সারাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জমা দেয়া মনোনয়ণপত্র যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার থেকে, চলবে আগামীকাল পর্যন্ত। শুক্রবার, (০২ জানুয়ারী ২০২৬) বিভিন্ন আসনে যাচাই-বাছাই করা মনোনয়নপত্রগুলো মধ্যে বিভিন্ন ভুল-ত্রুটির কারণে অনেকের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সারাদেশে ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। সেই হিসেবে প্রতি আসনে গড়ে ৮টির বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে আগামী ৫-৯ জানুয়ারি। ইসি আপিল নিষ্পত্তি করবে ১০-১৮ জানুয়ারি মধ্যে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। এরপর আগামী নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা জানা যাবে।
মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্য মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বগুড়া-২ আসনের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নার হলফনামায় নানা অসংগতি রয়েছে। তিনি হলফনামায় ফৌজদারি মামলার কোনো তথ্য দেননি। হলফনামায় যে এফিডেভিট দিয়েছেন তা সম্পাদনের একদিন পর তিনি স্বাক্ষর করেছেন। তিনি সম্পদ বিবরণীর ফরম দাখিল করেননি। এসব অসংগতির কারণে তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রার্থিতা বাতিলের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাহমুদুর রহমান মান্না আপিল করতে পারবেন বলে জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় মাহমুদুর রহমান মান্নার পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, নোটারি পাবলিকে এফিডেভিট সম্পাদনের দিনই মাহমুদুর রহমান মান্না স্বাক্ষর করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী একজন প্রার্থীর পক্ষে উপস্থিত নেতাকর্মীদের চাপে পড়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন। তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন এবং নিশ্চিত প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।
এদিকে আসনটিতে জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য শরিফুল ইসলাম জিন্নাহর মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে।
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর ঋণখেলাপি তালিকায় (ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি) নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম অন্তর্ভুক্তের কার্যক্রম আট সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে আইনত কোনো বাধা নেই বলে জানান তার আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মনোনয়ন বাতিল
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনে জামায়াত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমানের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় এ সিদ্ধান্ত জানান জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান।
হামিদুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রয়েছে। এ মামলার তথ্য গোপন করায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একটি সূত্র। তবে প্রার্থিতা ফেরত চেয়ে তিনি আপিল করতে পারবেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘মনোনয়নপত্রে উল্লিখিত তথ্যে গরমিল থাকায় জেলার দুই আসনে চারজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ রয়েছে।’
কক্সবাজার-১ আসনে দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
মনোনয়নপত্রের তথ্যে গরমিল থাকায় কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তারা হলেন- ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. ছরওয়ার আলম কুতুবী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম। এ আসনে মোট পাঁচজন মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন। বৈধ তিন প্রার্থী হলেন- বিএনপির প্রার্থী ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আবদুল কাদের।
চট্টগ্রামের তিন আসনে ১০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের তিনটি আসনে মোট ১০ জন প্রার্থীর মনোনয়ন পত্র বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার দিনভর যাচাইবাছাই শেষে এসব মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং অফিসার। এর মধ্যে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় দুইজন এবং এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের সত্যতা না পাওয়ায় অপরজনের মনোনয়ন বাতিল হয়। ‘বিএনপির প্রার্থী হিসেবে’ চট্টগ্রাম-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী। তবে তার দলের মনোনয়ন না থাকায় সেটি বাতিল হয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন মোহা. এরশাদ উল্যা। কিন্তু ‘যথাযথ দলীয় মনোনয়ন প্রদান করা হয়নি’ মর্মে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আসনটিতে মনোনয়নপত্র জমা দেন মোহাম্মদ আশরাফ ছিদ্দিকি। তবে তার জমা দেয়া ভোটারদের স্বাক্ষরের তালিকা যাচাইয়ে করে সত্যতা মেলেনি। যাচাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, তালিকা থেকে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে নেয়া ১০ জন ভোটারের ৮ জনই বলেছেন তারা স্বাক্ষর করেননি। এ কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে ৪ জনের মনোনয়ন বাছাইতে বাতিল হয়েছে। এ আসনে এখন বৈধ প্রার্থী ৫ জন। তারা হলেন- বিএনপির সরোয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন, জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ এবং মো. ওসমান আলী।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে ৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এখন সেখানে বৈধ প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন দুজন। তারা হলেন- বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ আলা উদ্দীন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেনের দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তার মনোনয়ন পত্র বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এছাড়া ঋণখেলাপি ও এক শতাংশ ভোটারের তথ্যে সত্যতা না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। আর দলের মনোনয়ন ‘সঠিক নয়’ বলে জাতীয় পার্টির এম এ ছালামের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
বরিশালে ২ জনের মনোনয়নপত্র স্থগিত
বরিশাল-৫ আসনে সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মনোনীত প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তীর মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া বরিশাল-৬ আসনে এক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত রেখেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকা ও অঙ্গীকারনামায় অসংগতি থাকায় বাসদ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বরিশাল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. খায়রুল আলম সুমন। মনীষা চক্রবর্তী অভিযোগ করে বলেন, ‘মূল হলফনামায় আমার স্বাক্ষর রয়েছে। নোটারির একটি কপিতে স্বাক্ষর নেই, যা বড় কোনো ভুল নয়। অঙ্গীকারনামার স্ট্যাম্পেও স্বাক্ষর রয়েছে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কারণে আমার মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে।’
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘আগামী রোববার পর্যন্ত সময় রয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা যদি মনে করেন মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার সুযোগ আছে, তাহলে তা করা হবে। অন্যথায় প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন।’ শুক্রবার বরিশালের ছয়টি আসনের মধ্যে বরিশাল-৪, ৫ ও ৬ আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়। আজ বরিশাল-১, ২ ও ৩ আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে।
যশোর-৩ ও ৪, ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল
যশোর-৩ ও যশোর-৪ আসনে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ মোট ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান। আশেক হাসান বলেন, ‘ঋণ খেলাপি থাকার কারণে টিএস আইয়ুবের মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা হয়নি।’ যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব ঢাকা ব্যাংকের ঋণ খেলাপি বলে জানান তিনি।
সিপিবি সাধারণ সম্পাদকের মনোনয়নপত্র বাতিল
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফীর মনোনয়ন বাতিল করেছে কুমিল্লা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা। তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসন থেকে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ এবং দাখিল করেছিলেন। শুক্রবার মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিনে যাচাই-বাছাই শেষে আবদুল্লাহ আল ক্বাফীর মনোনয়ন পত্রটি বাতিল বলে ঘোষণা করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন থেকে যার স্বাক্ষরে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থিতা মনোনীত হবে উল্লেখ করা হচ্ছে- তার মনোনয়নপত্রে সেটি নেই। তাই আমরা যাচাই-বাছাইয়ে তার মনোনয়নপত্রটি বাতিল বলে গণ্য করেছি। যে অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গিয়েছে তা ঠিক করার জন্য তিনি আইনগতভাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন।’
নরসিংদী-২ আসনে ৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল
নরসিংদী-২ আসনে ৮ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন পত্র জমা দেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রার্থিতা যাচাই-বাছাই শেষে তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা হলেন- ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী আলহাজ্ব ইঞ্জিনিয়ার মহসীন আহমেদ,, জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী এ. এন.এম রফিকুল রফিকুল আলম সেলিম ও ইনসানিয়াত বিল্পব মনোনীত প্রার্থী, ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম।
এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর নরসিংদীর পলাশ আসনে ৮ জন প্রার্থী তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।নরসিংদী -২ (পলাশ, পাঁচদোনা, মেহেরপাড়া ও আইমদিয়া) নিয়ে গঠিত। যাদের মনোনয়ন পত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন- বিএনপির ড. আ. মঈন খান, বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মো. আমজাদ হোসেন, এনসিপির মো. গোলাম সারোয়ার, ইসলামিক ফ্রন্টের আসিফ ইকবাল ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ফারুক ভূঁইয়া।