মুখ ঢেকে থাকে, তাহলে তাকে শনাক্ত করা যায় না। ভাইভা নেয়ার জন্য পরিচয় নিশ্চিত হতে হয়। তাই কোভিডের সময় এক ছাত্রীকে অনলাইন ভাইভায় মুখ খুলতে বলেছিলাম। সেই ভিডিও এখন সামনে এনে অপপ্রচার করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি গত ডিসেম্বরে ঢাকার মোহাম্মদপুরে জোড়া খুনের ঘটনার প্রেক্ষাপটেই একটা পোস্ট দিয়েছিলাম মুখ ঢেকে রাখা বিপজ্জনক উল্লেখ করে। সেটা শুধু বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করা থাকলেও তার স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পরে, আমার কোনো ফেইসবুক বন্ধুই হয়তো ছড়িয়েছে।’
দুই শিক্ষককে যেভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তার সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। ‘দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দঙ্গলবাজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারী ভূমিকার নিন্দা ও প্রতিবাদ’ শীর্ষক ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু স্বাধীন মত প্রকাশ বা ভিন্ন মত পোষণ করার কারণে অনেক শিক্ষককে হেনস্তা ও হয়রানি করা হচ্ছে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই ধর্মানুভূতিকে ঢালাওভাবে সস্তা ঢাল বানানো হয়েছে। এই প্রবণতারই সর্বশেষ শিকার রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীর এবং তাকে সমর্থন করার কারণে ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক এবং বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এস এম মহসীন।’
শিক্ষক নেটওয়ার্ক বলছে, ‘সচেতন মহল মাত্রই জানেন, কলা ও মানবিক এবং সামাজিক বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনে সমাজের প্রথাগত অনেক বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে একাডেমিকভাবেই ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। শিক্ষকরা সেভাবেই পাঠদান ও জ্ঞানচর্চা করেন। কিন্তু একজনের সঙ্গে অন্যজনের শুধু চিন্তা ও আদর্শের পার্থক্য আছে বলে, সুপরিকল্পিতভাবে ও নানান অজুহাতে শিক্ষকের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা খর্ব করে দঙ্গলবাজির মাধ্যমে তাকে চাকুরিচ্যুত করার দাবি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক নিন্দনীয় নজির স্থাপন করেছে।’ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ‘দঙ্গলবাজ শিক্ষার্থী’ ও তাদের প্রতি নমনীয় মনোভাব পোষণকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়ে চাকরিচ্যুত দুই শিক্ষককে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে।