‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ কারণে হত্যা
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্ববায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলায় সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পির ‘পরিকল্পনাতেই’ হাদিকে হত্যা করা হয়।
তিনি বলেন, ‘পতিত (আওয়ামী লীগ) সরকারের বিরুদ্ধে হাদি সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে।’ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র মঙ্গলবার, (০৬ জানুয়ারী ২০২৬) আদালতে দেয়া হয়েছে। যে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে ১১ জন গ্রেপ্তার আছেন। বাপ্পি ও ফয়সাল ছাড়াও আলমগীর, ফিলিপ, মুফতি মাহমুদ এবং ফয়সলের বোন জেসমিন পলাতক বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
হাদি হত্যা মামলাটি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় চূড়ান্ত চার্জশিট দেয়া হবে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই এ হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করতে যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
মামলার প্রধান আসামি ও তার সহযোগী ভারতে
হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ও তার সহযোগী ‘ভারতে পালিয়েছেন’ বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তাদের পালাতে সহযোগিতা করেছেন ভারতের দুই নাগরিক। মেঘালয় পুলিশ ওই দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ হাদি হত্যার দুই আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখকে ভারতে পালাতে সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুইজনের নাম জানিয়েছে ডিএমপি। তারা হলেন পূর্তি ও সামী। তবে ফয়সাল ‘ভারতে নেই’, কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি বলে জানিয়েছেন মেঘালয় পুলিশ।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, হাদির হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত। ঘটনার পর ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আমিনবাজারে যান। সেখান থেকে গাড়িতে করে কালামপুরে যান। কালামপুর থেকে আরেকটি গাড়িতে করে ময়মনসিংহ সীমান্তে যান। সেখানে ফয়সাল ও আলমগীরকে নেন ফিলিপ পাল ও সঞ্জয়। তারা সীমান্তে অবৈধভাবে মানুষ পারাপার করেন। পরে ফিলিপ দুইজনকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে নিয়ে যান। অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, ফয়সাল ও আলমগীরকে ভারতের তুরা নামক স্থানে নিয়ে যান ফিলিপ। সেখানে ভারতীয় নাগরিক পূর্তির কাছে তিনি দুইজনকে পৌঁছে দেন। পরে সামী নামের এক ব্যক্তির গাড়িতে করে সেখান থেকে পালিয়ে যান তারা।
ফয়সাল ‘ভারতে নেই’, কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি, বলছে মেঘালয় পুলিশ
হাদি হত্যার প্রধান সন্দেহভাজনের পালিয়ে ভারতে যাওয়া এবং তাকে সহায়তার অভিযোগে মেঘালয়ে দুইজন গ্রেপ্তার হওয়ার যে তথ্য ঢাকার পুলিশ দিয়েছে, দিল্লি তা অস্বীকার করেছে। গত রোববার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেঘালয় পুলিশ ও দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ডিএমপির দুটি দাবিই প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত রোববার হাদি হত্যা মামলার অগ্রগতি জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, হাদি হত্যার প্রধান দুই সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম এবং আলমগীর শেখ ভারতে পালিয়ে গেছেন। মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে ‘ইনফরমাল চ্যানেলে’ যোগাযোগ করে তারা জানতে পেরেছেন, মেঘালয় পুলিশ ফয়সাল করিমকে সহায়তাকারী পুত্তি ও সামি নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি পালিয়ে যাওয়ার একটি বর্ণনাও দেন। এর ঘণ্টা দুয়েক পরেই হিন্দুস্তান টাইমসের অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিএসএফ ও মেঘালয় পুলিশের বরাত দিয়ে ডিএমপির দাবি অস্বীকার করা হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাদি হত্যার প্রধান দুই সন্দেহভাজন হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে মেঘালয়ে পালিয়ে গেছেন এবং এখন সেই রাজ্যে অবস্থান করছেন বাংলাদেশ পুলিশের এমন বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেছেন মেঘালয় পুলিশের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
### বিচাররের ‘ব্যর্থতায়’ সরকার ‘পতনের’ হুমকি
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘সরকার ৭ জানুয়ারি (আজ) পর্যন্ত সময় চেয়েছে। আমরা (গত ২৫ ডিসেম্বর) ৩০ কার্যদিবস সময় দিয়েছিলাম, আর বাকি আছে ২২ দিন। আমরা ওই কার্যদিবস ধরেই আগাইতেছি। ‘এর মধ্যে যদি সরকার এই খুনের বিচারকাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমরা সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করবো।’ গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন তিনি। জাবের বলেন, ‘৭ জানুয়ারির মধ্যে শুধু খুন যারা করেছেন, তারা নন, এই খুনের পেছনে যারা রয়েছেন, প্রত্যেককে চিহ্নিত করে অভিযোগপত্র দাখিল করার করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘ওসমান হাদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং ইনসাফের আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ফলে অনেকেই মনে করেছে, হাদিকে যদি এখনই হত্যা করা না যায় তাহলে পরবর্তী সময় তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না, সীমান্তে লাশ ফেলা যাবে না। দিল্লির তাঁবেদারি করা যাবে না। সবকিছু একই সূত্রে গেঁথে তারপর হাদিকে হত্যা করা হয়েছে।
### গ্রেপ্তার ১২
হাদিকে গুলির ঘটনার পর গত ১৪ ডিসেম্বর শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্ত থেকে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিউন দিউকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর গত ১৬ ডিসেম্বর র্যাব-১১ এর একটি দল নরসিংদী সদর মডেল থানা এলাকার তরুয়ার বিলে অভিযান চালিয়ে ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় পানি থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ রিমান্ড শেষে গত বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করেন। সঞ্জয় ও ফয়সাল স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হওয়ায় তা রেকর্ড এবং সিবিউনকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। এরপর দুজনের জবানবন্দি নেয়ার পর তিনজনকেই কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বিচারক।
হাদি হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আসামিরা হলেনÑ ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির ও মা মোসা. হাসি বেগম, ফয়সালের স্ত্রী সাহেদা পারভীন সামিয়া, বান্ধবী মারিয়া আক্তার লিমা ও শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ সিপু, ভাড়ায় প্রাইভেটকার ব্যবসায়ী মুফতি মো. নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, ফয়সালের সহযোগী মো. কবির, ভারতে পালাতে সহযোগিতাকারী সিবিউন দিউ ও সঞ্জয় চিসিম, আমিনুল ইসলাম রাজু এবং মো. ফয়সাল।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই ওই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদিকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদির মৃত্যুর খবর আসে।