শীতের পোশাক পরা এক নারী খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। তার গায়ে ছোট বালতি ও মগ দিয়ে পানি ঢালছেন দুইজন। নারীর অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে, ঠান্ডা পানির ঝটকা তিনি সামলাতে পারছেন না। তার কষ্ট হচ্ছে। যারা পানি ঢালছেন, তাদের মুখে হাসি। কয়েকজন জটলা করে দেখছেন। একজন মুঠোফোনে ভিডিও করছেন। গতকাল শনিবার ফেসবুকে এক নারীর প্রতি এমন সহিংসতার এক ভিডিও ভাইরাল হয়।
ওই ভিডিও সূত্র ধরে রোববার জানা যায়, ঘটনাটি রাজধানীর গুলশানের নদ্দা এলাকার মোড়ল বাজারের। গত ২ জানুয়ারি চুরির অভিযোগ তুলে ওই নারীকে খুঁটিতে বেঁধে পানি ঢেলে নির্যাতন করা হয়। গতকাল শনিবার রাতে নির্যাতনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গুলশান থানার পুলিশ ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে নিয়েছে। তবে ওই নারীকে পুলিশ খুঁজে পায়নি।
রোববার গুলশানায় থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসান জানান, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি শনিবার পুলিশের নজরে আসে। স্থানটি গুলশান থানাধীন নদ্দা এলাকার মোড়ল বাজার বলে শনাক্ত করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তারা ঘটনাস্থল মারকাযুত তা’লীম আল- ইসলামী মাদ্রাসায় পৌঁছান।
পুলিশের কাছে মাদ্রাসার লোকজনের ভাষ্য ছিল, সেদিন সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে মাদ্রাসার দুই শিশুশিক্ষার্থী দেখতে পায়, ওই নারী মাদ্রাসার লোকমান নামের একজন শিক্ষকের কক্ষে তার হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিচ্ছেন। শিশু শিক্ষার্থীরা চিৎকার করলে পাশের কক্ষ থেকে একরাম নামের আরেক শিক্ষক বেরিয়ে আসেন এবং ওই নারীকে আটক করেন। ওই নারীকে তারা পুলিশে সোপর্দ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এত সকালে ‘পুলিশ কোথায় পাবেন’ সেই চিন্তা করে নারীকে নিজেরাই ‘শাস্তি’ দিয়ে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শাস্তির প্রক্রিয়া হিসেবে নারীকে বেঁধে পানি ঢেলে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর কয়েকজন ওই নারীকে উত্তরাগামী একটি বাসে তুলে দেন।
দল বেঁধে ওই নারীর ‘শাস্তি’ দেখতে থাকা কেউ একজন ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। পুলিশ ভিডিও দেখে পাঁচজনকে শনাক্ত করেছে। তবে ওই নারীকে এলাকার কেউ চিনতে পারেননি। ওই নারী ওই এলাকার নন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত ওই নারীকে শনাক্ত করতে পারেনি।
মাদ্রাসা ভবনের যে কক্ষ থেকে ওই নারীকে আটক করা হয়েছিল, তা চতুর্থ তলায়। ওই নারী কীভাবে সেখানে ঢুকতে পারলেন, সেই প্রশ্নেরও উত্তর মিলছে না। এ বিষয়ে জানতে মাদ্রাসার সাইনবোর্ডে থাকা মুঠোফোন নম্বরে কল করে ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। ওসি মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ভিডিও দেখেই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়। রাতেই পাঁচজনকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। পুলিশের একটি দল ভুক্তভোগী নারীর খোঁজ করছে। ওই নারীকে খুঁজে না পেলে আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে কী করা হবে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবো।’ মামলা কী করা হবে? মামলা হলে কোন ধারায় হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটাও আমরা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবো।’ থানা থেকে জানা গেছে, যাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে, তারা হলেন মাদ্রাসার দুই হুজুর লোকমান ও একরাম এবং তিন শিক্ষার্থী।
এ দিকে ওই নারীকে নির্যাতনের ভিডিও দেখে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান অনেকে। তারা ভিডিওটি শেয়ার করে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন। তাদের একজন অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী ভিডিওটি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোথায়? অবিলম্বে এই...খুঁজে বের করুন। আল্লাহর দোহাই লাগে।’ ওই পোস্টের নিচে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করে মন্তব্য করেন কয়েকজন। এম এ মামুন নামের একজন বলেন, ‘এটা কি আইনের কাজ? নিজেরা আইন হাতে তুলে নিলে বিচার বিভাগের কী দরকার? কী কারণে নিজেরা এমন শাস্তি দিচ্ছে? দেশে যে আইন নাই, এটা বোঝা যায়।’