image
ছবিঃ সংগৃহীত

অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে যা বললো ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন

কূটনৈতিক বার্তা পরিবেশক

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে বাংলাদেশের সমাজের সব পক্ষের ভোট দেয়ার সুযোগ সৃষ্টিকে বোঝানোর কথা বলেছেন ত্রয়োদশ নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইইয়াবস।

রোববার, (১১ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের দৃষ্টিতে প্রথমত অন্তর্ভুক্তি মানে হচ্ছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের সামাজিক সব গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি; নারী, জাতিগত-ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মতো পক্ষগুলো যাতে অংশ নিতে পারে। আর অংশগ্রহণমূলক হওয়ার ক্ষেত্রে আমরা নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতির দিকে ভালোভাবে নজর রাখবো। যার মাধ্যমে আমরা ইঙ্গিত পাব যে, বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করছে।’

ঢাকার রেনেসাঁ হোটেলে ওই সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপে শুরু হয়েছে। ২০০৮ সালের পর এবার প্রথম পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে ঢাকাভিত্তিক ১১ জন বিশ্লেষক নিয়ে একটি কোর টিম, ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক, ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক, যাদের ভোটের ঠিক আগে মোতায়েন করা হবে এবং ইইউ সদস্য রাষ্ট্র ও অংশীদার দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনের পর্যবেক্ষকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

পর্যবেক্ষক মিশনে প্রায় ২০০ জন অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা এর আগে জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক মিশনের ৫৬ জন সদস্যের রোববার ঢাকায় পৌঁছার তথ্য দেয়া হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে।

ইভার্স ইইয়াবস বলেন, মিশনটি তাদের কার্যক্রম চলাকালে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও তার বাস্তবায়ন, নির্বাচনি প্রচার এবং নির্বাচনী বিরোধ-নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার লক্ষ্যে নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। এছাড়াও নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্য জনগোষ্ঠীসহ সবার রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করা হবে।

ভোটারদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা মূল্যায়নের জন্য ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইওএম) পৃথক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ইউনিট রয়েছে।

তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে, ইইউ ইওএম নির্বাচনগুলো জাতীয় আইন অনুযায়ী কতটা পরিচালিত হয়েছে, পাশাপাশি বাংলাদেশ যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানদ- গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা মূল্যায়ন করবে।

ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান বলেন, নির্বাচনের দুই দিন পর পর্যবেক্ষক মিশন একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং ঢাকায় একটি সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করবে। প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হবে, যেখানে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

অতীতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে সব রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের যে কথা ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতরা বলতেন, সে প্রসঙ্গে টেনে করা প্রশ্নে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং রূপান্তরকালীন সময়ে বিচারের ওই প্রশ্নে ইভার্স ইইয়াব্স বলেন, ‘অবশ্য ওই প্রেক্ষাপট থেকে অংশগ্রহণের বিষয়ে আমরা জানি দলের নিবন্ধন একটা ইস্যু এবং জাতীয় সমঝোতা এবং রূপান্তরকালীন সময়ে বিচারের বিষয়টি এখানে ঐতিহাসিকভাবে জটিল বিষয় বলেও আমরা জানি। আমরা এসব ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করছি না। তবে নির্বাচন, ভোটার উপস্থিতির মতো বিষয়ে এসবের কী প্রভাব, সেদিকে আমরা নজর রাখবো। সুতরাং নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলার জন্য আমরা এখানে আসিনি। অবশ্য আমরা সেটা জানি এবং সেটাকেও বিবেচনায় নিব।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তীর সরকার দলটির ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে গত বছর। নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত করায় দলটির নির্বাচনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

‘সরকারও আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন’

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ঝুঁকির’ কথা যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফেও আসছে এবং সেদিকে তাদের নজর রাখার কথা বলেছেন ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান।

বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণের উপযোগী কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটা বিষয় এবং সেখানে মনোযোগ দিচ্ছে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন। আমার প্রাথমিক আভাস হচ্ছে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুরূহ বিষয় হচ্ছে, একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকরভাবে মোতায়েন করা এবং অন্যদিকে, মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়া। এই দুয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, সেদিকে আমরা মনোযোগ রাখবো।’

সংসদ ও গণভোট একই দিন হওয়ার বিষয়ে ঝুঁকির দিক নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একইদিনে দুটো ভোট সাধারণত হয় না। তবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। গণভোট নয়, আমরা মূলত সংসদীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ করবো। কেননা ওই আমাদের ম্যান্ডেটের বাইরে। তবে যেহেতু দুটো বিষয় পরস্পর সংযুক্ত, নাগরিকরা ঠিকমত জেনে তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কিনা, সেদিকে নজর আমরা দেবো। গণভোট যেহেতু অনেক দেশের জন্য একটা ইস্যু এবং সে কারণে এতে বিশেষ মনোযোগ আমরা দিবো।’

ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ দেখছে কিনা, এমন প্রশ্নে ইভার্স ইইয়াবস বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে দেখব। উদাহরণস্বরূপ গণমাধ্যমে প্রবেশাধিকারের বিষয়ও আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।

সংশ্লিষ্ট মিডিয়ায় প্রত্যেক প্রার্থী কতটা প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, সেটা বহু দেশেই একটা ইস্যু। ভোটে প্রার্থিতাদের নিবন্ধনের মতো বিষয়ও ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ আরেকটি দিক। আমরা জানি, প্রার্থিতার বিষয়ে আপিল চলছে। এদিকটাও আমরা পর্যবেক্ষণ করবো।’

অতীতে ডিসি-এসপিদের ভোটে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গ টেনে এবারের পরিস্থিতির নিয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনের সময়ে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমরা অবশ্যই বিবেচনায় নেব। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানের পর রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে অস্থির সময়ের পথ ধরে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আমরা আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করছি এবং এ প্রসঙ্গে সরকারের সঙ্গে আলাপ করছি। তবে, এক্ষেত্রে আমার কোনো আভাস দেয়ার সময় এখনও আসেনি।’

প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স ইইয়াবস বলেন, ‘ব্যালটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে এবং বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ উপায়ে অনুষ্ঠিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি আশা করি এখানে আমাদের কাজ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।’

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি