ক্ষুধার্ত মানুষের খাবারের ঠিকানা ‘মেহমানখানা’

মোহাম্মদ সাব্বির

বিকেল ৪টা! বিশালাকৃতির হাঁড়ি নিয়ে হাজির এক ঝাঁক শিশু। সাথে সাথেই খাবারের গন্ধে ভরে ওঠে চারপাশ। রাজধানীর লালমাটিয়ার ‘মেহমানখানা’র প্রতিদিনকার চিত্র এটি।

https://sangbad.net.bd/images/2026/March/07Mar26/news/Gust%20sangbad%201.jpg

এখানে প্রতিদিন বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ রিকশা ঠেলে এসে দাঁড়ান, কেউ সারাদিনের কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে বসে পড়েন। আর এই সকল মেহমানদের আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছোট সোনামনিরা।

https://sangbad.net.bd/images/2026/March/07Mar26/news/gust%20sangbad%203.jpg

ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে একবেলা খাবার তুলে দেওয়ার স্বপ্ন থেকেই শুরু হয়েছিলো এই উদ্যোগ। সময়টি করোনা মহামারির প্রথম লকডাউনের। সেসময় পথশিশুদের নিয়ে রাস্তায় কুকুরদের খাবার খাওয়ানো উদ্যোগ থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন লিজা আসমা আখতার।

https://sangbad.net.bd/images/2026/March/07Mar26/news/liza.jpg

করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রথম লকডাউনের দিনগুলোতে মানুষের দুর্ভোগ খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন তিনি। তখন পথশিশুদের নিয়ে রাস্তায় কুকুরকে খাবার খাওয়ানোর একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করেন। সেই শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে করতেই মনে হয় শুধু পশু নয়, অনেক মানুষও প্রতিদিন ক্ষুধার্ত থাকে। সেখান থেকেই মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন শুরু করেন তিনি, যার নাম দেন ‘মেহমানখানা’। জানান লিজা আসমা আখতার।

তিনি বলেন, “এই কাজটা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারে দেখেছি কেউ ক্ষুধার্ত এলে তাকে খাওয়ানো হয়। আমার বাবা ভাত খেতে বসলেও যদি কেউ ক্ষুধার্ত এসে দাঁড়াত, নিজের থালা থেকে খাবার তুলে দিতেন। মানুষের দোয়া পাওয়ার এই শিক্ষা আমরা পরিবার থেকেই পেয়েছি।”

মেহমানখানায় যারা খাবার খেতে আসে, তাদের কাউকে ‘গরিব’ বলা হয় না। সবাই এখানে সম্মানের সঙ্গে বসে খাবার খায়।

তিনি বলেন, “আমরা সবাই এই পৃথিবীতে মুসাফির। এখানে ধনী-গরিব বলে কিছু নেই। শেষ পর্যন্ত সবার ভাগ্যে তো সাড়ে তিন হাত মাটি আর সাদা কাপড়ই আছে। তাই আমি কাউকে গরিব বলি না। তারা আমার সম্মানিত মেহমান।”

প্রতিদিন শত শত মানুষের খাবারের আয়োজন করা সহজ নয়। তবে এই উদ্যোগের জন্য তিনি কখনো কারও কাছে সরাসরি সাহায্য চাননি।

লিজা আসমা আখতার বলেন, “আমি কোনোদিন মানুষের কাছে হাত পাতিনি। আমি শুধু আল্লাহর কাছে বলেছি আমার মেহমানদের রিজিক যার হাতে আছে, তাকে যেন আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। যারা ভালোবেসে দেয়, আমি তাদেরটা গ্রহণ করি।”

তার মতে, মেহমানখানা আসলে একটি বড় পরিবারের মতো। “বড় সংসারে যেমন অভাব থাকে, এখানেও থাকে। কিন্তু শেষে দেখবেন একটা প্লেট তিনজন ভাগ করে খাচ্ছে। তখন মনে হয় আমার মেহমানরা খুব ভালো। তাই কষ্টটা আর কষ্ট মনে হয় না,” বলেন তিনি।

তবে কোনো দিন যদি খাবার কম পড়ে এবং কেউ না খেয়ে ফিরে যায়, সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত।

তিনি বলেন, “যদি কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার না পেয়ে ফিরে যায়, তখন খুব মন খারাপ হয়। মনে হয় আল্লাহ হয়তো আমার ওপর রাগ করেছেন। এজন্য আমি আমার একজন মেহমানকে সেবা করতে পারলাম না।”

জানা যায়, রোজায় মেহমানখানায় প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১০০০ মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হয়। রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এখানে এসে একসঙ্গে বসে ইফতার করেন।

মেহমানখানায় খাবার খেতে আসা মুসাম্মৎ মরিয়ম বেগম বলেন, “এখানে আমাদের গরিব মানুষ মনে করে না। আমাদের মেহমানের মতো খাওয়ায়। আমরা সবাই দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদের আরও তৌফিক দেন।”

আরেকজন নিয়মিত অতিথি বলেন, “এখানকার খাবার খুব ভালো এবং মানসম্মত। আইটেমও অনেক থাকে। অন্য জায়গার চেয়ে এখানে খেতে অনেক ভালো লাগে। প্রতিদিন এখানে এসে খাবার পাই।”

এই পুরো আয়োজন পরিচালনায় কাজ করছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবক। কেউ ছাত্র, কেউ চাকরিজীবী, কেউ আবার স্থানীয় বাসিন্দা।

স্বেচ্ছাসেবক রোকিয়া বলেন, “আমরা ম্যাডামকে মা বলে ডাকি। এখানে কাজ করলে মনে হয় নিজের পরিবারের জন্য কাজ করছি। এখানে টাকা নেই, কিন্তু শান্তি আছে।”

শিশু স্বেচ্ছাসেবক মারিয়া জানায়, “আমি এখানে প্রতিদিন আসি। মানুষকে শরবত দিই, খেজুর দিই, ছোলা দিই। মানুষকে খাওয়াতে আমার খুব ভালো লাগে।”

মেহমানখানার শুরু থেকেই যুক্ত আছেন স্বেচ্ছাসেবক ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দি রাজ মাহমুদী। তিনি বলেন, “মেহমানখানা জন্মলগ্ন থেকেই আমি এখানে আছি। যারা সারাদিন কাজ করে ক্লান্ত হয়ে আসে, তারা এখানে এসে একটু খাবার খায় আর দোয়া করে—এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”

লিজা আসমা আখতারের স্বপ্ন শুধু একটি মেহমানখানায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান পৃথিবীর কোথাও যেন কেউ ক্ষুধার্ত না থাকে।

তিনি বলেন, “আমরা ভালোবাসতে ভুলে গেছি। যদি আমরা একটু ভালোবাসতে শিখি, একটু ধৈর্যশীল হই, সহনশীল হই তাহলে অনেক কিছু বদলে যাবে। মানুষকে একটু ভালোবাসলে মানুষ অনেক বেশি ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়। চলুন আমরা মানুষের দোয়া কামাই, মানুষকে ভালোবাসি।”

‘নগর-মহানগর’ : আরও খবর

সম্প্রতি