নওগাঁ বিআরটিএ’র বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ

প্রশিক্ষণ শেষে বাধ্যতামূলক ঘুষ

জেলা বার্তা পরিবেশক, নওগাঁ

সরকারি অর্থায়নে দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত নওগাঁ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-তে বাস্তবায়িত সিসেফ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চার মাসব্যাপী মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ শেষে বিআরটিএর চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই অর্থ আদায় ছিল ‘অঘোষিত বাধ্যবাধকতা’; টাকা না দিলে কোনো শিক্ষার্থীই বিআরটিএর মোটর ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাস করতেন না।

দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির অংশ হিসেবে নওগাঁ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সিসেফ প্রকল্পের আওতায় দুটি ব্যাচে (২৫+২৪) মোট ৪৯ জন প্রশিক্ষণার্থীকে মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। চার মাসব্যাপী এই কোর্সের সব কার্যক্রম টিটিসি নওগাঁতেই অনুষ্ঠিত হয়। প্রশিক্ষণ শেষে গত ২৯ ডিসেম্বর নওগাঁ বিআরটিএ কর্তৃক চূড়ান্ত মোটর ড্রাইভিং পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। তবে পরীক্ষার আগের দিনই ঘটনার মোড় নেয় ভিন্ন দিকে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পরীক্ষার আগের দিন ২৮ ডিসেম্বর (গত বছর) সিসেফ প্রকল্পের দুই শিফটের শিক্ষক ওয়ালীউল্লাহ সানি ও মাহবুব আলম নয়ন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা করে আদায় করেন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন ‘এই টাকা না দিলে বিআরটিএ পরীক্ষায় কাউকেই পাস করানো হবে না।’

শিক্ষক সানি ও নয়নের দাবি, এসব টাকা নওগাঁ বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শককে না দিলে মোটর ড্রাইভিং পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থীই পাস করবে না।

প্রশিক্ষণার্থী নুরুন্নবী, হাবিবুর রহমান, রবিউল ইসলাম, শামসুদ্দোহাসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ‘চার মাসের প্রশিক্ষণ শেষ করে পরীক্ষার আগ মুহূর্তে আমাদের সামনে শর্ত দেয়া হয়Ñ টাকা না দিলে সবাই ফেল করবে। বাধ্য হয়ে আমরা দুই হাজার টাকা করে দিয়েছি।’

তারা আরও বলেন, ‘প্রশিক্ষণের শুরুতে বলা হয়েছিল প্রশিক্ষণ ভাতা দেয়া হবে। কিন্তু ভাতা তো দূরের কথা, উল্টো আমাদের কাছ থেকে জোর করে প্রায় এক লাখ টাকা ঘুষ নেয়া হয়েছে। এটি সরাসরি দুর্নীতি।’

ভুক্তভোগীরা এই অর্থ আদায়কে জোরপূর্বক ও অন্যায় উল্লেখ করে বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক ওয়ালীউল্লাহ সানি ও মাহবুব আলম নয়ন বলেন, ‘চার মাস ধরে আমরা শিক্ষার্থীদের সব কিছু শেখাই। শেষ সময়ে এসে যদি তারা বিআরটিএ পরীক্ষায় ফেল করে, তাহলে চার মাসের সব পরিশ্রমই ব্যর্থ হবে। পরীক্ষায় পাস করলে বিআরটিএ লাইসেন্স দেয়। কিন্তু বিআরটিএর অবস্থা তো আপনারা জানেন তাদের চাওয়া-পাওয়া আছে। ঘুষ না দিলে যে কোনো অজুহাতে শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেওয়া হয়। তাই বাধ্য হয়েই এই টাকা দিতে হয়।’

প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে ঘুষের পরিমাণ কত এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুব আলম নয়ন বলেন, ‘আসলে ঘুষের নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ নেই। যার কাছ থেকে যত পায়। আমাদের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা দিতে হয়।’

নওগাঁ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিআরটিএ নওগাঁর আপাদমস্তক এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ড্রাইভিং পরীক্ষার বোর্ড মিটিংয়ে যারা সদস্য থাকেন মোটরযান পরিদর্শক, সহকারী পরিচালক (এডি) থেকে শুরু করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) পর্যন্ত সবাই এই ঘুষের ভাগ পান।’

এই বক্তব্য বিআরটিএ পরীক্ষাকে ঘিরে একটি সংগঠিত ঘুষ নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) নওগাঁ জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট মহসীন রেজা বলেন, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্সে ঘুষ মানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আপস। নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে বিষয়টি আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।’

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সভাপতি ডিএম আব্দুল বারী বলেন, ‘ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স পাওয়া চালক মানেই সড়কে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ানো। এটি শুধু দুর্নীতি নয়, জননিরাপত্তার প্রশ্ন।’

সমাজকর্মী নাইস আক্তার বলেন, ‘এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। এ বিষয়ে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার হস্তক্ষেপ জরুরি।’

টিটিসি নওগাঁর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান বলেন, ‘সিসেফ প্রকল্পের প্রশিক্ষণের জন্য এখানে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। তবে বিআরটিএ পরীক্ষার বিষয়ে অভিযোগ পেলে আমরা তদন্ত করবো।’

নওগাঁ বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মো. শরিফুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিআরটিএ নওগাঁর সহকারী পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘মহাপরিচালকের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না।’

জেলা প্রশাসকের প্রতিনিধি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জান্নাত আরা তিথিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সরকারি প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আড়ালে ঘুষের এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। দ্রুত স্বাধীন তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হলে সড়ক নিরাপত্তা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» আইসিজেতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের বিচার শুরু

সম্প্রতি