আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মায়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগসংক্রান্ত শুনানি গত সোমবার শুরু হয়েছে।
মায়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্যেই যাদের নিশানা করা হয়েছে। তাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করা হয়েছে। তাদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া। মূলত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
এটি গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) প্রথম কোনো জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে এই শুনানি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলাও রয়েছে। গত সোমবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতকে বলেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প ও একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে ঘিরে মামলাটি করা হয়েছে। মায়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যাদের নিশানা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আছে- কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, দাদা-দাদি।
জ্যালো আরও বলেন, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তাদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন।
গাম্বিয়া আগামীকাল পর্যন্ত বিচার আদালতে তাদের প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। দেশটির অভিযোগ, মায়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।
দাউদা জ্যালো আদালতে বলেছেন, ‘আমরা হালকা ধরনের প্রস্তুতির ভিত্তিতে এ মামলা করিনি। অনেক বছর ধরে অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি অসহায় গোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংস ও নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করার পরই আমরা এই মামলা দায়ের করেছি।’
মায়ানমার জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা আগামী ১৬-২০ জানুয়ারির ভেতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। নিপীড়নের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জন্য বিরল ঘটনা। ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষ হবে।
২০২০ সালে আইসিজে মায়ানমারের ওপর জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী পদক্ষেপ জারি করেছিল। এর আওতায় রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনমূলক সহিংসতা রোধ ও অতীতের অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে মায়ানমার সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সেনাবাহিনী এখনো নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, মায়ানমারের সেনাবাহিনীর উচিত ‘নৃশংস নির্যাতন ও দমনমূলক অব্যবস্থাপনার চক্র’ শেষ করা। তার মতে, দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের জান্তাকে আইসিজে নির্ধারিত অস্থায়ী ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করা।
আইসিজেতে করা মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম নয় বরং এর মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হবে, মায়ানমার জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে কিনা।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালে আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং-এর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মালভি বলেন, ‘আমরা যখন সশস্ত্র সংঘাত, ন্যায়বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছি, তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন একটি মামলায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।’
মালভি বলেন, ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে মামলার রায় আসতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, যদি মায়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হয়, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে থেকে যাবে।
অপরাধ ও দুর্নীতি: জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি, তথ্য বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয়
শিক্ষা: এসএসসি পরীক্ষা ২১ এপ্রিল শুরু