দেশে এলপি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতার জন্য ‘আমদানি সীমা বাড়ানোর আবেদনে সরকারের সাড়া না পাওয়াকে’ অন্যতম কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
সীমার অতিরিক্ত আমদানি হওয়ার ঘটনা আছে: বিইআরসি চেয়ারম্যান
বাজারে দাম দ্বিগুণ, বাড়তি টাকা কার পকেটে যায়, প্রশ্ন ক্যাব সভাপতির
তিনি বলেন, ‘তিতাসও ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করছে’
এলপিজি ব্যবসায় লাইসেন্সিং বড় সমস্যা: অধ্যাপক ম. তামিম
দেশে প্রায় ৬০ লাখ পরিবার এলপিজি ব্যবহার করছে: যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক
বৃহস্পতিবার, (১৫ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় তার বক্তব্যে এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। লোয়াব সভাপতির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, এই সীমার অতিরিক্ত আমদানি হওয়ার ঘটনা আছে। শিথিলযোগ্য এই সীমা কোনো সমস্যা না। তবে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থার প্রভাব দেশে এলপিজির সরবরাহ ও বাজারে পড়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, চীন এলপি গ্যাস কেনার পরিমাণ বাড়ানোর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনেক জাহাজ কালো তালিকাভুক্ত করায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হয়েছে।
এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সহযোগিতায় ‘এলপিজি বাজারে খাতের রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ গোলটেবিলের আয়োজন করে লোয়াব।
দেশে এলপি গ্যাসের (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি) বাজারে বেশ কিছুদিন যাবৎ দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। সরকার নির্ধারিত দামের প্রায় দ্বিগুণ মূল্যেও অনেক এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা।
আলোচনায় ১ হাজার ৩০৫ টাকা নির্ধারিত দামের সিলিন্ডার ২৫০০-২৬০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হওয়ার বিষয়ে জানতে চান এক সাংবাদিক।
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে লোয়াবের সভাপতি বলেন, ‘আইগ্যাস, মেঘনা গ্রুপ, ডেল্টা, ওমেরা, যমুনাÑ এই পাঁচ কোম্পানির আমদানি সীমা বাড়ানোর জন্য সংগঠনের পক্ষে আবেদন করেছিলাম। এক বছর পর নভেম্বর মাসে জ্বালানি মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে বললো, মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা কাভার করে না বলে নতুন করে পরিমাণ বাড়াতে পারবে না। আমি যদি পরিমাণ বাড়াতে না পারি, আমি আনতে পারতেছি না।’
তার সংগঠন লোয়াব দাম নির্ধারণ করে না দাবি করে তিনি বলেন, ‘প্রাইসিং করে বিইআরসি। ওষুধের দাম, বা অন্যান্য পণ্য আপনি যদি বাজার থেকে কিনতে যান, ওখানে যদি বেশি দামে বিক্রি করে আপনি কিনবেন? নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আছে না! কোনোটা বেশি দামে বিক্রির করার রাস্তা আছে নাকি? লোয়াব এক টাকাও বেশি দামে বিক্রি করে না।’
তার এ বক্তব্যের পর বাজার রেগুলেশনের বিষয়ে নানা কথার পাশাপাশি আমদানি সীমা নিয়েও কথা বলেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
সীমার বাইরে বিভিন্ন কোম্পানির আমদানির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘লিমিটের বিষয়টা আমি সমস্যা বলে মনে করি না। কেন, না বলে মনে করি, এক বছর পেন্ডিং থাকার পর জ্বালানি বিভাগ ‘নীতিমালায় নেই’ বলে তারা আবেদনগুলি নামঞ্জুর করেছেন।’
সীমার বাইরে আমদানি
গোলটেবিল আলোচনায় বিইআরসি চেয়ারম্যানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনাইটেড আইগ্যাসের লিমিট যখন এক লাখ টন, তখন তারা আমদানি করেছে এক লাখ ৮৩ হাজার টন। ৩ লাখ টন সীমার জায়গায় ওমেরা ২ লাখ ২০ হাজার টন, ২ লাখ ৫০ হাজার টন সীমার মেঘনা ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ১ লাখ ৮০ হাজার টন সীমার যমুনা স্পেসটেক ২ লাখ ৮ হাজার টন এবং ৬০ হাজার টন আমদানি সীমার ডেল্টা এলপিজির ৮০ হাজার টন এনেছে।
জালাল আহমেদ বলেন, ‘অর্থাৎ লিমিট ক্রস করে যারা আমদানি করেছে, কাউকে আটকানো হয়নি, তারা আমদানি করতে পেরেছে।’
তিনি বলেন, ‘লিমিটের বিষয়ে আমার যেটা ব্যক্তিগত অভিমত, এটার থাকার দরকার নাই। তবে কালকে যখন আমরা আলাপ করেছিলাম আপনাদের অনেকের সঙ্গে, কেউ কেউ বলেছে যে একটা লিমিট থাকতে পারে। থাকলে সেটা শিথিল থাকবে।’
জালাল আহমেদ বলেন, ‘ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে অচলাবস্থার কারণে চীন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যাপক পরিমাণে পাইকারি এলপিজি কিনেছে। গত নভেম্বর-ডিসেম্বরে অসংখ্য জাহাজ কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নভেম্বরে ১৮৪টি জাহাজ ও ১০টি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আসছে। ডিসেম্বরে ২৯টি জাহাজ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এসেছে। ইরান থেকে জ্বালানি বের না হওয়ার কারণে চীনের মতো বড় ক্রেতারা ব্যাপক কেনাকাটা করছে। ফলে বাংলাদেশের ছোট ক্রেতারা সুযোগ কম পেয়েছে।’
রোজায় হয়তো সংকট হবে না
আগামী রোজার মাসে সংকট যাতে অতটা প্রকট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই এখনই উদ্যোগ নিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করে তিনি বলেন, ‘উনারা যেন চেষ্টা করেন যত বেশি সম্ভব এই মাসে আনার। এই মাসে যদি এক লাখ ৫০ হাজার টনও চলে আসে, আমার ধারণা এটা এখনকার সমস্যাটা কমিয়ে আনবে এবং ফেব্রুয়ারির কার্গোটা যেন উনারা নিশ্চিত করেন। বৃহস্পতিবার উনাদের কাছে চেয়েছি আমি তিন মাসের প্রক্ষেপণ, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ। যদি উনারা জানুয়ারিতে এক লাখ ৫০ হাজার টন নিশ্চিত করতে পারেন এবং ফেব্রুয়ারির ডেলিভারিটা যদি নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে হয়তো আমাদের রমজানের সমস্যাটা থাকবে না।’
*বাড়তি টাকা কার পকেটে যায়*
আলোচনায় নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান।
তিনি বলেন, ‘কেন এক হাজার ৩০৬ টাকার গ্যাস আমরা ২৫শ’ টাকায় কিনবো? একজন সাংবাদিক ভাই এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, টাকা দিলে গ্যাস পাওয়া যায়। লোয়াবের যারা আছেন, যারা এটার অপারেটর তারা বলছে যে ওই প্রাইজেই দিচ্ছে। তাহলে তাদের ফ্যাক্টরি থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত, আমি রিটেইলারের কাছ থেকে যখন কিনছি, এটার সঙ্গে যারা স্ট্রাইক করেছিল কয়দিন আগে বা সেখানে কোথায় গ্যাপ আছে। সেখানে কী হলো, জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বললো যে, আমাদের লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে, ম্যাজিস্ট্রেটদেরকে মোবাইল কোর্ট করার জন্য, ভোক্তা অধিকারের ডিজিকে আমরা বললাম, ওরাও যেন এটা নিয়ে কাজ করে।’
এলপিজি অপারেটররা বাড়তি দাম না নিলে সেই টাকা কার পকেটে গেছে, সেটা খুঁজে বের করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ১৩০০ টাকা বা এরকম ১২০০ টাকা অতিরিক্ত, এই টাকাগুলো কাদের পকেটে গেছে, আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলে কোথায় এই টাকাগুলো চলে গেছে অতিরিক্ত, সেটাও বের করা দরকার।’
*‘তিতাসও প্রতারণা করছে’*
গ্রাহক থেকে বিল নিলেও গ্যাস না দিয়ে তিতাস ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা করছে মন্তব্য করে ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘আমাদের যাদের পাইপলাইনে গ্যাস আছে, কোনো জায়গায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, ১১শ’ টাকা বিল নিচ্ছে, কেন? এটা ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা। তিতাস গ্যাস বলছে যে, তাদের এটা চুরি হয়; চুরি বন্ধ করার দায়িত্বটা কার? এবং তারা মেইন যে গ্রিড লাইন সেখান থেকে পাইপ দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে বিভিন্ন জায়গায় গ্যাস দিয়েছে। এটা অন্য কেউ করেনি। তিতাসের লোকজনই করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমি যদি ওই তিতাস গ্যাসের সুশাসন নিশ্চিত না করতে পারি, তাহলে এলপিজির ওপরে এই অতিরিক্ত চাপ পড়বে। আপনি পাইপলাইনের গ্যাসের বিল দিচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে আপনার সিলিন্ডার কিনতে হয়। ১৩০০ টাকার সিলিন্ডার আপনার কিনতে হয় ২৫০০ টাকায়। তিতাস যেখানে গ্যাসগুলো দেয়ার কথা, সেটা যদি ঠিকভাবে দিতে পারতো, তাহলে তো নিশ্চয়ই সিলিন্ডারের ওপর এ চাপটা পড়তো না।’
*লাইসেন্সিং সমস্যা*
অনুষ্ঠানে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এলপিজি ব্যবসায় লাইসেন্সিং একটা বড় সমস্যা। যে কারণে প্রায় ২৮টি কোম্পানি ব্যবসায় নেমেও টিকে আছে কেবল ৮-১০টি। বছরে এক কোটি টাকারও বেশি যদি লাইসেন্স নবায়নে খরচ হয়ে যায় তাহলে কোম্পানিগুলো এই টাকা কার কাছ থেকে আদায় করবে? সেজন্য কয়েক বছরের জন্য আরও কম খরচে লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক চর্চা হচ্ছে একক রেগুলেটর এবং কয়েক বছরের জন্য লাইসেন্স। সবার জন্য ল্যাবের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। একটা ল্যাব থেকেই পণ্যের মান যাচাই করা সম্ভব। প্রয়োজনে বছরব্যাপী পরিদর্শন কাজ চালানো যেতে পারে।’
মালিকদের তথ্যের বরাত দিয়ে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা এম আমজাদ হোসেন বলেন, ‘রেগুলেটরি খরচ কমালে ১২ কেজি একটি সিলিন্ডারে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব।’
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক বলেন, ‘দেশের প্রায় ৬০ লাখ পরিবারে এলপিজির ব্যবহার রয়েছে। তাই এটি এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এলপিজি নীতিমালা নবায়ন করছে। সেখানে কীভাবে এই খাতকে সমস্যামুক্ত করা যায় সেই দিক নির্দেশনা যোগ করা হবে।’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বিএনপি নেতা জহিরউদ্দিন স্বপন, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক আবুল হাসান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুজ্জামান সরকার বক্তব্য দেন।