এক পা হারিয়েও থামেননি শিপন
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের ত্রিশোর্ধ্ব যুবক শিপন মিয়া। একসময় জীবিকার তাগিদে যাত্রীবাহী বাসের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় হারান নিজের একটি পা। সেই দুর্ঘটনার পর জীবনের পথ যেন থমকে যায়। তবে হার মানেননি শিপন। সীমিত সামর্থ্য আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে নতুনভাবে জীবন শুরু করেন তিনি। আর সেই পথচলায় পাশে দাঁড়ায় স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থা- যা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
রোববার, (০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬) দিনব্যাপী কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার ৫ম বার্ষিক সাধারণ সভা, পারিবারিক মিলনমেলা ও শীতকালীন পিঠা উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে আবেগঘন কণ্ঠে নিজের জীবনের সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন শিপন মিয়া। তার চোখে তখন আনন্দ, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার অশ্রু।
দুর্ঘটনার পর জীবিকার তাগিদে শিপন স্বল্প পুঁজি নিয়ে বক্তারপুর বাজারের ফুটপাতে একটি ছোট চায়ের দোকান দেন। সেই দোকানেই কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা তার শারীরিক অবস্থার কথা জেনে উদ্যোগ নেন। তাদের আর্থিক সহায়তায় সাভারের সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড) থেকে তাকে কৃত্রিম পা সংযোজন করে দেয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় শিপনের নতুন জীবনের অধ্যায়।
শিপন জানান, সিআরপিতে থাকার সময় কেউ একজন তাকে ফুটবল খেলতে পারেন কিনা জানতে চান। এরপর এক পায়ে ফুটবল খেলার চেষ্টা শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই চেষ্টাই তাকে পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ জাতীয় অ্যামপিউটি ফুটবল দলে। দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলার সুযোগ পান তিনি। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া বাংলাদেশের হয়ে এশিয়া কাপেও অংশগ্রহণ করেন তিনি।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শিপন বলেন, “কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থা শুধু আমাকে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেয়নি, তারা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে। আগে মনে হতো একটি পা না থাকায় আমি ঘরবন্দী হয়ে গেছি। কিন্তু আজ আমি এক পা নিয়েই বিশ্বজুড়ে দৌড়াচ্ছি, নিজেকে সবার সামনে তুলে ধরছি।”
তিনি আরও বলেন, কালীগঞ্জের অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সংগঠনটি। কৃত্রিম পা সংযোজনের পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়েছে, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়তা করছে।
অনুষ্ঠানে কালীগঞ্জ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান ভূঁঞার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.টি.এম. কামরুল ইসলাম।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাশহুদুর রহমান সাজেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সংস্থার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডা. মোহাম্মদ ওয়াদুদুজ্জামান ভূঁইয়া। এছাড়াও বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা মো. মুর্শিদউজ্জামান, ফারজিন নাওয়ার জামান, ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, ডক্টরস বিডি লিমিটেডের সিইও মাহফুজুর রহমান খান, কেয়ার বাংলাদেশের টিম লিডার হাফিজুল ইসলাম এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুহসিন। বার্ষিক সাধারণ সভায় সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ অ্যাডভোকেট রাশিদুল হাসান রুবেল আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিল আনন্দ, সংস্কৃতি ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলা। প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং জমজমাট ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এতে দুই শতাধিক সদস্য, অতিথি ও পরিবারের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন।