image

১৩ বছর আগে জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে বেরোবি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) দীর্ঘ ১৩ বছর আগে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তাবিউর রহমান প্রধানকে সরকারি চাকরিবিধি ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী শিক্ষক পদ থেকে চাকরিচ্যুত করে তাকে প্রদত্ত বেতন ভাতা আদায় করার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করা এমনকি সভার সিদ্ধান্তের রেজ্যুলেশন না লেখার বিষয়টি দৈনিক সংবাদে খবর প্রকাশিত হওয়ায় অবশেষে সিন্ডিকেট সভার রেজ্যুলেশন লিখতে বাধ্য হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

শুধু তাই নয়, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেরোবির আইন উপদেষ্টার মতামতও প্রদান করা হয়েছে। আইন উপদেষ্টা তাবিউর রহমানকে শিক্ষক পদ থেকে পদচ্যুত করা এবং দীর্ঘদিন ধরে বেআইনিভাবে বেতন ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা আদায় করতে বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী কোনো আইনি বাধা নেই বলে লিখিতভাবে জানিয়েছে। বেরোবির আইন উপদেষ্টা সুপ্রীম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহাদত হোসেন অ্যাডভোকেট গত ১২.১.২৬ইং তারিখে প্রদান করেছেন বলে বেরোবির রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত ও আইন উপদেষ্টার মতামত সম্বলিত কাগজ দৈনিক সংবাদ প্রতিনিধির কাছে এসেছে।

এ ব্যাপারে বেরোবির রেজিস্ট্রার ড. হারুন অর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক পদ থেকে তাবিউর রহমানকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্তের কথা স্বীকার করলেও আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেজিস্ট্রার দপ্তরের একজন কর্মকর্তা শুক্রবার সংবাদকে জানিয়েছেন তদন্ত প্রতিবেদন সিন্ডিকেট সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এবং বেরোবির আইন উপদেষ্টার লিখিত মতামত দেয়ার পর উপাচার্য যে কোনো সময় তাকে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করতে পারেন কিন্তু তিনি তা করছে না। এ ঘটনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এর আগে শিক্ষক তাবিউর রহমানের বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃতভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী মো. মাহামুদুল হককে বঞ্চিত করে তাবিউরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডের সুপারিশে কাটাছেঁড়া করে ‘যে কাউকে’ বলে তাবিউরের নাম কলম দিয়ে বসানো হয়। এই প্রতিবেদন দেয়ার পরও নানান অজুহাতে ওই তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অবৈধভাবে দাপট দেখিয়ে ১৩ বছর ধরে অবৈধভাবে শিক্ষকতা করা বেরোবির শিক্ষক তাবিউর রহমান প্রধানের নিয়োগে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আবারও উচ্চপর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ আদালতের রুল জারি ও দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ১১৩তম সিন্ডিকেট সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম শাহিদুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত বিভাগের (অব.) শামসুল আলম সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো. হারুন অর রশিদ। তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত করে তাবিউর রহমানের নিয়োগ অবৈধ ঘোষণা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াসহ প্রতিবেদন জমা দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ নভেম্বর বেরোবির ১১৮ তম সিন্ডিকেট সভায় অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া তাবিউর রহমানকে সরকারি চাকরিবিধি ২০১৮ অনুয়ায়ী চাকরিচ্যুত ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে এ ব্যাপারে বেরোবির আইন উপদেষ্টার মতামতও নিতে বলেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সভার সিদ্ধান্ত রেজ্যুলেশন আকারে লিখতে কর্তৃপক্ষের টালবাহানা ও বেরোবির আইন উপদেষ্টার মতামত নেয়ারও চিঠি না দেয়ায় এ ব্যাপারে দৈনিক সংবাদে খবর প্রকাশিত হলে বেরোবি প্রশাসন রেজ্যুলেশন ও বেরোবির আইন উপদেষ্টাকে চিঠি দিতে বাধ্য হয়। এতকিছুর পরও অবৈধভাবে নিয়োগ হাতিয়ে নেয়া তাবিউর রহমানকে এখনও চাকরিচ্যুত না করার বিষয়টি বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে খোদ শিক্ষকদের মাঝে।

যেভাবে নিয়োগ জালিয়াতি করার অভিযোগ ওঠে

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ২৯ অক্টোবর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের জন্য অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক (স্থায়ী) পদে একটি এবং সহকারী অধ্যাপক/প্রভাষক দুটি স্থায়ী পদে বিজ্ঞাপন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে তাবিউর রহমান প্রধানসহ মোট ২২ জন প্রভাষক পদে দরখাস্ত করেন। পরের বছরের ১৩ জানুয়ারি প্রভাষক পদের জন্য বাছাই বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। বাছাই বোর্ড যথাক্রমে মোহা. মাহামুদুল হক ও নিয়ামুন নাহারকে অপেক্ষমান তালিকায় রেখে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু বাছাই বোর্ডের সুপারিশপত্রে দেখা যায়, ‘জালিয়াতি’ করে অপেক্ষমান তালিকায় তৃতীয় হিসেবে তাবিউর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বাছাই বোর্ডের পর।

বাছাই বোর্ডের সুপারিশপত্রে দেখা যায়, কম্পিউটারে কম্পোজকৃত ‘মেধাক্রমানুসারে’ শব্দটি কলম দিয়ে কেটে ‘যে কোনো’ শব্দটি লেখা হয়েছে সুপারিশপত্রে। ওই সুপারিশপত্রে বলা হয়েছে ‘চূড়ান্তভাবে মনোনয়নপ্রাপ্ত আবেদনকারী ওই বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করতে অপারগ হলে অপেক্ষামান তালিকা থেকে প্রথমজনকে নিয়োগ করার সুপারিশ করা হলো। অপেক্ষমান তালিকার প্রথমজন যোগদানে অপারগ হলে দ্বিতীয়জনকে নিয়োগ করার জন্য সুপারিশ করা হলো।’ তালিকায় তৃতীয়জন সম্পর্কে কিছুই বলা নেই কারণ ওই সিরিয়ালই ছিল না, এজন্য যে দুটি পদের বিপরীতে দু’জনকে অপেক্ষমান তালিকায় রাখা হয়েছিল। এরপর ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ২১তম সিন্ডিকেট অপেক্ষমান তালিকায় দু’জনের পরিবর্তে তৃতীয়জন তাবিউর রহমানের নাম অনুমোদন করা হয় এবং বলা হয় নিচের তালিকা থেকে ‘যে কাউকে’ নিয়োগ দেয়া যাবে। সিরিয়াল রাখা হয় ১. মোহা. মাহামুদুল হক ২. নিয়ামুন নাহার ৩. তাবিউর রহমান প্রধান। এতে মেধাতালিকার প্রথমজন যোগদান না করায় তার নিয়োগ বাতিল করা হয়। উল্লেখ্য, যে অপেক্ষামান তালিকায় দু’জনের পরিবর্তে ‘জালিয়াতি’ করে তাবিউরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় ও সিন্ডিকেটে অনুমোদন দেয়া হয়।

একই সিন্ডিকেটে (২১তম) অনুমোদনপ্রাপ্ত ‘যে কাউকে’ শব্দটি ২২তম সিন্ডিকেটে সিন্ডিকেট সদস্যদের আপত্তির কারণে বাতিল করা হয়। অর্থাৎ অপেক্ষমান তালিকার প্রথমজন মোহা. মাহামুদুল হক এবং দ্বিতীয়জন নিয়ামুন নাহার নিয়োগ পান সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। ২২তম সিন্ডিকেটেও জালিয়াতি করা হয়। ‘যে কাউকে’ শব্দটি বাতিল করা হয় কিন্তু অপেক্ষমান তালিকায় সিরিয়াল পরিবর্তন করা হয়। এতে নিয়োগের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত ২ জন শিক্ষকদের নাম লেখার সময় প্রথমজন হিসেবে তাবিউর রহমান প্রধান এবং দ্বিতীয়জন হিসেবে নিয়ামুন নাহারের নাম লেখা হয়। অপেক্ষমান তালিকায় প্রথম মোহা. মাহামুদুল হকের নাম বাদ দিয়ে তালিকার সিরিয়াল পরিবর্তন করা হয়।এছাড়া তাবিউর রহমান প্রধানকে অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদের বিপরীতে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। অথচ নিয়োগ বাছাই বোর্ড ছিল প্রভাষক পদের। অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছিল কিন্তু কেউ দরখাস্ত না করায় অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদের কোনো বাছাই বোর্ড হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাপক/সহযোগী অধ্যাপক পদে প্রার্থী পাওয়া না গেলে এর বিপরীতে প্রভাষক নিয়োগ দিতে হলে নতুন করে বিজ্ঞাপন দিতে হয় কিন্তু তাবিউর রহমানের নিয়োগের সময় এই নিয়মও অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘ক্যাম্পাস’ : আরও খবর

সম্প্রতি