বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্মরণে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশাল নাগরিক শোকসভা। সভায় বক্তারা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আপসহীন নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং নারী শিক্ষার উন্নয়নে তার অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
খালেদা জিয়া সত্যিকার অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন: নূরুল কবীর
বাংলাদেশকে ভালো
রাখতে হলে খালেদা জিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হবে: আসিফ নজরুল
একই সঙ্গে তার চিকিৎসায় ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’র অভিযোগ তুলে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানানো হয়। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘নাগরিক সমাজ’-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় দলমত-নির্বিশেষে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ অংশ নেন।
শুক্রবার, (১৬ জানুয়ারী ২০২৬) দুপুর আড়াইটার পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই শোকসভা চলে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন।
শোকসভায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ডা. এফ এম সিদ্দিকী গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যে অবহেলা করা হয়েছে, তা ‘উইলফুল নেগলিনেন্স’ বা ইচ্ছাকৃত অবহেলা, যা অমার্জনীয় অপরাধ। তিনি অভিযোগ করেন, ভুল চিকিৎসা বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ‘মেথোট্রেক্সেট’ নামক ওষুধের প্রয়োগ তার ফ্যাটি লিভারকে লিভার সিরোসিসে ত্বরান্বিত করেছে, যা তার লিভারের জন্য ‘স্লো পয়জন’ বা ধীরগতিতে বিষের মতো কাজ করেছে।
ডা. সিদ্দিকী বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, লিভার ফাংশন টেস্ট খারাপ দেখার পরও তৎকালীন সরকার নির্ধারিত চিকিৎসকরা একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম পর্যন্ত করেননি এবং ওষুধটিও বন্ধ করেননি। তিনি এই ঘটনাকে হত্যার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ কিনা, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে বিস্তারিত তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি বিএসএমএমইউর সমস্ত নথিপত্র জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার দাবিও জানান। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তার বক্তব্যে বলেন, ‘এক নেত্রীর ঠাঁই হয়েছে মানুষের হৃদয়ে, আরেকজনের বিতাড়িত ভূমিতে।’ তিনি বিগত সময়ে খালেদা জিয়ার ওপর হওয়া ‘জঘন্য বিচার’ এবং রাজনৈতিক বন্দিত্বের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সততা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে এবং বাংলাদেশকে ভালো রাখতে হলে তাকে ‘ইন্টারন্যাশনালাইজ’ বা আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি সত্যিকারের অর্থেই মানুষ ও দেশের নেত্রী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি খালেদা জিয়ার রুচিশীলতা ও পরিমিতিবোধের প্রশংসা করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চরম আঘাত ও দুর্ভোগের মুখেও তিনি কখনোই প্রকাশ্যে ঘৃণা বা নিন্দাসূচক বক্তব্য দেননি।
ব্যবসায়ী নেতারা খালেদা জিয়ার শাসনামলে নেয়া অর্থনৈতিক সংস্কারের ভূয়সী প্রশংসা করেন। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, খালেদা জিয়ার সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, আইনের শাসন ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। তিনি নারী শিক্ষার বিস্তার ও ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, আজ নারীদের যে অংশগ্রহণ, তার পেছনে সেই সময়ের উদ্যোগ বড় ভূমিকা রেখেছে।
আইসিসি বাংলাদেশের নির্বাহী সদস্য ও ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বলেন, নব্বইয়ের দশকে খালেদা জিয়ার বাজারমুখী নীতির ফলে বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগে গতি আসে। ভ্যাট পলিসি, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়া সব সময় নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবসা করার অনুপ্রেরণা দিতেন।
শোকসভায় যোগ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নিরাপত্তা উপদেষ্টা ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিনসহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সিনিয়র সম্পাদক শফিক রেহমান, সিপিডির দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রমুখ।
দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। শোকসভাকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।