জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে রাষ্ট্র সংস্কার ও পরিবর্তনের নানা প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তার প্রতিফলন সামান্যই দেখা গেছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে ‘জুলাই সনদ’-এর প্রস্তাবনা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বড় রাজনৈতিক দলগুলো ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৬৯ জনের। এরমধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০৮ জন। যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এই সংখ্যা কার্যত ১০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। যদিও ইসির যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারিত হবে। বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চূড়ান্ত নারী প্রার্থী ছিলেন ৯৬ জন। সে হিসেবে এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও মূলধারার রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ কাক্সিক্ষত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
গত আগস্টে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ‘জুলাই সনদ’-এর খসড়ায় ৩০০ আসনের বিপরীতে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেয়ার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত বা জাতীয় পার্টির মতো বড় কোনো দলই এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপি তুলনামূলকভাবে বেশি নারী প্রার্থী দিলেও তা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দলটি ১৩টি আসনে মোট ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। ঘোষিত তালিকায় বিএনপির নারী প্রার্থীরা হলেনÑ নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন, যশোর-২ আসনে মোছা. সাবিরা সুলতানা, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু, শেরপুর-১ আসনে সানসিলা জেবরিন, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খান রিতা, ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম তুলি, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ কামাল, মাদারীপুর-১ আসনে নাদিরা মিঠু এবং সিলেট-২ আসনে মোছা. তাহসিনা রুশদীর। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুতে সেখানে বিকল্প প্রার্থী দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সরাসরি নির্বাচনে কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, তারা নিয়মানুযায়ী সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেবেন।
বড় দলগুলো পিছিয়ে থাকলেও বামপন্থি ও ছোট দলগুলো নারী মনোনয়নে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি তাদের ৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনজন নারীকে মনোনয়ন দিয়ে ৬ শতাংশের বেশি হার অর্জন করেছে, যা জুলাই সনদের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে।
এছাড়া অন্যান্য দলের নারী প্রার্থী মনোনয়নের তথ্যে দেখা গেছেÑ বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ১০ জন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৬ জন, জাতীয় পার্টি (জিএম কাদের) ৫ জন, বাসদ ৪ জন, গণসংহতি আন্দোলন ৪ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩ জন এবং গণঅধিকার পরিষদ ৩ জন।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের দপ্তর সম্পাদক মাইনউদ্দিন টিটো বলেন, রাষ্ট্র যেহেতু সবার তাই রাজনৈতিক দলকেও সবার প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।
এবারের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের চেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার প্রবণতা নারী প্রার্থীদের মধ্যে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মোট নারী প্রার্থীর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি, অর্থাৎ ৪০ জনই স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নিজ দলের মনোনয়ন না পেয়েই তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
এরমধ্যে অন্যতম হলেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি তাদের জোটের শরিক দলকে ছাড় দেয়ায় তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। ফলে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী তাসনিম জারা। যিনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোট গঠনের ঠিক আগমুহূর্তে দল ত্যাগ করেন।
ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহর ও আধা-শহরাঞ্চলেই নারী প্রার্থীদের উপস্থিতি বেশি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে একাধিক নারী প্রার্থী থাকায় সেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।