কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স সংকট: রিকশা আর ভ্যানে হাসপাতালে নেয়ার পথে ৫০৯ কারাবন্দীর মৃত্যু

বাকী বিল্লাহ

দেশের কারাগারগুলোতে প্রয়োজনের তুলনায় অ্যাম্বুলেন্স অনেক কম। এ কারণে কারাগার থেকে অসুস্থ বন্দীদেরকে প্রায়ই রিকশা, ভ্যান বা পিকআপযোগে হাসপাতালে নিতে হয়। আর তাতে হাসপাতালে নেয়ার পথে রাস্তায় অনেক বন্দীর মৃত্যু হয়।

সাত বছর ধরে অ্যাম্বুলেন্স কেনার ফাইল ঝুলছে মন্ত্রণালয়ে

কারাগারে চিকিৎসকের পদ ১০৩টি, আছেন ২ জন

কারা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, এভাবে হাসপাতালে নিতে গিয়ে গত ৫ বছরে ৫০৯ জন বন্দী পথেই মারা গেছেন।

কারাগারগুলোতে চিকিৎসকেরও সংকট আছে। কারাগারগুলোতে কাগজে-কলমে চিকিৎসকের পদ আছে ১০৩টি, তবে মাত্র ২ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন বলে কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে।

অ্যাম্বুলেন্স সংকটে মৃত্যু

প্রাপ্ত পরিসংখ্যান মতে, ২০২১ সালে কারাগার থেকে রিকশা-ভ্যানযোগে হাসপাতালে নেয়ার পথে ৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২২ সালে পথে মৃত্যুর সংখ্যা ৮৪ জন। ২০২৩ সালে এভাবে হাসপাতালে নেয়ার পথে ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে ১২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর ৬৪ জন বন্দী হাসপাতাল নেয়ার পথে রাস্তায়ই মারা গেছেন।

সারাদেশে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এসব কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ৮৪ হাজারেরও বেশি। বন্দী থাকা অবস্থায় অনেকেই কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আবার অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ডায়বেটিস, হার্ট, কিডনীসহ নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হন।

কারা অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, সারাদেশে বন্দীদের কারাগার থেকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য আছে ২৭টি অ্যাম্বুলেন্স। তার মধ্যে ঢাকায় ৩টি, গাজীপুরে ৪টি এবং অন্যান্য কয়েকটি জেলায় ১টি করে অ্যাম্বুলেন্স আছে। অনেক কারাগারেই অ্যাম্বুলেন্স নেই। আবার অনেক কারাগারে পুরনো নড়বড়ে অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে চালানো হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের একজন এআইজি প্রিজন (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা জানিয়ে বলেন, ‘দেশের প্রতিটি কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স দরকার। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স নেই।’

বন্দীদের দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার জন্য ২০১৯ সালে ৯৭টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। পরে তা অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে ব্যয় সংকোচনের জন্য অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ৯৭টি থেকে ৪৭টিতে কমিয়ে আনা হয়।

তবে সেই প্রস্তাবের নথি বা ফাইল গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এখনও মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে।

চিকিৎসক সংকট

দেশের কারাগারগুলোতে ১০৩টি চিকিৎসকের পদ থাকলেও মাত্র ২ জন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক আছেন। তাদের একজন মানিকগঞ্জে ও একজন রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত।

কারা অধিদপ্তর এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সাময়িক কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য জেলা হাসপাতালগুলো থেকে অস্থায়ীভাবে বা প্রেষণে চিকিৎসকের ব্যবস্থা করে।

অধিকাংশ সময় বন্দীরা রাতে অসুস্থ হলে চিকিৎসক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আর সংকটাপন্ন অবস্থায় রিকশা, ভ্যান ও পিকআপে রোগী বহন করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়। তবে তাতে অনেক সময় শেষ রক্ষা হয় না।

কারা হাসপাতাল

দেশের প্রতিটি কারাগারে একটি হাসপাতাল রয়েছে। আর ৭টি প্রিজন সেল আছে ৭টি নগরের সরকারি হাসপাতালে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১টি, বরিশালে ১টি, খুলনায় ১টি, রাজশাহীতে ১টি, সিলেটে ১টি, ময়মনসিংহে ১টি ও রংপুরে ১টি। অন্যান্য হাসপাতালে প্রিজনসেল করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

কয়েদী ও হাজতির পরিসংখ্যান

কারা অধিদপ্তরের এ বছরের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিসংখ্যানে বলছে, সারাদেশে কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা ৮৪ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮১ হাজার ৫৮১ জন। মহিলা ২ হাজার ৮৯৯ জন।

মোট হাজতি অর্থাৎ বিচারাধীন বন্দীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৪৭৮ জন। পুরুষ হাজতি ৬১ হাজার ৪৪৬ জন আর মহিলা হাজতি ২ হাজার ৩২ জন।

কয়েদী বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দী ২১ হাজার ২ জন। পুরুষ কয়েদী ২০ হাজার ১৩৫ জন। আর মহিলা কয়েদী ৮৬৭ জন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দী ৬ হাজার ৪শ’ ২৬ জন। মৃত্যুদ-ের আসামি ২ হাজার বিদেশি বন্দী ৪১৮ জন। এর মধ্যে হাজতি ২০৪ জন ও কয়েদী ৫৭ জন। বন্দী মায়ের সঙ্গে শিশু আছে ২৬৯ জন। এর মধ্যে ছেলে ১৪০ জন ও মেয়ে ১২৯ জন।

অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসক সংকট নিয়ে অপরাধবিষয়ক আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, ‘এ ধরনের মৃত্যুর জন্য নিহতের পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে।’ আর মৃত্যুর জন্য যাদের ‘গাফিলতি আছে’ তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় বলে এ আইনজীবীর মন্তব্য।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» জুলাই সনদের পথরেখায় নতুন বাংলাদেশের দিকে যেতে সক্ষম হবো: আলী রীয়াজ

» নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছে না ইইউ মিশননির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছে না ইইউ মিশন

সম্প্রতি