image

স্বাধীন, দক্ষ ও কার্যকর বিচার ব্যবস্থাই সাংবিধানিকতার সারবস্তু: প্রধান বিচারপতি

শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

একটি স্বাধীন, দক্ষ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থাই সাংবিধানিকতার সারবস্তু বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি সৈযদ রেফাত আহমেদ। শুক্রবার,(১৯ ডিসেম্বর ২০২৫) বাংলাদেশ সুপ্রিম কের্ট দিবসের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন,‘দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টও মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ থেকে জন্ম নিয়েছে ন্যায়বিচারের প্রতি জনগণের অবিনাশী ও অদম্য আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে, রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বৈরাচার, নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে এক দৃঢ় প্রতিরোধ হিসেবে।’

জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের স্বৈরতন্ত্রবিরোধী বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট পুনরায় জনআস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। তিন বলেন,‘আজকের দিনটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যাপন নয়, বরং যেসব মূল্যবোধ এই প্রতিষ্ঠানকে ধারণ করে সততা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারকে ন্যায্যতার রূপে অনুসরণের অদম্য সংকল্প—তার স্বীকৃতি।

‘এত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এই দিনে আমাদের দায়িত্ব শুধু এই মহান প্রতিষ্ঠানের অমলিন ঐতিহ্যকে স্মরণ করা নয়, বরং এর ভবিষ্যৎকে সম্মিলিতভাবে কল্পনা করাও। এর দৃঢ় কার্যকারিতা বজায় রাখা একটি অনিবার্য প্রয়োজন। কারণ একটি স্বাধীন, দক্ষ ও কার্যকর বিচারব্যবস্থাই হলো সাংবিধানিকতার সারবস্তু এবং সাংবিধানিক সরকারের মানদ-।’

সুপ্রিম কোর্টের অস্তিত্ব রাষ্ট্রক্ষমতার সীমাবদ্ধতার দার্শনিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা বাস্তবায়ন ও ব্যক্তিগত অধিকার সতর্কতার সঙ্গে সুরক্ষার যে অনন্য দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের, তা অবশ্যই ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে হবে—এভাবেই সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে এর সর্বোচ্চ ভূমিকা সুদৃঢ় হয়।’

প্রধান বিচারপতি মনে করেন, ঐতিহাসিক ও দার্শনিক, উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই একটি সাংবিধানিক আদালতের গুরুত্ব প্রায়ই গভীর রাজনৈতিক রূপান্তরের মুহূর্তের সঙ্গে যুক্ত। ‘হান্স কেলসেন বিশ্বাস করতেন, বিরোধ নিষ্পত্তি, সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ধারাবাহিক সমঝোতা নিশ্চিত করতে এমন একটি আদালত অপরিহার্য। তার মতে, বিচারিক পুনর্বিবেচনার ক্ষমতার মাধ্যমে সাংবিধানিক আদালত নাগরিকদের—বিশেষত সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রের সম্ভাব্য অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অধিকার রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ; যা ন্যায় ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক,’ বলেন তিনি।

সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন,‘সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক ভূমিকার দার্শনিক ভিত্তি ‘কমন গুড কনস্টিটিউশনালিজম’ -এর মাধ্যমেও ব্যাখ্যাত। এই ধারণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিহার্যতা মূল্যায়ন করে তারা কতটা সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিত করে শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা সর্বাধিক করার সক্ষমতার ভিত্তিতে নয়। ধ্রুপদি উদারবাদ যেখানে সাংবিধানিক আদালতকে মূলত স্বৈরতন্ত্র প্রতিরোধের উপায় হিসেবে দেখে, সেখানে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ সক্ষমতার বিকাশকে গুরুত্ব দেয় যার চূড়ান্ত লক্ষ্য সামষ্টিক কল্যাণ।

‘এই দৃষ্টিভঙ্গি কেবল ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন সাংবিধানিক অংশীজনের সহযোগিতার আহ্বান জানায়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান—সংসদ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ নিজস্ব ‘নৈতিক ভূমিকা’ ও দক্ষতা ধারণ করে। গণতান্ত্রিকভাবে বৈধ ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ আইন ও নীতি বাস্তবায়ন করে, আর দক্ষ বিচার বিভাগ ‘পথ-সংশোধনকারী’ প্রক্রিয়া হিসেবে কাজ করে ব্যক্তিগত মামলা নিষ্পত্তি করে এবং আইন প্রণয়ন ও সরকারি কার্যক্রম যেন সংবিধানের নির্দেশ, মৌলিক নীতি ও অধিকার লঙ্ঘন না করে তা নিশ্চিত করে।’

তিনি বলেন,‘প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আমাদের সংবিধানে নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সচেষ্ট থেকেছে—একটি মৌলিকভাবে সীমিত সরকার ও সামষ্টিক কল্যাণ অর্জনের মাধ্যমে প্রকৃত সাংবিধানিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। নীতিগত অর্থে এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার ইচ্ছাকৃত সীমাবদ্ধতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ প্রতিরোধ এবং যথাযথ চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস বজায় রাখা। যদিও এমন সময় এসেছে যখন আধিপত্যবাদী শক্তি, আধিপত্য ও অতিরিক্ততার বোঝায় সুপ্রিম কোর্টের নৈতিক কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ হয়েছে—অথবা অতিসাংবিধানিক ও অন্তর্নিহিতভাবে অসাংবিধানিক শক্তির চাপে পড়েছে তবুও এই প্রতিষ্ঠান সাহসের সঙ্গে এসব অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছে। ‘অসাংবিধানিক সাংবিধানিক সংশোধনী’ পর্যালোচনার উপকরণ দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করে আদালত গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণ রোধ করেছে এবং স্বৈরতন্ত্র ও অপব্যবহারমূলক সাংবিধানিকতার উত্থান প্রতিহত করেছে এবং তা অব্যাহত রেখেছে।’

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সম্প্রতি ঐতিহাসিক ষোড়শ সংশোধনী মামলায় সাংবিধানিকতার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদ সদস্যদের হাতে ন্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। আদালত স্পষ্টভাবে রায় দেয় যে, সংশোধনীটি অসাংবিধানিক এবং ক্ষমতার বিভাজন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মৌলিক নীতির ওপর ভিত্তি করে তার পর্যবেক্ষণ প্রদান করে।

‘গ্লোবাল সাউথসহ বিশ্বজুড়ে আমরা এক উদ্বেগজনক প্রবণতা প্রত্যক্ষ করছি—আইনকে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার; যার লক্ষ্য প্রায়শই ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। এ অবস্থায় রাষ্ট্রসমাজ অনিবার্যভাবে বিচার বিভাগের দিকে তাকায় একটি নিরপেক্ষ ও চূড়ান্ত মীমাংসাকারী হিসেবে; যার ওপর দায়িত্ব বর্তায় এসব প্রচেষ্টা নস্যাৎ করা এবং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মৌলিক নীতি রক্ষা করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশও এ চ্যালেঞ্জ থেকে মুক্ত নয়। বছরের পর বছর আমরা দেখেছি—মিথ্যা ও বিদ্বেষপ্রসূত মামলার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রান্তিকীকরণের ঘটনা, যেগুলো প্রায়ই যুক্তিসঙ্গত ভিত্তিহীন।

‘এই গভীর উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০২৫ সালে খালেদা জিয়ার মামলায় বিদ্বেষমূলক মামলার ধারণাটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে। আদালত আইনের মৌলিক ভিত্তি এবং সেই সব সাংবিধানিক নিশ্চয়তাকে পুনর্বিবেচনা করে, যা দুর্বলভাবে পরিকল্পিত মামলার সূচনা ও ধারাবাহিকতার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেয়—বিশেষত যেগুলো নাগরিকদের এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর পরিণতি ডেকে আনে।’

বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক সাংবিধানিক আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, সংবিধানের অভিভাবক এবং জনগণের ইচ্ছার রক্ষক হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। তবে এত ক্ষমতার সঙ্গে আসে বিশাল দায়িত্ব এবং সহ-অপনয়নের ঝুঁকি। এই ক্ষমতাই আদালতকে জনতাবাদী ও স্বৈরাচারী নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে—যারা রাষ্ট্রযন্ত্র দখল ও নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়।

‘জুলাই বিপ্লবের পর সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে বিচার বিভাগে যে সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত বিস্তৃত আইন প্রণয়ন এবং বিচ্যুতির ক্ষেত্রে বিচারপতিদের জবাবদিহির জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘদিনের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দিয়ে একটি স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ প্রণীত হয়েছে, যা একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত বিচার বিভাগের ভিত্তি স্থাপন করেছে। এসব উন্নয়ন স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক বিচার বিভাগ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যা উদার সাংবিধানিকতার আলোকে ন্যায়বিচার অনুসরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ শেষে তিনি বলেন,‘সর্বোচ্চ বিচারিক আচরণ বজায় রাখতে এবং নিশ্চিত করতে এই দিনটি আমাদের অনুপ্রাণিত করুক।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

» কূটনৈতিক এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার

সম্প্রতি