image
ছবিঃ সংগৃহীত

চুয়াডাঙ্গায় সেনা হেফাজতে বিএনপি নেতার মৃত্যু, ক্যাম্প কমান্ডারসহ সব সেনা সদস্য প্রত্যাহার

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, ঢাকা ও প্রতিনিধি, চুয়াডাঙ্গা

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে আটক হওয়ার পর শামসুজ্জামান ডাবলু (৫২) নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতার মৃত্যু হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা জনগণের প্রত্যাশা নয়: মির্জা ফখরুল

মৃত্যুর ঘটনাটি ‘অনাকাক্সিক্ষত, দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে আইএসপিআরের বিবৃতি

কারণ উদ্ঘাটনে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন, দোষী সাব্যস্ত হলে সেনা আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস

এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প কমান্ডারসহ অভিযানে অংশ নেয়া সব সেনা সদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক’ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প কমান্ডারসহ অভিযানে অংশ নেয়া সব সেনা সদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বিএনপি থেকে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, নিহত শামসুজ্জামান ডাবলু জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি জীবননগর বসুতিপাড়ার মৃত আতাউর রহমানের ছেলে এবং পেশায় একজন ওষুধ ব্যবসায়ী ছিলেন। গত সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে ডাবলুর ওষুধের দোকান ‘হাফিজা ফার্মেসি’ থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে। আটকের পর তার (ডাবলু) ওষুধের দোকানের পেছনে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। সেখানকার চিকিৎসক রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডাবলুকে মৃত ঘোষণা করেন।

মঙ্গলবার, (১৩ জানুয়ারী ২০২৬) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার (গত) রাত আনুমানিক ১১টার দিকে জীবননগর উপজেলায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর একটি বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযান চলাকালে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসংলগ্ন ‘হাফিজা ফার্মেসি’ থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে শামসুজ্জামানকে আটক করা হয়।

আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, আটকের পর ডাবলুর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই ফার্মেসিতে তল্লাশি চালিয়ে একটি ৯ মিমি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অভিযান শেষে আটক ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে রাত আনুমানিক ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনা সদস্যকে সেনানিবাসে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনাটিকে ‘অনাকাক্সিক্ষত, দুঃখজনক এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ উল্লেখ করে আইএসপিআর আরও জানায়, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কোনো সদস্য দোষী সাব্যস্ত হলে সেনা আইনানুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অসুস্থতার কথা বলা হলেও নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, শামসুজ্জামান ডাবলুকে আটকের পর তার ওষুধের দোকানের পেছনে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। এই নির্যাতনেই তার মৃত্যু হয়েছে।

নিহত ডাবলুর ভাই ও জীবননগর উপজেলা বন কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম কাজল আহাজারি করে বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এর বিচার চাই।’ এর আগের রাতেও বিএনপির কয়েকজকে নির্যাতন ও বেধড়ক মারধর করা হয়েছিল বলে জানান উপজেলা ছাত্রদলের এক নেতা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ডাবলু তার ওষুধের দোকানে অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকেই তাকে আটক করা হয়। বিএনপির বাকা ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মুন্সী দাবি করেন, ‘শামসুজ্জামান ডাবলুকে বিএনপি অফিসে নিয়ে সেনাবাহিনী মারধর করে। এ কারণেই তিনি মারা যান।’

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকেই জীবননগর শহর উত্তাল হয়ে উঠে। বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ জনতা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের প্রধান সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করেন, যার ফলে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

একপর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সে সময় হাসপাতালের ভেতরে থাকা সেনা সদস্যরা কিছুক্ষণের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং ফটক আটকে দিতে বাধ্য হন। নেতাকর্মীরা ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনাটিকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে স্লোগান দিতে থাকেন। মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে রাখেন।

খবর পেয়ে গতকাল সোমবার রাত ৩টার দিকেই হাসপাতালে ছুটে যান চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু। তিনি উত্তেজিত নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানান এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা আইন হাতে তুলে নেব না। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’ নিহতের পরিবার মামলা করবে বলেও তিনি জানান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকালে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। তারা বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও লাশের ময়নাতদন্তের আশ্বাস দেন। জেলা প্রশাসক বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘মৃত্যুর বিষয়টি কোনোক্রমেই সহজ করে দেখা হবে না। মরদেহ ময়নাতদন্ত হবে, মামলা হবে। দোষী কেউ থাকলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না।’ পুলিশ সুপারও ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দেন।

দুপুরের পর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। জীবননগর থানার ওসি সোলায়মান শেখ নিশ্চিত করেছেন ওই অভিযানে পুলিশ ছিল না, শুধুমাত্র সেনাবাহিনীর সদস্যরা ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পৌর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিউদ্দিন শফি।

শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুর ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অস্ত্র উদ্ধারের নামে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা কখনোই দেশের মানুষের নিকট সমর্থনযোগ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, বিচারবহির্ভূতভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি চরম অবমাননা এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এটি জনগণের প্রত্যাশা নয়। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন।

বর্তমানে জীবননগর শহরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নিহত শামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি