বিগত ৩ নির্বাচনে আ’লীগকে জয়ী করতে গোয়েন্দা সংস্থার অনেকে ‘স্বপ্রণোদিত’ ছিলেন: প্রতিবেদন

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

দশম থেকে দ্বাদশ, বিতর্কিত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা ‘স্বপ্রণোদিত হয়ে’ কাজ করেছেন বলে এ বিষয়ক কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

নির্বাচনে সব ধরনের কাজে সব গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বন্ধ করার সুপারিশ কমিশনের

আওয়ামী লীগের টাকা ব্যয় করা হয় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে

এতে বলা হয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা নির্বাচনে ‘কারচুপির পরিকল্পনা প্রণয়ণের’ পাশাপাশি তা ‘বাস্তবায়নেও অংশ নিয়েছেন’।

দেশ-বিদেশে নানা কারণে আলোচনায় আসা ওই তিন নির্বাচনের ‘দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকা-’ তদন্তে গঠিত ‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’ এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

নির্বাচনের সব ধরনের কাজে সব গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা বন্ধ করার সুপারিশ করে কমিশন। তবে নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তার কাজে যদি তাদের (গোয়েন্দা সংস্থা) সহায়তা দরকার মনে করে তবে তা নিতে পারবে; এজন্য আলাদা বিধান করার পরামর্শ দেয়া হয় প্রতিবেদনে।

দশম থেকে দ্বাদশ, বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন পরিচালনার ভার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে নয়, প্রশাসনের হাতেই ছিল বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে ‘দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় রাখতে’ সর্বশেষ তিন সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ‘অভিনব মহাপরিকল্পনা’ করা হয়, যা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গত সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিশনের প্রধান হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। এর দুদিন পর বুধবার, (১৪ জানুয়ারী ২০২৬) এটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।

‘জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশন’ শীর্ষক ৩২৬ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আয়োজিত এসব নির্বাচনের ‘নীল নকশা’ বাস্তবায়নে মূলত দুটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ‘অপব্যবহার করা হয়’ বলে তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ ওই নির্বাচনের সব বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে ‘প্রশাসনই হয়ে ওঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি’।

ডিজএফআই, এনএসআই

প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করে ওই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল বলে কমিশনের প্রতিবেদন হস্তান্তরের দিন বিফ্রিংয়ে বলা হয়। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডিজিএফআই এবং এনএসআই গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা সার্বিক নির্বাচনী পরিকল্পনায় মূল ভূমিকা পালন করেন। মাঠপর্যায়ে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন সংস্থা দুটির আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা- বিভাগ, মহানগর ও জেলাপর্যায়ে কর্মরত পরিচালক, যুগ্ম পরিচালক, উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালকরা। পরিকল্পনা মাফিক কর্মকা- বাস্তবায়নের জন্য আওয়ামী লীগ বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করে। মূলত এই টাকা ব্যয় করা হয় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেছনে।’ গোয়েন্দা সংস্থার কে কোথায় অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বে ছিলেন? সেটির একটি তালিকাও তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।

*সাবেক সিইসির জবানবন্দি*

এ দুটি সংস্থার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত করতে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার আদালতে দেয়া জবানবন্দিও উদ্ধৃত করা হয় প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ‘নুরুল হুদা আদালতে প্রদত্ত জবানবন্দিতে বলেন, তৎকালীন সময়ে গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই এবং ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাটা নিয়ন্ত্রণ করেছিল বলে আমি পরে বুঝতে পারি।’

*পুলিশ ও প্রশাসন*

বির্তক তৈরি হওয়া সেই তিন নির্বাচনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলা হয়, ‘২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত যথাক্রমে দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনেক কর্মকর্তা স্বপ্রণোদিত হয়ে এবং/অথবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। তদন্তাধীন তিনটি নির্বাচনেই পুলিশ প্রশাসন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্বাচনে কারচুপির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশগ্রহণ করেছেন।’

প্রতিবেদনের নবম অধ্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা নিয়ে লেখা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে সরকার তার ইচ্ছমতো ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের সহায়তা পায়নি বিধায় ২০১৮ সালের নির্বাচন থেকেই প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করতে শুরু করে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে এই ভূমিকা আরও জোরালো ও স্পষ্ট হতে শুরু করে।’

*তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল*

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আয়োজিত আলোচিত এ তিন নির্বাচনের মধ্যে বিএনপি ও তার মিত্ররা ২০১৪ ও ২০২৪ সালের ভোট বর্জন করে। এর মধ্যে ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অর্ধেকের বেশি আসনে জিতে যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘ডামি প্রার্থীর’ ভোট দেখে বাংলাদেশ। আর ২০১৮ সালে বিএনপি নির্বাচনে এলেও তা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে অভিযোগের মুখে পড়ে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তিনটি নির্বাচনই ভোটারবিহীন এবং অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার আলোচনা ছিল সর্বত্র।

*কমিটি থেকে কমিশন*

চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ তিন সংসদ নির্বাচন ঘিরে ওঠা অভিযোগ পর্যালোচনা এবং নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা বিশ্লেষণে পাঁচ সদস্যের কমিটি করে সরকার। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যালোচনায় গত ২৬ জুন এ কমিটি করা হয়।

পরে ক্ষমতা বাড়িয়ে এটিকে কমিশনে রূপান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার। তখন কমিশনকে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়। পরে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়।

হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন কমিশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তদন্ত কমিটিতে ছিলেন সচিব পদমর্যাদার সাবেক কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপণ), ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন ও নির্বাচন বিশ্লেষক মো. আব্দুল আলীম।

কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে’ এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।

*মাস্টারপ্লান*

প্রতিবেদনের বিষয়ে ওইদিন বিফ্রিংয় করতে এসে কমিশন প্রধান শামীম হাসনাইন বলেন, ‘২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ এর তিনটা ইলেকশন বটে, কিন্তু এটার মাস্টারপ্লান একটা। এই মাস্টারপ্লানটা হয়েছে ২০০৮ সালের পরে। ওই নির্বাচনের পরে, ওখান থেকে একটা পরিকল্পনা ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারটা বাতিল করা। পরে ২০১১ সালে ওটা বাতিল করা হয়।’

ব্রিফিংয়ে সাবেক এই বিচারপতি আরও বলেন, ‘ওই সময়ে ওটা বাতিল করার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। ইভেনচুয়ালি রুলিং পার্টি যতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে যে কোনো স্ট্রাটেজিতে যে কোনোভাবে তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা বাধা ছিল।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল পরবর্তী নির্বাচনগুলোর সব কিছু স্বচ্ছভাবে কমিশন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে জানান শামীম হাসনাইন।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» খেলাফতের মামুনুলকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ইসির

» জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর ১৪শ’ মানুষের রক্তে লেখা: আলী রীয়াজ

» শিপিং করপোরেশনের ‘মুনাফা ৩০৬ কোটি টাকা’, লাভ ধরে রাখার আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

» বাহরাইনে ‘পোস্টাল ব্যালট বিতরণ’ করার ঘটনা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

» বাংলাদেশে আগমনী বা অন-অ্যারাইভাল ভিসা স্থগিত: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

সম্প্রতি