এলপি গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হওয়ার খবরে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিইআরসি ও ভোক্তা অধিদপ্তর বাজারে নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে দাম কমেনি। সোমবার, (০৫ জানুয়ারী ২০২৬)র মতই প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে এই গ্যাস।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মোবাইল কোর্টের অভিযান
দ্বিগুণ দাম দিয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না ভোক্তারা
কোম্পানি ২৮টি, আমদানির অনুমতি আছে ২৩টির, ডিসেম্বরে আমদানি করেছে ১০টি কোম্পানি
লোয়াব বলছে, ‘আমদানি কমেছে, আমদানি বাড়ানোর সুযোগ চেয়েও পাওয়া যায়নি।’
এদিকে গ্যাস থাকা সত্ত্বেও জরিমানার ভয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দোকান বন্ধ রেখেছেন বিক্রেতারা। এতে ভোক্তাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
আবাসিকে রান্নায় বেশি ব্যবহৃত হয় বেসরকারি পর্যায়ের ১২ কেজি এলপি গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডার। পাইপলাইনের গ্যাস না পেয়ে অধিকাংশ রেস্টুরেন্টও এখন রান্না করতে এই গ্যাস ব্যবহার করে।
জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। তবে বাজারে এই পরিমাণ গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২২০০-২৪০০ টাকায়।
সরেজমিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এলপি গ্যাসের (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) দোকান বন্ধ পাওয়া গেছে। আশপাশের দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এলপি গ্যাস কিনতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। ফোন দিয়ে অনেকে গ্যাসের জন্য অনুরোধ করছেন। তবে ভোক্তা অধিদপ্তরের লোকজন আসে। তাই দোকান বন্ধ রেখেছেন মালিকরা। জানা গেছে, কোনো কোনো দোকানদার পরিচিতদের বাসায় গ্যাস পৌঁছে দিচ্ছেন। তবে দাম নিচ্ছেন প্রায় দ্বিগুণ।
ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোবাইল কোর্টের ভয়ে গ্যাস বিক্রি বন্ধ রেখেছেন অনেক বিক্রেতা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বোতলজাত এলপি গ্যাস বিক্রির দায়ে দুই ডিলারকে মোট দেড় লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অতিরিক্ত মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির সময় মানিকগঞ্জ শহরের বেউথা এলাকায় ‘মিলেনিয়াম ট্রেডার্স’-এর মালিক সেলিম হোসেনকে ১ লাখ টাকা এবং জরিনা কলেজ মোড় এলাকায় ‘এরহাম ট্রেডার্স’-এর মালিক আরিফ হোসেনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সাভারে এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণে সোমবার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় একটি গ্যাস সিলিন্ডারের ডিপো ও একটি খুচরা দোকানিকে ৫৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ শহরের পৃথক স্থানে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় ৩ প্রতিষ্ঠানের ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া, দেশের অন্যান্য এলাকায়ও অভিযান চলছে, জরিমানা করা হচ্ছে।
জরুরি বৈঠক মন্ত্রণালয়ে
বর্তমান পরিস্থিত নিয়ে জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এরপর জ্বালানি বিভাগ থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, খুচরা পর্যায়ে এলপিজির বাজার স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুত আছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নভেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে এলপিজি আমদানি বেড়েছে। তাই এলপিজি সরবরাহ কমার যৌক্তিক কারণ নেই। এলপিজির দাম বাড়তে পারে; এটি জেনে খুচরা বিক্রেতারা এ সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া ইতোমধ্যে এলসি সহজ করা, ভ্যাট কমাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
*লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক*
এলপিজির চলমান সংকট সমাধানে গতকাল রোববার বিকেলে লোয়াবের সঙ্গে বৈঠক করেছে জ্বালানি বিভাগ। এতে এলপিজি আমদানি নিয়ে সমস্যার কথা তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। বৈঠক সূত্র বলছে, আমদানি বাড়ানোর অনুমতি চাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) না রাখার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। তবে আমদানি পর্যায়ে ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে জ্বালানি বিভাগ।
বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি, জাহাজসংকট- সব মিলিয়ে সরবরাহ কমেছে। সব অপারেটর সক্রিয় নয়, কেউ কেউ গত দেড় বছরে আমদানি কমিয়েছে। তাদের অনুমোদিত বরাদ্দ অন্যদের দিলে তারা আমদানি বাড়াতে পারবে। এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র খোলায় (এলসি) অগ্রাধিকার দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনা করে ভ্যাটের বিষয় ঠিক করা হবে।
*এলপিজির ২৮ কোম্পানি*
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সূত্র বলছে, দেশে ২৮টি কোম্পানি এলপিজি ব্যবসা করে। এর মধ্যে ২৩টি কোম্পানির আমদানির অনুমোদন আছে। যদিও এখন মূলত ছয়টি কোম্পানি বেশিরভাগ এলপিজি আমদানি করে। আরও চারটি সীমিত পরিসরে আমদানি করে। অন্যগুলো গত ডিসেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি করেনি। কোনো কোনো কোম্পানি চলছে ধুঁকে ধুঁকে। ব্যাংকঋণের কিস্তি শোধেও হিমশিম খাচ্ছে তারা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রতিটি কোম্পানির জন্য এলপিজি আমদানির পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। এর চেয়ে বেশি আমদানির সুযোগ নেই। তাই সক্ষমতা থাকলেও আমদানি বাড়াতে পারছে না তারা। আবার অনুমোদিত বরাদ্দের চেয়ে কম আমদানি করছে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে দেড় বছর ধরে বড় একটি কোম্পানির আমদানি অনেক কমেছে। আর ব্যাংকের লেনদেনজনিত জটিলতায় এলপিজি আমদানি করতে পারছে না আরও কয়েকটি কোম্পানি।
*আমদানি কমেছে, বাড়ানোর অনুমতি মেলেনি*
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলপিজি আমদানি কমিয়ে দেয় কিছু কোম্পানি। পরে কিছু কোম্পানি আমদানি বন্ধ করে দেয়। তবে সক্রিয় কিছু কোম্পানি আমদানি বাড়াতে চেয়ে বারবার আবেদন করেও সরকারের অনুমতি পায়নি। ফলে এখন তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট।
প্রায় দুই বছর ধরে বাড়তি আমদানির অনুমতি পেতে জ্বালানি বিভাগে ঘুরছে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, সিলিন্ডারে এলপিজি ভর্তি করতে তাদের চারটি প্ল্যান্ট আছে। এর মধ্যে মেঘনাঘাটের বৃহৎ প্ল্যান্টের জন্য বছরে আড়াই লাখ টন এলপিজি আমদানির অনুমতি আছে। এখানে আরও এক লাখ টন আমদানি করা সম্ভব। এর বাইরে মোংলায় ৯০ হাজার টন, বগুড়া ও ভালুকায় ৬০ হাজার করে দুটি এলপিজির প্ল্যান্ট আছে। প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে এ তিন প্ল্যান্টে সীমিত পরিসরে এলপিজি আনা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি নেই বলে আমদানির চূড়ান্ত অনুমতি দিচ্ছে না সরকার।
৬০ হাজার টন থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানির অনুমতি চেয়েছে ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড। তবে গত ১২ নভেম্বর জ্বালানি বিভাগ থেকে ওই কোম্পানিকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, বার্ষিক আমদানি বা উৎপাদন ক্ষমতা উন্নীতকরণের বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ না থাকায় ডেল্টার আবেদনটি বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
*বানাতে হবে ল্যাবরেটরি*
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, নীতিমালা অনুসারে এলপিজি প্ল্যান্টে মান পরীক্ষার ল্যাবরেটরি বানাতে হবে। এটি না থাকায় নতুন প্ল্যান্টে আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবে লোয়াব বলছে, দেশের কোনো প্ল্যান্টে ল্যাব নেই। ল্যাব ছাড়াই আগে সবাই অনুমতি পেয়েছে। দুই বছর ধরে এটি কঠোর করা হয়েছে। আর একই কোম্পানির প্রতিটি প্ল্যান্টে ল্যাব করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। একটি ল্যাব করতে অন্তত তিন কোটি টাকা খরচ হয়; বরং দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে সবার জন্য ল্যাব করা যেতে পারে। এসব ল্যাবে নিরপেক্ষ পরীক্ষা হবে।
লোয়াব সূত্র বলছে, আমদানির জন্য ২৩টি কোম্পানির নিজস্ব টার্মিনাল আছে। গত ডিসেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি কোম্পানি- ফ্রেশ, ওমেরা, আই গ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, টোটাল গ্যাস, সেনাকল্যাণ, ডেল্টা ও লাফস। ব্যাংক লেনদেনজনিত জটিলতায় আমদানি করতে পারছে না ওরিয়ন, বেক্সিমকো, এনার্জিপ্যাকের জি-গ্যাস, নাভানা ও এস আলম গ্রুপের ইউনিগ্যাস।
*লোয়াবের চিঠি*
এলপিজি আমদানি বাড়ানোর আবেদন অনুমোদন করতে জরুরি অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ২১ আগস্ট জ্বালানি বিভাগে সর্বশেষ চিঠি দিয়েছে লোয়াব। তবে জ্বালানি বিভাগ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু কোম্পানি একসঙ্গে এলপিজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই যারা সক্রিয় আছে, তাদের আমদানি বাড়ানোর জরুরি অনুমতি দরকার, যাতে ভোক্তার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত থাকে। তাই দ্রুত অনুমোদনের জন্য অনুরোধ করা হয় চিঠিতে।
লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল জব্বার বলেন, ‘যথাসময়ে অনুমতি পেলে আমদানি আরও বাড়ানো যেত। যদিও বেশ কিছু কারণে বর্তমানে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। আর খুচরা বিক্রেতারা এর সুযোগ নিচ্ছেন।’
সারাদেশ: আক্কেলপুরে ভাজা বিক্রেতার আত্মহত্যা