বিশ্লেষণ

ঢাকাকে গিলে ফেলেছে বিষাক্ত বায়ু

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ভোরের নির্মল সময়েও এখন প্রায় প্রতিদিনই ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থা রাজধানীর বাতাসের। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়েছে ঘনবসতির মহানগরী।

ভোর মানেই একসময় ছিল নির্মল বাতাস, স্বস্তির নিঃশ্বাস, ব্যস্ত শহরের আগে কিছুটা প্রশান্তি। কিন্তু সেই চিরচেনা ছবিটা এখন বদলে গেছে। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪টায় ঢাকার বায়ুমান সূচক (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) দাঁড়ায় ২২৯।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইকিউএয়ারের লাইভ র‌্যাংকিং অনুযায়ী, এই মাত্রা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত। ওই সময় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে ঢাকা।

তালিকায় ঢাকার পরেই ছিল পাকিস্তানের লাহোর (সূচক ২২২)। আর আফগানিস্তানের কাবুল (সূচক ২০২)। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন যেন একসঙ্গে তৈরি করছে একটি যৌথ সংকট- যার কেন্দ্রে এখনো বারবার ফিরে আসছে ঢাকার নাম।

ভোরেও কেন দূষণ তীব্র?

বৈজ্ঞানিকভাবে ভোরের দিকে বাতাস তুলনামূলক স্থির থাকে। শুষ্ক মৌসুমে তাপমাত্রার তারতম্য ও বায়ুচাপের কারণে দূষিত কণাগুলো মাটির কাছাকাছি স্তরে আটকে যায়। ফলে রাতভর জমে থাকা ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম ধূলিকণা ভোরে আরও ঘনীভূত হয়। ঢাকার মতো অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও যানজটে ভরা শহরে এ পরিস্থিতি আরও তীব্র।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে কয়েকটি বড় উৎস দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয়- নির্মাণকাজের অনিয়ন্ত্রিত ধুলাবালি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, আশপাশের ইটভাটার নির্গমন, শিল্পকারখানার নির্গত দূষিত গ্যাস আর সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে এসব উপাদান মিলেই তৈরি হয় এক ধরনের ‘দূষণের চাদর’, যা শহরকে ঢেকে রাখে দিন-রাত।

জনস্বাস্থ্যের নীরব বিপর্যয়

চিকিৎসকদের মতে, ২০০–এর বেশি একিউআই মানে বাতাসে এমন মাত্রায় ক্ষতিকর কণা রয়েছে, যা দীর্ঘ সময় শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের জন্য এ অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকায় এখন শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষণ ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে- এমন সতর্কবার্তা আগেই দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিপদ ধীরে ধীরে আঘাত করে; ফলে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিক্রিয়াও ধীর।

কেন বছরের পর বছর শীর্ষে?

ঢাকা প্রায় প্রতি বছরই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষের দিকে থাকে। এর কারণ কেবল জনসংখ্যার চাপ নয়, বরং নীতিগত দুর্বলতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ সীমিত। ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে অভিযান হয়, কিন্তু মৌসুম ঘুরলেই আবার পুরনো চিত্র। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনা থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমানোর কার্যকর উদ্যোগ খুব কম।

অন্যদিকে নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন ও খোলা জায়গা রক্ষার বিষয়টি ক্রমেই উপেক্ষিত। গাছপালা কমে গেলে প্রাকৃতিকভাবে দূষণ শোষণের ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে শহর নিজেই নিজের জন্য এক ধরনের ফাঁদ তৈরি করছে।

https://sangbad.net.bd/images/2026/February/26Feb26/news/%E0%A6%95%E0%A6%BF%E0%A6%89%20%E0%A6%8F%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0.jfif

নাগরিকদের করণীয়

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, বাইরে বের হলে মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া যাবে না। ভারী ব্যায়াম এড়িয়ে চলতে হবে। দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হবে। তবে প্রশ্ন হলো, একটি শহর কি এভাবে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে? যেখানে নাগরিকদের নিজেদের ঘরবন্দি হয়ে বাঁচার কৌশল শিখতে হয়?

সমাধানের পথ কোথায়?

ঢাকার বায়ুদূষণ আর মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি এখন কাঠামোগত সংকট। সমাধানের জন্য প্রয়োজন, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ব্যক্তিগত গাড়ি নিরুৎসাহিত করা, ইটভাটা ও শিল্পকারখানায় কঠোর পরিবেশমান বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, শহরে বড় পরিসরে বৃক্ষরোপণ ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ আর দূষণ পর্যবেক্ষণে রিয়েল-টাইম ডেটা প্রকাশ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ধারাবাহিক প্রয়োগ। একদিনের অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ দরকার। ভোরের নির্মল বাতাস যখন বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তখন সেটি কেবল পরিবেশের সংকেত নয়, এটি একটি শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা। ঢাকাকে যদি সত্যিই বাসযোগ্য রাখতে হয়, তবে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, উন্নয়ন কি বিষাক্ত হবে, নাকি টেকসই?

‘নগর-মহানগর’ : আরও খবর

সম্প্রতি