আলোচিত স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা, জাতীয় পার্টির একাংশের সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ পরিচিত বেশ কিছু মুখ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন। এ তালিকায় আরও আছেন বাসদের মো. খালেকুজ্জামান, সিপিবির সাজেদুল হক রুবেল, আমজনতার প্রার্থী রাজু আহমেদ, জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী কর্নেল (অব.) আবদুল হক, প্রয়াত মন্ত্রী নাজমুল হুদার মেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিম হুদা, সাবেক হুইপ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানা। যাচাই-বাছাই শেষে শনিবার, (০৩ জানুয়ারী ২০২৬) সংশ্লিষ্ট রিটানিং কর্মকর্তারা এসব প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। এর আগের দিন যাচাই-বাছাইয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আজাদ, সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কফি রতনসহ আরও কিছু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
ইসির তথ্যানুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ৩ হাজার ৪০৭টি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর শেষ দিন পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তা বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়।
তফসিল অনুযায়ী, আজ মনোননপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন।
শনিবার ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, বাছাই শেষ হলে সারাদেশে কতগুলো মনোনয়নপত্র বৈধ এবং কতগুলো বাতিল হয়েছে তা প্রকাশ করা হবে।
যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হবে আগামী ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সবারই আপিল করার সুযোগ আছে।
জারার আসনে বৈধ বিএনপি ও জামায়াত
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবারমনোনয়ন যাচাই-বাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্ত জানান।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানায়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে তাসনিম জারার যতগুলো স্বাক্ষর প্রয়োজন ছিল, সেটা ঠিকই ছিল। বরং কিছু বেশি ভোটারের স্বাক্ষর ছিল। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রস্তাবক ও সমর্থক হিসেবে নাম দেয়া ১০ জনের মধ্যে ৮ জন ঢাকা-৯ আসনের ভোটার। বাকি ২ জন ওই আসনের ভোটার না হওয়ায় নির্বাচনবিধি অনুযায়ী তার মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কবির আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আনিসুলের আসনে বৈধ বিএনপি
জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের সভাপতি ও জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন এ সিদ্ধান্ত জানান। হলফনামার সঙ্গে জমা দেয়া দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন থেকে পাঠানো দলীয় মনোনয়নপত্রের স্বাক্ষরের মিল না থাকায় আনিসুল ইসলামের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপ-কোষাধ্যক্ষ এসএম ফজলুল হক ও সাবেক হুইপ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে ব্যারিস্টার সাকিলা ফারজানার মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়া উদ্দিন জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ শতাংশ ভোটারের যে সই জমা দিতে হয়, সেখানে গরমিল পাওয়ায় ফজলুল হক ও সাকিলা ফারজানার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
তারা দুজনই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বৈধ তারেক, খালেদা জিয়ার নির্বাচনী কার্যক্রম সমাপ্ত
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মারা যাওয়ায় তার পক্ষে দাখিল করা মনোননয়নপত্র কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট রিটানিং কর্মকর্তার কার্যালয়।
বগুড়া জেলা প্রশাসক ও রিটানিং অফিসার তৌফিকুর রহমান শনিবারমনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই শেষে বগুড়া-৬ (সদর) আসনের প্রার্থী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে বগুড়া-৭ (গাবতলি-শাজাহানপুর) আসনে মৃত্যুজনিত কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করেন।
তারেক রহমানের আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবিদুর রহমান সোহেলের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
এ আসনে বাসদের দিলরুবা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবু নুমান মো. মামুনুর রশিদ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) আব্দুল্লাহ আল ওয়াকির মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
এদিকে ঢাকা-১৭ আসনেও তারেক রহমানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী এস এম খালিদুজ্জামানের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বগুড়ায় বাদ মান্না
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বগুড়ার আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে ঢাকায় তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। তার অভিযোগ, ‘জোর করে ও মব করে’ বৈধ প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল ‘করা হচ্ছে’।
শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি এ অভিযোগ করেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি এর আগেও আরও ৩/৪ বার নির্বাচন করেছি। এইরকম কঠিন হতে দেখিনি কোনো পথ।’ নির্বাচন কমিশনে ‘চাপ প্রয়োগ’ করে মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে অভিযোগ করে বিএনপি জোটের প্রার্থী মান্না বলেন, ‘চাপ তৈরি করে, মব করে যদি নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা যায়, তাহলে সেই নির্বাচন কোনো গুণমান পেতে পারে না। যে জন্যই এতগুলো শহীদ জীবন দিলেন, এত বড় আন্দোলন হলো, সেগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।’
বগুড়া-২ আসনে মাহমুদুর রহমান মান্নার হলফনামায় মামলার তথ্যে ঘাটতি ও আর্থিক বিবরণীতে অসংগতির কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা তৌফিকুর রহমান।
একই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাহর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে হলফনামার সঙ্গে সম্পদ বিবরণী ফরম জমা না দেয়ায়।
ঢাকায় বাতিল যাদের
ঢাকার ২০টি আসনে শেষদিন পর্যন্ত মোট ২৪৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। নির্ধারিত তিনজন রিটার্নিং কর্মকর্তা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আসন অনুযায়ী এসব মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হয়।
এরমধ্যে, ঢাকার ১৩টি আসনে মোট ১৭৪টি মনোনয়নপত্রের মধ্যে ১১৯ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে ইসি। তথ্যে গরমিলসহ নানা কারণে এসব আসনে মোট ৫৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এছাড়া একটি মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এ তথ্য জানান।
এরমধ্যে ঢাকা-১ আসনে ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী নূরুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র অন্তরা সেলিম হুদার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
ঢাকা-২ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আমানউল্লাহ আমানের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে।
ঢাকা-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. ফারুক, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোজাদ্দেদ আলী বাবু ও মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ঢাকা-১৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মো. রবিউল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহরিয়ার ইফতেখার, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের মো. খালেকুজ্জামান ও আমজনতার দলের প্রার্থী রাজু আহমেদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
ঢাকা-১৫ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেল, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোবারক হোসেন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তানজিল ইসলাম, ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনির মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জের বিএনপির বিদ্রোহীরা বাদ
মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মহিউদ্দিনের সমর্থক ভোটারদের স্বাক্ষরে গরমিল পাওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা সৈয়দা নূর মহল আশরাফী। একই কারণে মুন্সিগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী মীর সরাফত আলী সপু ও মোমিন আলীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।
জামায়াতের আজাদ বাদ
কক্সবাজার-২ আসনের প্রার্থী হামিদুর রহমান আজাদের একটি মামলার নথিপত্র সঠিকভাবে জমা না দেয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা এম এ মান্নান। আজাদের আইনজীবী মো. আরিফ জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন।
স্বাক্ষর জালিয়াতি
কুড়িগ্রাম-৩ আসনে ভোটারের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেককে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিক। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাসভীর উল ইসলামের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব
কুমিল্লায় জামায়াত ও জাতীয় পার্টির প্রতিনিধিসহ ১২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের দায়ে কুমিল্লা-৩ আসনে জামায়াতের ইউসুফ সোহেল এবং অসম্পূর্ণ আর্থিক বিবরণীর কারণে জাতীয় পার্টির ইফতেখার আহসানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এছাড়া স্বাক্ষরে অসংগতির কারণে কুমিল্লা-৫ আসনে সিপিবি সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কফি রতনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।
আপিল আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যারা আপিল করবেন আগামী ১০-১৮ জানুয়ারি আপিল নিষ্পত্তি করবে ইসি।
বৈধ প্রার্থীরা চাইলে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। ভোট হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে। ওইদিন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে।
অর্থ-বাণিজ্য: কাঁচামাল সংকটে দেশি পাটকল, রপ্তানি বন্ধ চান ব্যবসায়ীরা