নতুন করে ১৩৫টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ তালিকায় যুক্ত করে ২৯৫টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ করা হয়েছে।
আরও ১,১০০টির মতো ওষুধের ‘দামের পরিধি বেঁধে দেয়া হবে’
শিল্পকলা একাডেমির বিভাগ সংখ্যা বাড়িয়ে ৯টি করা হবে
গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ
সেগুলো বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট দাম বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার,( ০৮ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকার তেজগাঁওয়ে তার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভায় ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশসহ চার অধ্যাদেশের নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত জানাতে পরে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ে আসেন প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. সায়েদুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।
২৯৫টি ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ওষুধের দাম বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ব্রিফিংয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, মানুষের চিকিৎসা ও ওষুধ প্রাপ্যতার জন্য বিক্রেতাদের সরকারের বেঁধে দেয়া দামেই বিক্রি করতে হবে। তবে কাজটি করার জন্য সময় দেয়া হবে বলে জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী বলেন, ‘একটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে যেখানে ২৯৫ বা সেটা আজকে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আরও একটি অথবা দুটি ড্রাগের অন্তর্ভুক্তির অনুরোধ এসেছে। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত হলে ২৯৫ বা ২৯৬ টা ওষুধ হবে। এগুলোকে বলা হচ্ছে অত্যাবশ্যক ওষুধ। ১৩৫টি ওষুধ ১৩৬টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নতুনভাবে এবারের তালিকায়। মূল ব্যাপার যেটা সেটা হচ্ছে যে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ওষুধগুলোর ক্ষেত্রে আসলে এটা সরকার কর্তৃক একটি নির্ধারিত মূল্যে ওষুধগুলো বিক্রি করতে হবে।’
দাম কীভাবে বেঁধে দেয়া হবে তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘মূল ব্যাপার যেটা ঘটবে সেটা হচ্ছে যে এই অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধগুলোর সবগুলোর মূল্য সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে এবং এই নির্ধারিত মূল্যের বাইরে যারা আছেন তাদেরকে এই মূল্যে পর্যায়ক্রমে আসতে হবে। যারা উপরে আছেন তাদেরকেও নেমে আসতে হবে, যারা নিচ থেকে যাবেন তারা ইচ্ছা করলে উপরে উঠতে পারেন অথবা থাকবেন।’
পর্যায়ক্রমের বিষয়টির ব্যাখ্যায় ৪ বছর সময় দেয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর কমিয়ে কমিয়ে ৪ বছরের মধ্যে সরকারের বেঁধে দেয়া দামে আসতে হবে।’
এতে কতটুকু সুফল মিলবে সে বিষয়ে সায়েদুর রহমান বলেন, ‘এই ওষুধগুলো বাংলাদেশের সাধারণভাবে আপনারা সবাই জানেন যে, অত্যাবশ্যক ওষুধ মাত্রই এটা বাই ডেফিনেশন এটা শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের সব রোগ ব্যাধি চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট। অতএব এই ওষুধগুলোর উপর মূল্য নিয়ন্ত্রণ সরাসরিভাবে বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্যতা এবং ওষুধের প্রাপ্যতা উপর প্রভাব ফেলবে। অতএব বলা যায় এটা একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।’
এর বাইরে আরও ১,১০০টির মতো ওষুধ আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ‘নির্দিষ্ট’ মূল্য ঠিক করে না দিলেও একটা দামের পরিধি বেঁধে দেয়া হবে বলে জানান সায়েদুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘যে সব পণ্যের উৎপাদক সাতের বেশি প্রতিষ্ঠান সেসব ওষুধের মূল্য তাদের বিক্রির মূল্যের মধ্যে দামে বেঁধে দেয়া হবে।’ উদাহরণ টেনে সায়েদুর বলেন, ‘কোনো ওষুধের বিক্রির মূল্য ১০-২০ এ বিক্রি হলে সেটি ঠিক করা হবে ১৫ টাকায় এবং এর সঙ্গে যোগ-বিয়োগ ১৫ শতাংশ রেঞ্জ রাখা হবে। যেসব ওষুধের উৎপাদক ৭টির কম, সেক্ষেত্রে বিদেশের বাজার মূল্যও আমলে নিয়ে একটা বাজার দরের রেঞ্জ ঠিক করা হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জানান, উপদেষ্টা পরিষদের সভায় মূল্য নির্ধারণের নীতিমালারও অনুমোদন মিলেছে। তিনি বলেন, ‘দ্রুতই তা প্রকাশ পাবে। এটি হলে আর কোনো ওষুধই একদম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া থাকবে না।’ নতুন উৎপাদনে আসা ওষুধের ক্ষেত্রেও এ নীতিমালায় নির্দেশনা থাকবে বলে জানান তিনি।
চার অধ্যাদেশ অনুমোদন সভায় ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়া ও নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রণীত ‘হার্ট ন্যাশনালি ডিটারমাইন কন্ট্রিবিউশন (এনডিসি-৩)’ ভূতাপেক্ষ অনুমোদন পেয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্বেগ বিবেচনায় এনে ডাটা লোকালাইজেশন সংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন কেবল ক্রিটিক্যাল ইনফরমেশন ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ক্ষেত্রে দেশে ডাটা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত উপাত্তের ক্ষেত্রে কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে এবং কোম্পানির ক্ষেত্রে কারাদ-ের পরিবর্তে অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে।’ এতে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ও ক্লাউডভিত্তিক সেবায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিল্পকলা একাডেমি সংশোধন অধ্যাদেশের বিষয়ে প্রেস সচিব বলেন, ‘একাডেমির বিভাগ সংখ্যা বাড়িয়ে ৯টি করা হয়েছে। এর মধ্যে থিয়েটার, চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র, নৃত্য ও পারফরম্যান্স আর্ট, সংগীত, চারুকলা, গবেষণা ও প্রকাশনা, নিউ মিডিয়া এবং কালচারাল ব্র্যান্ডিং ও উৎসব প্রযোজনার জন্য পৃথক বিভাগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একাডেমির বোর্ডে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিধান যুক্ত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে।’
বাংলাদেশ বনজ শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন অধ্যাদেশ ২০২৬ সম্পর্কে প্রেস সচিব জানান, ১৯৫৯ সালের ফরেস্ট ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন অর্ডিন্যান্সকে যুগোপযোগী করে নতুন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করে বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার, পণ্য বৈচিত্র্য, শোরুম স্থাপন ও যৌথ উদ্যোগের সুযোগ রাখা হয়েছে। গত অর্থবছরে কর্পোরেশন কর-পূর্ব মুনাফায় ৫৩ কোটি টাকা অর্জন করেছে এবং রাবার শিল্পে প্রথমবারের মতো ৬ কোটি টাকা লাভ করেছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।
এনডিসি-৩ প্রসঙ্গে শফিকুল আলম বলেন, ‘২০২২ সালে বাংলাদেশের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ছিল ২০২.০৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য, যা ২০৩৫ সালে ৪১৮.৪০ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে। এনডিসি-৩ অনুযায়ী ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব সক্ষমতায় ২৬.৭৪ মিলিয়ন টন এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া গেলে আরও ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
সারাদেশ: মহেশপুর সীমান্তে যুবকের মরদেহ উদ্ধার