image
ছবিঃ সংগৃহীত

নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে: বদিউল আলম

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো যে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করবে তাতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিক সংগঠন ‘সুজনের’ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।

প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে ‘নাগরিক আদালতের’ মুখোমুখি দাঁড় করানোর সতর্কতা

সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচন চায় সুজন

‘মব সন্ত্রাস’ বন্ধের তাগিদ

তিনি বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নাগরিক সমাজ কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখাও দেখতে চায়।

মঙ্গলবার, (১৩ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক এক বিভাগীয় সংলাপে তিনি এ কথা বলেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পক্ষ থেকে সংলাপে বলা হয়, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বিচার, সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে স্পষ্টভাবে থাকা দরকার বলে মনে করে সংগঠনটি। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ১৫টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব ও প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সুজন।

বদিউল আলম মজুমদার সংলাপে বলেন, ‘অনেক প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের পরও গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বরং নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগে গত ১৫ বছরে দেশে এক ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান সেই ধারার বিরুদ্ধে জনগণের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্র মেরামতের এক নতুন সূচনার নাম। এই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে তিনটি অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এগুলো হচ্ছে- বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংস্কারের লক্ষ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।’

তিনি বলেন, “সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’। এই সনদকে তারা জনগণের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আত্মত্যাগ ও বঞ্চনার বিপরীতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে দেখছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও সময়বদ্ধ অঙ্গীকার থাকতে হবে।”

নাগরিক আদালত

রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে ভবিষ্যতে তাদের ‘নাগরিক আদালতের’ মুখোমুখি দাঁড় করানো হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ‘যদি দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তবে নাগরিক সমাজ বা নাগরিক আদালত ভবিষ্যতে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে পারে।’

মব সন্ত্রাস

এ সময় দেশের মঙ্গলের জন্য দ্রুত ‘মব’ সন্ত্রাস বন্ধের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘মব’ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত এর অবসান হয়, ততই দেশের জন্য মঙ্গল।’

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমার নিজের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। তখন মব ঘটিয়ে নানাভাবে আমাকে হেনস্তা করা হয়েছে। দেশে পূর্বে মব হলেও তখনকার প্রতিকূল পরিবেশে সংবাদমাধ্যম সেগুলো সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি বা গুরুত্ব দেয়নি।’

গণতান্ত্রিক চর্চায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রত্যক্ষ নাকি পরোক্ষ হবে এ নিয়ে কমিশনের ৮ সদস্যের মধ্যে সাতজন প্রত্যক্ষ ভোটের পক্ষে থাকলেও একজন সদস্য (তোফায়েল রহমান) ভিন্নমত পোষণ করেন।’

তিনি বলেন, “আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ৭ জন এক পক্ষে থাকলেও, যিনি ভিন্নমত দিয়েছেন তার সেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আমরা আমাদের চূড়ান্ত সুপারিশে গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করেছি। রাজনৈতিক দলগুলো পরবর্তীতে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে ভিন্নমতকে নথিবদ্ধ করা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা।”

জনসেবার বদলে অর্থ উপার্জন

বর্তমান রাজনীতি জনসেবার বদলে অর্থ উপার্জনের মুখ্য উপায়ে পরিণত হয়েছে মন্তব্য তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের সম্পদ ও আয় আকাশচুম্বীভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০০৮-২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের আয় ও তাদের ওপর নির্ভরশীলদের সম্পদ কয়েক গুণ বেড়েছে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে রাজনীতি এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এর বিপরীতে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির প্রার্থীদের সম্পদের বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত সামান্য।’

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘অতীতে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে মানবাধিকার সম্মত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার বিষয়ে ইশতেহারে স্পষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। বিচার বিভাগের চলমান সংস্কারকে সংহত করা, নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

নারীর ক্ষমতায়ন

সংলাপে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নেও স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে সুজন। সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বাড়িয়ে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তা পূরণের প্রতিশ্রুতি, নারী নির্যাতন রোধে শিক্ষাঙ্গন, কর্মক্ষেত্র ও পাবলিক পরিসরে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কৌশল ইশতেহারে থাকা দরকার বলে জানানো হয়।

এছাড়া শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ক্ষমতা ও আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, নিয়মিত নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং আনোয়ার হোসেন বনাম বাংলাদেশ মামলার রায় অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার অঙ্গীকারও ১৫ দফার অংশ।

স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মানসম্মত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার রূপরেখা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং বিশুদ্ধ বায়ু ও নিরাপদ পানীয় জলের সংকট সমাধানে রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ঘোষণার দাবিও জানায় সুজন।

পাশাপাশি পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় ভারসাম্যপূর্ণ, আত্মমর্যাদাশীল ও জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির কথা তুলে ধরা হয়। ইন্দো-প্যাসিফিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ যেন সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে হয় সে প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে দেখতে চায় সংগঠনটি।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি