জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ‘আইনগত কোনো বাধা বা নিষেধাজ্ঞা নেই’ বলে দাবি করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ।
‘আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে’, আশঙ্কা শাহদীন মালিকের
হ্যাঁ-এর প্রচারে নানা উদ্যোগ
হ্যাঁ শিরোনামে ঢাকার সব বাসায় লিফলেট পৌঁছে দেবে দুই সিটি করপোরেশন
৩ কোটি ৭২ লাখ পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহককে লিফলেট পৌঁছে দেবে বিআরইবি
ভোটের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন ডিসি, ইউএনও, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা
তাদেরকেও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে বলেছে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ
এতে গণভোটে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা
ঢাকার বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে গতকাল শনিবার ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে বিভাগীয় কর্মকর্তা-প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভায়’ বক্তব্যে তিনি এ দাবি করেন।
এ প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তিনি ‘একবাক্যে’ মত পেয়েছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর ‘আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই’। যারা এ বিষয়ে বাধা আছে বলে প্রচার করছেন, তারা ‘বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন’ অথবা ‘ভিন্ন উদ্দেশে’ বিষয়টি উত্থাপন করছেন।
উপদেষ্টা মর্যাদায় থাকা আলী রীয়াজ গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়কের দায়িত্বও পেয়েছেন। রোববার, (১৮ জানুয়ারী ২০২৬) এই দপ্তরের সিনিয়র তথ্য অফিসার মাহবুবুর রহমান তুহিনের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল শনিবার বিয়ামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভার তথ্য জানানো হয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন তারা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যদি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় থাকেন তার প্রভাব গণভোটে পড়বে বলে মনে করেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
এছাড়া সাধারণত নির্বাচনের সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারের মতো ভোটগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকেন। তাদেরকেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা চালাতে বলেছে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ।
হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সমর্থন জানান। তার এই সমর্থন ‘অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে সমালোচনা চলছে। তবে এই সমালোচনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে রোববার, এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্তব্য করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।
এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবস্থান কোনোভাবেই প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থী নয়; বরং এটি ‘সরকারের দায়িত্ব ও ম্যান্ডেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’। বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়।
‘আইনি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকের মতে, নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো। অর্থাৎ নির্বাচনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে।
হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান এবং প্রচার-প্রচারণা প্রসঙ্গে তিনি তিনি একটি বিদেশি গণমাধ্যম সংস্থাকে বলেন, ‘তার অর্থ হলো সরকার একটা পক্ষ নিয়ে নিচ্ছে। সরকার যদি একটা অবস্থান নিয়ে নেয় তাহলে আমরা যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলি তা এখানে থাকছে না।’
ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতে এই নির্বাচন (গণভোট) আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনা এদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সব ব্যাংকগুলো প্রচারণা চালাবে। এরই অংশ হিসেবে ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় দুইটি করে ব্যানার টানানোর নির্দেশও দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
জুমার খুতবায় আলোচনাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন এবং পোশাক কারখানার সামনে ব্যানার প্রদর্শনের নির্দেশনাও দিয়েছে সরকার। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
ঢাকার সব বাসায়
ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি বাসায় পৌঁছে দেয়া হবে আসন্ন গণভোটে পরিবর্তনের জন্য ‘হ্যাঁ’ শিরোনামের লিফলেট। রোববার, আলী রীয়াজের সঙ্গে কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. মাহমুদুল হাসানের বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে আরও জানানো হয়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই সিটি করপোরেশনের হাইরাইজ ভবনগুলোতে ড্রপ ডাউন ব্যানার, বিলবোর্ড স্থাপন, সড়কদ্বীপ সমূহে দৃষ্টিনন্দন ফেস্টুন ও বিভিন্ন স্থাপনায় স্টিকার প্রদর্শনীর মাধ্যমে নগরবাসীকে একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
*৩ কোটি ৭২ লাখ গ্রাহককে লিফলেট*
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) তার ৩ কোটি ৭২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে আসন্ন গণভোটে পরিবর্তনের জন্য ‘হ্যাঁ’ শিরোনামের লিফলেট পৌঁছে দেবে। রোববার, বিকেলে আলী রীয়াজের সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠককালে এ তথ্য জানান বিআরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়াউল আলম।
*তারা নাগরিকও*
গতকাল শনিবার বিয়াম ফাউন্ডেশনে বক্তব্যে আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, তারা একই সঙ্গে এ দেশের নাগরিকও। তাই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে নাগরিক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিদের জনগণের সেবায় সর্বদা সচেষ্ট থাকার কর্তব্য এবং নাগরিকদের আইন মানা, শৃঙ্খলা রক্ষা ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব উল্লেখ রয়েছে। সেই দায়িত্বের আলোকে গণভোটে মানুষকে সচেতন করা ও ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করার কাজটিও নাগরিক কর্তব্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।’
মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দারও বক্তব্য রাখেন। ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও গণপূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।