না’গঞ্জে অস্তিত্বহীন তিন সরকারি হাসপাতাল
‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’ এ প্রবাদের মতো নারায়ণগঞ্জে কাগজে-কলমে চলছে অস্থিত্বহীন তিনটি সরকারি হাসপাতাল। অদৃশ্য হাসপাতালগুলোর নামে বছর বছর চিকিৎসক নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন পেলেও ১৭ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি হাসপাতালগুলো। ফলে সেবা বঞ্চিত হচ্ছে তিন অঞ্চলের মানুষ। হাসপাতালগুলো না হওয়ার পেছনে প্রশাসনিক জটিলতার কারণ দর্শানো হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব বলে মনে করছে সচেতন মহল।
জানা যায়, ২০০৬ সালের ৪ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (উন্নয়ন-২ শাখা) তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব আবেদা আক্তার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জনকে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণে স্থান নির্বাচন করে (কমপক্ষে তিন একর) জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২০০৭ সালের ১৭ জুলাই এক আদেশে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে দুটি ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব আবদুল্লাহ আল বাকী। পরবর্তীতে একই প্রকল্পের আওতায় আড়াইহাজার উপজেলার মনোহর গ্রাম ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নামে আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়।
সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল তিনটিতে একজন আরএমও, একজন মেডিকেল অফিসার ও ৪ জন কনসালটেন্টসহ ৬ জনের মোট ১৮টি পদ রয়েছে। যার মধ্যে ৯ জন চিকিৎসক নিয়োগ আছেন এবং ৯টি পদ শূন্য। নিয়োগপ্রাপ্ত ৯ জন হাসপাতালের নামে নিয়মিত বেতন, ভাতা পান।
এদিকে ২০১৯ সালে হাসপাতালগুলোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান। সেই বছর ৩০ জুলাই সদর উপজেলায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এখনও জমির বন্দোবস্ত হয়নি, নির্মাণ হয়নি হাসপাতালের স্থাপনা অথচ উপজেলার ২টি হাসপাতালে কর্মরত দেখিয়ে মাসে মাসে ২৪ জন চিকিৎসক তুলে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা।’ এ বিষয়ে তিনি সংসদে কথা তোলার আশ্বাস দিলেও তা আর হয়নি। পরবর্তীতে হাসপাতাল দুটি নির্মাণে তার কোন উদ্যোগও লক্ষ করা যায়নি।
অন্যদিকে এ প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর একে অন্যকে দোষারোপ করতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ও সিভিল সার্জনকে। তারা প্রত্যেকেই প্রশ্নের উত্তরে আওরে গেছেন একই বক্তব্য। সিভিল সার্জনরা বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয় না’ অন্যদিকে জেলা প্রশাসকরা বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে জানি না, তবে বিষয়টি আমি দেখবো।’ সচেতন মহলের মতে, হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি জোট সরকারের শাসনামলে গ্রহণ করায় বর্তমান সরকার প্রকল্পটি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, হাসপাতাল তিনটি নির্মাণের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন বরাবর একাধিকবার চিঠি দেয়া হয়েছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে জেলা প্রশাসন উদ্যোগও গ্রহণ করেছিল। জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছিল কিন্তু পরবর্তীতে কোন কারণে তা আটকে যায়। জমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় হাসপালগুলো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ কোন অফিসিয়াল প্রস্তাব পেশ করেনি বলে জানান জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা খাদিজা বেগম। তিনি সংবাদকে বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিভিল সার্জন অফিস কর্তৃক আমাদের চিঠি দিয়ে প্রকল্প বিষয়ে জানানো হয়েছিল। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জেলা প্রশাসনে কোন প্রস্তাবনা পেশ করা হয়নি।
খাদিজা বেগম বলেন, আমাদের জমি অধিগ্রহণ কাজ শুরু করতে হলে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তাবনা পেশ করতে হয়। এ প্রস্তাবনায়, প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, যেসব ছাড়পত্রের প্রয়োজন সবকিছু পাঠাতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগ এমন কিছুই করেনি। তাই আমরা এ বিষয়ে কোন কাজ করিনি।
অস্তিত্বহীন হাসপাতালগুলোতে কর্মরত চিকিৎসকরা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অনীক বিশ্বাস। তিনি বলেন, সদর উপজেলার দুই হাসপাতালের অধীনে বর্তমানে ৭ জন নিয়োগপ্রাপ্ত আছেন। তাদের প্রত্যেকেই বর্তমানের নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কাজ করছেন। এছাড়া আড়াইহাজার উপজেলা হাসপাতালে কর্মরত দুজন আড়াইহাজার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত কাজ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পগুলো না হওয়ার পেছনে সবার সদিচ্ছার অভাব আছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও নজরুল ইসলাম বাবু যদি উদ্যোগ গ্রহণ করে জমির ব্যবস্থা করতেন তাহলে অনেক আগেই হাসপাতাল তিনটি নির্মাণ হয়ে যেত।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এএফএম মুশিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন কারণে হাসপাতাল তিনটি হচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছি। হাসপাতালগুলো হলে তিন অঞ্চলের মানুষ সেবা পাবে এবং জেলা হাসপাতাল দুটির চাপও কমবে। এতে সেবার মানের উন্নয়ন ঘটবে। তাই হাসপাতালগুলো নির্মাণে ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হক সংবাদকে বলেন, হাসপাতাল তিনটি সম্পর্কে ধারণা নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ যদি জেলা প্রশাসনে প্রস্তাবনা পেশ করতো তাহলে অবশ্যই জমি অধিগ্রহণ হওয়ার কথা। আমি এ বিষয়টি দেখবো।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালগুলো হলে সাধারণ মানুষ সুবিধা ভোগ করতো কিন্তু জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণে এটা স্পষ্ট যে তারা এমনটা চান না। যে কারণেই হোক জনস্বার্থের প্রকল্পগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝেন না, করেন না। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি কেউ তাদের দায় এড়াতে পারেন না। তাই অতিদ্রুত হাসপাতাল তিনটি নির্মাণে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোকে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।