আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনেক মন্ত্রী-এমপির দ্বৈত নাগরিকত্বের খবর গণমাধ্যমে আসে
দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে এবার অনেক আসনেই প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাচ্ছে। রোববার,(০৪ জানুয়ারী ২০২৬)ও চট্টগ্রাম ও কুড়িগ্রামে জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থী বাদ পড়েছেন; এর আগে কুমিল্লায় বাদ পড়েছেন একজন। এই তালিকায় বিএনপির প্রার্থীও আছেন, আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। তবে তাদের আপিল করার সুযোগ আছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের (এমপি) দ্বৈত নাগরিকত্বের খবর গণমাধ্যমে আসে। অভিযোগ উঠে, সংশ্লিষ্ট সংসদ নির্বাচনের আগে তারা যখন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, যাচাই-বাছাইয়ে বিষয়টি আড়াল করা হয়েছিল। তবে বাছাইয়ে দু’-একজনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তিনি সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে প্রার্থী হতে বাধা থাকবে না।
দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একেএম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। রোববার মনোনয়ন বাছাইয়ের সময় এ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভাগীয় কমিশনার জিয়া উদ্দিন তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হেদায়েত উল্যাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘একেএম ফজলুল হক তার দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন দেয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বাতিলের পূর্ণাঙ্গ কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এ কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি ও বাকলিয়া থানা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৯ আসন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের দক্ষিণ জেলার সাবেক আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান।
জামায়াতের ফজলুল হকের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকলেও গত ২৮ ডিসেম্বর তিনি তা ত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় দাবি করেছিলেন।
*কুড়িগ্রামে জামায়াত নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ*
দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় কুড়িগ্রাম-৩ (উলিপুর) আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা। বর্ধিত সময়ের পরও নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় রোববার এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এর আগে গত শুক্রবার দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে যাচাই-বাছাইয়ের সময় মাহবুবুল আলমের মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়। পরে রোববার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলেও তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন বাতিলসংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ জমা দিতে
পারেননি।
জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের খবরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেছেন জামায়াতের দুই থেকে আড়াইশ’ নেতাকর্মী ও সমর্থক। এ সময় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদের সময় দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে প্রশাসনের পক্ষে আপিল করার সুযোগ থাকার বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়।
এ বিষয়ে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহী সাংবাদিকদের বলেন, রোববার দুপুরের দিকে জেলা প্রশাসক তাকে কাগজপত্র নিয়ে ডেকেছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহের যথাযথ সুযোগ না দিয়েই মনগড়াভাবে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। মাহবুবুল আলম বলেন, ‘চাপের মুখে পড়ে বা কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘দাখিল করা মনোনয়নপত্রে অসংগতি থাকায় তা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ আছে। প্রার্থী চাইলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।’
এর আগে যাচাই-বাছাইয়ে দেশের বিভিন্ন আসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল ও স্থগিত করা হয় দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতায়। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কার্যালয় সূত্রগুলো জানায়, যারা নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন বলে দাবি করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা এর পক্ষে প্রমাণ সরবরাহ সাপেক্ষে তাদের মনোনয়নপত্রের বৈধতা পাবেন। যারা দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপন করেছেন, তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হবে।
*শেরপুরে বিএনপির প্রার্থী*
এর আগে শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন সংশ্লিষ্ট রিটানিং কর্মকর্তা। দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি উঠে আসায় নির্বাচন আইন অনুযায়ী তার প্রার্থিতা স্থগিতের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, যাচাই-বাছাইয়ে ইঞ্জিনিয়ার ফাহিম চৌধুরীর দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি সামনে আসে। তিনি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করলেও এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কোনো প্রমাণপত্র জমা দিতে পারেননি। তাকে সময় দেয়া হয়েছে, তার বিষয়ে রোববারই সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।
* সিলেটে তিন প্রার্থীর স্থগিত*
দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতায় সিলেটের তিনটি আসনে বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গণঅধিকার পরিষদের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গতকাল শনিবার স্থগিত করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম তিন প্রার্থীর বিষয়ে এ স্থগিতাদেশ দেন।
মনোনয়নপত্র স্থগিত করা তিন প্রার্থী হলেন সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, বালাগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী ও দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক, সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে এনসিপির প্রার্থী ও দলের সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এহতেশামুল হক ও সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যে তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে কিছুদিন আগেও তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। তারা যুক্তরাজ্যের নাগরিক ছিলেন। তবে তারা সেই দেশের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। সেসব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়।
তিন প্রার্থীর হলফনামায় দেখা গেছে, এম এ মালিক গত ১৬ ডিসেম্বর, এহতেশামুল হক গত ২২ অক্টোবর ও জাহিদুর রহমান গত ২৮ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন।
তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রোববারই এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানোর কথা।
এর আগে কুমিল্লা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইউসুফ সোহেলের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করার কারণে।
সারাদেশ: নাটোরে নারীর গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার