ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিখোঁজের ২১ দিন পর মা-মেয়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত গৃহশিক্ষিকা মিম আক্তার আদালতে ‘হত্যার দায় স্বীকার করে’ জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে গতকাল শুক্রবার ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তাজুল ইসলাম সোহাগ জবানবন্দি রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আর অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৫) হওয়ায় মিমের বোনের জবানবন্দি নেয়নি আদালত। তাকে পাঠানো হয়েছে গাজীপুরে কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে। প্রসিকিউশন বিভাগের এএসআই আলমগীর হোসেন এ তথ্য দিয়েছেন। আগের দিন গত বৃহস্পতিবার রাতে কেরানীগঞ্জের মুক্তিরবাগ এলাকার একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার বাসা থেকে ৩১ বছর বয়সী রোকেয়া রহমান ও তার ১৪ বছরের মেয়ে জোবাইদা রহমান ফাতেমার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই বাসায় থাকেন ফাতেমার গৃহশিক্ষিকা মিম আক্তার। লাশ উদ্ধারের পর মিম, তার বোন ও স্বামীকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
গতকাল শুক্রবার মিমের জবানবন্দির পর তদন্ত কর্মকর্তা কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রনি চৌধুরী বলেন, এনজিও থেকে মিম ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণের জিম্মাদার হয়েছিলেন তার ছাত্রীর মা রোকেয়া রহমান। মিম ঋণের বিপরীতে প্রতি মাসে কিস্তি দিতেন ৫ হাজার টাকা।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘ঋণের কিস্তি বকেয়া পড়ায় মিমের সঙ্গে রোকেয়ার রহমানের সম্পর্কের অবনতি হয়। ফাতেমা গত ২৫ ডিসেম্বর মিমের কাছে পড়তে গেলে ঋণের টাকার প্রসঙ্গ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ফাতেমা থাপ্পড় দেন মিমকে। ক্ষিপ্ত হয়ে তখন মিম ও তার বোন গলাটিপে হত্যা করেন ফাতেমাকে।’
এরপর ‘ফাতেমা অসুস্থ হয়ে পড়েছে’- এমন কথা বলে মিম তার বাসায় ডেকে নেন ফাতেমার মা রোকেয়াকে, বলেন তদন্ত কর্মকর্তা। ‘বাসায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মিমের ছোট বোন ওড়না পেঁচিয়ে রোকেয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। ফাতেমার মরদেহ রাখা হয় বাথরুমের ছাদে, আর তার মা রোকেয়ার মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয় খাটের নিচে।’ এরপর চলে যায় ২১ দিন।
শুরুতে স্ত্রী-কন্যাকে না পেয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় জিডি করেন শাহিন আহমেদ। পরে গত ৬ জানুয়ারি মামলা করেন। দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার শাহিনের। প্রথম স্ত্রী রোকেয়ার একমাত্র সন্তান ফাতেমা। দ্বিতীয় সংসারে শাহিনের রয়েছে এক ছেলে ও দুই মেয়ে। একই এলাকায় পাশাপাশি থাকতেন তারা।
শাহিন বলেন, ‘দুই স্ত্রী হলেও গত ১৫ বছর কারও সঙ্গে কারও দেখা হয়নি, ঝামেলাও হয়নি। গত ২৫ ডিসেম্বর প্রচ- শীত থাকায় আর বাইরে বের হইনি। পরদিন ফোন দেই, ধরে না। গিয়ে দেখি (রোকেয়ার বাসায়) ঘর তালাবদ্ধ। খোঁজাখুঁজি করেও পাই না। থানায় যাই, মামলা নেয় না। লোকেশন চেক করে দেখি, সর্বশেষ অবস্থান ছিল মিমের বাসায়। ‘ওই বাসায় খোঁজ নিতে গেলে মিমের স্বামী আমাকে হুমকি-ধমকি দেয়। অথচ সে কিন্তু লাশগুলো প্যাকেট করেছে।’ মিমদের ফোন করে শনিবারই সেই বাসায় যেতে চেয়েছিলেন শাহিন।
তার ভাষ্য, ‘শনিবার আমাকে যেতে বলে। শনিবার গেলে হয়ত তারা আমাকেও মেরে ফেলত।’ স্ত্রী-কন্যার খোঁজ করতে গিয়ে ‘পুলিশের বঞ্চনার’ শিকার হওয়ার কথা বলেছেন শাহিন। তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ঋণের টাকার জন্য খুন। কিন্তু ওরা আমার মেয়ে ও স্ত্রীকে খুন করেছে গয়নার জন্য। তাদের কাছে দুটি স্বর্ণের চেইন, কানের দুল ও দুটি মোবাইল ছিল। তারা এগুলো নিয়ে নিয়েছে। ‘আর ঋণের বিষয় যদি আসে, তাহলে আমার স্ত্রী তো তার উপকার করছে। এজন্য তাকে খুন করতে হবে?’ হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করে শাহিন বলেন, ‘সর্বোচ্চ সাজা চাই। যারা গেছে তাদের তো আর ফিরে পাব না, তবে বিচারটা যেন পাই।’