মব সহিংসতায় ২১ জন আটক, ৯ জনের স্বীকারোক্তি
ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজন আসামি ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বুধবার রাতে ঢাকার ডেমরার সারুলিয়া এলাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি বৃহস্পতিবার,( ০৮ জানুয়ারী ২০২৬) নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় ডিআইজি মোহাম্মদ আতাউল কিবরিয়া।
পুলিশের পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে দীপু হত্যা মামলার ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা এবং গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াসিনকে শনাক্ত করা হয়। তদন্তে উঠে আসে, তিনি কারখানার গেটে স্লোগান দিয়ে লোক জড়ো করে মব সৃষ্টি করেন এবং কারখানার গেটের সামনে দীপুকে মারধর, পরে রশি দিয়ে লাশ টেনে হেঁচড়ে স্কয়ার মাস্টারবাড়ি এলাকার সড়কে নিয়ে গিয়ে মরদেহ পোড়ানোর নেতৃত্ব দেন।
গ্রেপ্তারকৃত ইয়াসিন আরাফাত গত ১৮ মাস ধরে ভালুকা উপজেলার কাশর এলাকায় শেখবাড়ি মসজিদে ইমামতি এবং একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গত ১৮ ডিসেম্বর দীপু হত্যাকা-ের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, নিজস্ব সোর্স ও গোপন অনুসন্ধানে জানা যায়, আসামি ঢাকার ডেমরা এলাকায় অবস্থান করছেন। এমন তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বুধবার রাতে ডেমরার সারুলিয়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ঘটনায় ইয়াসিনসহ মোট ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলা ডিবি পুলিশ ১৪ জন এবং র্যাব ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় ডিআইজি মোহাম্মদ আতাউল কিবরিয়া। মামলাটি বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। ডিআইজি জানান, দীপু চন্দ্র দাস হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ধারাবাহিক পুলিশি অভিযানে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ইতোমধ্যে ৯ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে নিহত দীপুর মরদেহ গাছে ঝুলানোর ঘটনায় শনাক্ত হওয়া আসামি নিবিড় ইসলাম অনিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপুকে হত্যার আগে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ছয়জনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছে পুলিশ। তারা হলেন- সুনামগঞ্জের তাকবির, ঠাকুরগাঁওয়ের রুহুল আমিন, ময়মনসিংহ সদরের নূর আলম, তারাকান্দা উপজেলার মো. শামীম মিয়া, নোয়াখালীর সেলিম মিয়া ও মাদারীপুরের মো. মাসুম খালাসী।
প্রথমে গ্রেপ্তার হওয়া এই ছয় আসামি কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের উসকানি ও স্লোগানের মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার বিষয়টি কারখানার বাইরে ছড়িয়ে দেন। তারাই দীপুকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে চাপ সৃষ্টি করেন। কেন ওই যুবককে পুলিশের হাতে না তুলে দিয়ে জনতার হাতে তুলে দেয়া হলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা।
উল্লেখ্য, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড কারখানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপুকে মারধর করেন শ্রমিকরা। পরে সহকর্মীরা তাকে কারখানার বাইরে নিয়ে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন।
দীপুর মরদেহ কারখানা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রশি দিয়ে টেনে নেয়া হয়। সেখানে উত্তেজিত জনতা মরদেহ উলঙ্গ করে গাছে ঝুলিয়ে জুতা দিয়ে আঘাত করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়।
খবর পেয়ে রাত আনুমানিক ২টার দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে অর্ধদগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় গত ১৯ ডিসেম্বর বিকেলে নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ১৫০ জনকে আসামি করে ভালুকা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভালুকা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ও রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে এ পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
বিভাগীয় ডিআইজি বলেন, দীপু হত্যাকাণ্ডে জড়িত পলাতক অন্যদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। অপরাধী যেই হোক কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আরও জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হবে। ইতোমধ্যে ঘটনার সময়কার একটি ভিডিওতে গ্রেপ্তারকৃত ইয়াসিনকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। তার বক্তব্যের পরই মব তৈরি হয়ে দীপুর নিথর দেহের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
সারাদেশ: মহেশপুর সীমান্তে যুবকের মরদেহ উদ্ধার