image

‘নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে’ হাদির প্রচারে আসামিদের অনুপ্রবেশ: অভিযোগপত্র

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত’ করতে এবং রাজনৈতিক ‘প্রতিহিংসার কারণেই’ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বয়াক শরীফ ওসমান হাদি ওরফে ওসমান গনিকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ বলেছেন, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিভিন্ন সময়ে হাদির দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে, ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই’ হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এছাড়া আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে ‘বাধাগ্রস্ত করতে’ এবং ভোটারদের মধ্যে ‘ভয়ভীতি তৈরি করতেই’ আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনি প্রচারে অনুপ্রবেশ করে বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগপত্র দাখিলের পর গত বুধবার তা আদালতে উপস্থাপন করা হয়। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম তা দেখেছেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান।

সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে গত ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। সেদিন এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির ‘পরিকল্পনাতেই’ হাদিকে হত্যা করা হয়।

এ মামলায় যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন- ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, রেন্ট-এ কার ব্যবসায়ী মুফতি মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের সহযোগী মো. কবির, ভারতে পালাতে সহায়তাকারী সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম, কাউন্সিল বাপ্পির বোন জামাই আমিনুল ইসলাম রাজু এবং সিপুর ঘনিষ্ঠ মো. ফয়সাল (ফয়সাল করিম মাসুদ নন)। আর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদ ছাড়াও মোটরসাইকেল চালক আলমগীর, ভারতে পাচারের সহায়তাকারী ফিলিপ, ফয়সলের বোন জেসমিন এবং তার স্বামী মুফতি মাহমুদ পলাতক বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী।

গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গত ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন। পরে মামলাটিতে হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয়। এরপর থানা পুলিশের হাত ঘুরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের মতিঝিল জোনাল টিমের ইন্সপেক্টর ফয়সাল আহমেদের দেওয়া অভিযোগপত্র গত বুধবার আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

সেখানে তিনি বলেছেন,‘মামলার সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণে, এজাহারের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত, তথ্য প্রযুক্তি ও সোর্স কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিং নথি, ডিএনএ ও ব্যালেস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং ময়না তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, শরীফ ওসমান হাদি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন ও পরবর্তীতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের শত্রুকার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা, ভোটারদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা ও প্রার্থী হিসেবে তার মনোবল ভাঙার উদ্দেশ্যে ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে ঘটনার (১২ ডিসেম্বর) কয়েকদিন আগে থেকেই ওসমান হাদির নির্বাচনি প্রচারণায় অনুপ্রবেশ করে। ঘটনার দিন মতিঝিল থেকে নির্বাচনি কার্যক্রম শেষে ফেরার পথে পল্টন থানাধীন বক্স কালভার্ট রোডে মোটর সাইকেলযোগে অনুসরণ করে চলন্ত অটোরিকশায় থাকা ভিকটিমকে আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা গুলি করে গুরুতর আহত করে পালিয়ে যায়।’

তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল হতে রক্তের সোয়াব, ফায়ার্ড কার্তুজ ও ফায়ার্ড বুলেট সদৃশ বস্তু জব্দ করা হয় এবং পরবর্তীতে র‌্যাব কর্তৃক নরসিংদী হতে উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের সাথে এ আলামতের ব্যালেস্টিক পরীক্ষায় সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ভিকটিম উন্নত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে ময়না তদন্ত রিপোর্টে গুলিবিদ্ধ হয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও শকজনিত মৃত্যু অ্যান্টিমর্টেম ও হোমিসাইডাল প্রকৃতির মর্মে মতামত প্রদান করা হয়।

‘বিভিন্ন সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক ও সোশাল মিডিয়ায় ওসমান হাদি জোড়ালো সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন।

যাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা তার উপর ক্ষুদ্ধ হয়। এছাড়াও ভিকটিমকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। শুটার ফয়সাল করিম মাসুম এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে সীমান্ত পাড়ি দেবার বিষয়ে সার্বিক সহায়তাকারী তদন্তে প্রাপ্ত আসামি তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি ছিলেন।

‘কাজেই আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় ভিকটিমের পূর্ববর্তী বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে প্রাথমিক তদন্তে প্রকাশ পায়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই শরীফ ওসমান হাদি ওরফে ওসমান গনি’কে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

‘নগর-মহানগর’ : আরও খবর

» অপারেশন ডেভিল হান্টে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৪৮

সম্প্রতি