বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে মণ্ডপে মণ্ডপে বাণী অর্চনা, আরতি ও ভক্তদের পুষ্পাঞ্জলিতে আরাধনা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা। জগন্নাথ হলের খেলার মাঠের চারদিক দিয়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী দেবীর পূজার আয়োজন করা হয়েছে এবারে।
সেগুলোর মধ্যে ৭৪টি মণ্ডপ বিভিন্ন বিভাগ এবং সমাজের বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের ‘থিমের’ আদলে গড়া হয়েছে। প্রতিটি ম-পেই শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে সকাল থেকে। সেগুলোর মধ্যে দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব’ রুখে দেয়ার বার্তা ছড়িয়ে দিতে একটি মণ্ডপ বানিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
আয়োজকদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শ্রাবস্তী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা শুধু থেমে থাকা কলম কিংবা পোড়া সংবাদপত্রের কথা বলিনি। কথা বলতে চেয়েছি সমস্ত নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ‘অস্পৃশ্য হরিজন থেকে রক্ত জল করে জীবনের শেষ জীবনীশক্তি নিংড়ে দেওয়া চা শ্রমিক, যিনি যোগ্য মজুরিটুকু পায় না কিংবা প্যালেস্টাইলে ভাঙা ধ্বংসস্তুপে পড়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুর লাশ। সবকিছুকে ঘিরে একটা বার্তা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। যুদ্ধ না, শান্তি। মব নয়, সুবিচার।’
শুক্রবার,(২৩ জানুয়ারী ২০২৬) সকালে বাণী বন্দনা এবং পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে বসন্ত পঞ্চমী তিথির মধ্যে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৮টায়, যা শেষ হয় সকাল ১০টার দিকে। অন্যান্য বছরের মতো এবারও ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশে’ সরস্বতী পূজা পালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবাশীষ পাল।
তিনি বলেন, ‘এবার খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা হচ্ছে। তবে সকাল থেকে এতো লোকের জনসমাগম, আমি এর আগে কখনো দেখিনি। প্রথমে দুইটি গেইট রেখেছিলাম, পরে আরেকটি গেইট খুলে দিতে হয়েছে মানুষের জনসমাগমের জন্য। সকাল থেকে এত মানুষ, আমি মনে করি, এবার আমাদের সরস্বতী পূজা গিনেজ বুকে নাম লিখাবে।’
অন্য বছরের মতো এবারও দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা তৈরি করেছে চারুকলা অনুষদ, যা বসানো হয়েছে হলের পুকুরের মাঝে। একই সঙ্গে বেশ বিভিন্ন থিমের আদলে জাকজমকভাবে মণ্ডপ বানিয়ে পূজা উদযাপন করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী রাজা তালুকদার বলেন,‘প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও খুব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবেই জগন্নাথ হলে আয়োজিত হয়েছে বিদ্যার দেবী সরস্বতী মার আরাধনা। লাখো ভক্তবৃন্দের সমারোহে এদিনটি আমরা খুব উৎসবমুখর পরিবেশে কাটাই।
‘সাধারণত মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে (বসন্ত পঞ্চমী) বিদ্যালাভের কামনায় আমরা সরস্বতী পূজা ও আরাধনা করে থাকি। আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা, বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী যেন সবাইকে বিদ্যা দান করেন, বিদ্যার আলো জগতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।’
‘বিশ্বব্রহ্মা-’ তুলে ধরে মণ্ডপ বানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স বিভাগ। তাদের একজন রাতুল চক্রবর্তী বলেন, ‘মা সরস্বতী সবার। আমরা চাই, পুরো ‘বিশ্বব্রহ্মা- তার কৃপা লাভ করুক। এ বিশ্ব শান্তিময় হোক।’ অন্যদিকে লাইব্রেরির আদলে সরস্বতীর মণ্ডপ বানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ।
এই বিভাগের শিক্ষার্থীর ভাষ্য, ‘সরস্বতী বিদ্যার দেবী। বইও যেহেতু বিদ্যার প্রতীক, আমরা চেষ্টা করেছি সরস্বতী বিদ্যা দান করুক। আলোকিত মানুষ হতে হলে বইয়ের কোন বিকল্প নেই।’ এছাড়া দর্শনার্থীদের ভীড়ও দেখা গেঝে চোখে পড়ার মত। অনেকে পরিবার নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে দেখতে এসেছে এবারের সরস্বতী পূজা দেখতে।
খিলগাঁও থেকে পরিবার নিয়ে আসা সৌরভ দাশ বলেন,‘ঢাকায় তো তেমন জায়গা নেই। আমরা আসলে ঘুরতে পারি না। কিন্তু জগন্নাথ হলে আসলে মনে হয়, এক অন্যরকম। এতো সুন্দর করে সাজানো, আয়োজন, এত বিশাল জায়গা ভালো লাগে। ছেলে মেয়েরা এখনো ছোট কোথাও নিয়ে যেতে পারি না। যেহেতু পূজা তাই পরিবার নিয়ে আসলাম ঘুরতে।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর পূজা হয়। হাতে বীণা থাকে বলে সরস্বতীকে বীণাপাণিও বলা হয়। সাদা রাজহাঁস এ দেবীর বাহন। ঐতিহ্য অনুযায়ী এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরোহিতের মন্ত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বিদ্যাদেবীর মন্দিরে সন্তানদের প্রথম বিদ্যার পাঠের হাতেখড়ির আয়োজন করেন।
এবার জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে দুদিনব্যাপী সরস্বতী পূজার আয়োজনে থাকছে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা এবং রক্তদান কর্মসূচি। এছাড়াও হলের ভেতরে দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের জন্য বেশ কিছু রাইড, খেলনা ও খাবার দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এবারের পূজায়।