পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মৃত্যুবরণকারী অজ্ঞাত পরিচয় শহীদদের মৃতদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণ কার্যক্রমে অগ্রগতি হয়েছে বলে সোমবার, (০৫ জানুয়ারী ২০২৬) সিআইডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সিআইডির সহায়তায় পরিবার ফিরে পেলেন প্রিয়জনের মরদেহ
সিআইডি জানায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই প্রক্রিয়ায় সোমবার পর্যন্ত আবেদনকারী ৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ৮ জনের পরিচয় ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু তালেব ও বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান সোমবার এ তথ্য জানিয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থান এলাকা থেকে প্রায় এক মাস সময় নিয়ে উত্তোলনকৃত মোট ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহের ডিএনএ ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন শেষে ৮ জন শহীদের পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের মাঝে সোমবার প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে সোমবার শহীদ পরিবারদের তাদের হারানো প্রিয়জনদের কবর বুঝিয়ে দেয়া ও মরদেহ উত্তোলনসংক্রান্ত ফলাফল উপস্থাপন অনুষ্ঠানে সিআইডিপ্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ্ এসব তথ্য জানিয়েছেন।
উক্ত অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, ডা. সায়েদুর রহমান বিশেষ সহকারী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবাররের সদস্যরা।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম তার বক্তব্যে বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ৯টি পরিবারের সংগ্রহীত ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে ৮ জন অজ্ঞাতনামা শহীদের পরিচয় সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এই শনাক্ত করণের ফলে শহীদদের পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনের মরদেহ গ্রহণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারবেন। এখন তারা জানেন তাদের প্রিয়জন ঠিক কোন স্থানে শায়িত আছেন। যা তাদের জন্য এক বিরাট মানসিক শান্তির কারণ হবে।
উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান তার বক্তব্যে বলেন, এই শনাক্তকরণের ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। যদিও আমরা জানি- এই শোক কোনো দিন পুরোপুরি মোছা যাবে না, তবুও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সত্য উদ্ঘাটন ও পরিচয় ফিরিয়ে দেয়ার এই প্রচেষ্টাকে শহীদ পরিবারের হৃদয়ে কিছুটা হলেও শান্তি এনে দিবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ময়নাতদন্ত ও ডিএনএন নমুনা সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।
ফরেনসিক চিকিৎসকরা প্রতিটি মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করেছেন এবং সিআইডির নিজস্ব ফরেনসিক ডিএনএ ও কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি আমাদের দেশের ফরেনসিক সক্ষমতার এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।
ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে শনাক্তকৃত শহীদদের কবর অতিথিরা পরিদর্শন করেছেন। তারা শহীদের উদ্দেশে দোয়া প্রার্থনা করেন। আর সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে স্বজনদের নিকট কবর বুঝিয়ে দেয়া হয়।
চিহ্নিত করা কবরে যারা আছেন, ৯ নম্বর কবরে শহীদ মো. মাহিন মিয়া (২৫), পিতা গাজী মাহমুদ, মাতা জোসনা বেগম, গ্রাম-ফুলপুর, থানা-ফুলপুর, জেলা-ময়মনসিংহ।
২৩ নম্বর কবরে শহীদ আসাদুল্লাহ, পিতা আব্দুল মালেক, মাতা-আশেয়া বেগম, থানা-শ্রীবর্দী, জেলা-শেরপুর।
২৩ নম্বর কবরে শহীদ পারভেজ বেপারী, পিতা সবুজ বেপারী, মাতা শামসুন্নার, গ্রাম-বারোহাটিয়া, থানা-মতলব, জেলা-চাঁদপুর।
২৫ নম্বর কবরে শহীদ রফিকুল ইসলাম, পিতা আব্দুল জব্বার শিকদার, গ্রাম-সাতকাছিনা, থানা-নাজিরপুর, জেলা-পিরোজপুর।
২৯ নম্বর কবরে শহীদ সোহেল রানা, পিতা-লাল মিয়া, মাতা-রাশেদা বেগম, থানা-লৌহজং, জেলা-মুন্সীগঞ্জ।
৩০ নম্বর কবরে শহীদ রফিকুল ইসলাম, পিতা-খোরশেদ আলম, থানা ও জেলা ফেনী।
৩৫ নম্বর কবরে শহীদ ফয়সাল সরকার, পিতা-শফিকুল ইসলাম, গ্রাম-কাচিমারা, থানা-দেবিদ্বার, জেলা-কুমিল্লা এবং ৫১ নম্বর কবরে শহীদ কাবিল হোসেন (৫৮), পিতা বুলু মিয়া, মাতা-ছমেনা বেগম, বাসা ৭/১৭/এ মুগদা থানার গলি।
পটভূমি ও কার্যক্রম শুরু: ২০২৪ সালে জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শাহাদাত বরণকারীদের মধ্যে বেশকিছু অজ্ঞাত পরিচয় মরদেহ মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল।
শহীদ পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং ন্যায় বিচারের স্বার্থে আদালতের নির্দেশে এই মৃতদেহগুলো উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১৫ জুলাই ২০২৪ সাল থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখের মধ্যে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সম্পৃক্ত শহীদ বা নিখোঁজ- যাদের লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
তাদের লাশ উত্তোলন শনাক্তকরণসংক্রান্ত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিআইডিকে এই কার্যক্রম সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে পুরো কার্যক্রমটি ছিলেন সিআইডিপ্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেব্রিডারের প্রত্যক্ষ দিক নির্দেশনায় গত ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে মৃতদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়। বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএন ও মেডিকেল ফারেনসিক টিমসমূহকে দুই দিনব্যাপী কর্মশালার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি তথা লাশ উত্তোলন, ফরেনসিক এক্সপার্ট কর্তৃক ডিএনএন নমুনা (স্যাম্পল) সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং ও লাশ পুনঃসমাধিস্থকরণ আন্তর্জাতিক মান তথা মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে।
মিনোসোটা প্রটোকল হলো- সম্ভাব্য বেআইনি বা বিচারবহির্র্ভূত মৃত্যু তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নির্দেশনা যা জীবনের অধিকার রক্ষা করতে এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনার সহায়তা করে।
রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৪টি অজ্ঞাত মৃতদেহ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করণ এবং ডিএনএন নমুনা সংগ্রহের কাজ সফলভাবে সমাপ্ত হয়।
সারাদেশ: আক্কেলপুরে ভাজা বিক্রেতার আত্মহত্যা