ভোটের দোরগোড়ায় এসে ইসির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, অভিযোগ পক্ষপাতেরও

ফয়েজ আহমেদ তুষার

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর ২৩ দিন বাকি। ভোটের দোরগোড়ায় এসে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের পাশপাশি পক্ষপাতের অভিযোগও উঠছে। পক্ষপাতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী দুদলই। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ইসির সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছে জামায়াতের নির্বাচনী জোটসঙ্গী এনসিপি।

অভিযোগ নিয়ে জামায়াতের পর এনসিপিও যমুনায়

শুনানি শেষে চার শতাধিক প্রার্থীকে বৈধতা দিয়েছে ইসি

‘শুনানিতে নাটক হয়েছে, ইসি নিরপেক্ষতা হারিয়েছে’। নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে এনসিপি

ইসির অনুরোধে ঘেরাও কর্মসূচি স্থগিত করেছে ছাত্রদল

গণভোটে হ্যাঁ-এর প্রচারণায় অন্তর্বর্তী সরকার, জামায়াত, এনসিপি

প্রচারণায় নেই বিএনপি

ইসির গণ্ডি পেরিয়ে অভিযোগ জানাতে দলগুলো যাচ্ছে যমুনায়, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বাসায়।

মাঠ পর্যায়ে কমিশনের কর্মকর্তারা কোনো একটি দলের পক্ষ হয়ে কাজ করছে এমন অভিযোগ প্রতিনিয়ত উঠছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বেশি উঠেছে মনোনয়নপত্র বাতিল এবং আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা বহালে ইসির সিদ্ধান্তকে ঘিরে।

টানা ৯ দিনের শুনানি শেষে ৪২১ জনের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিয়েছে ইসি। এক্ষেত্রে বিএনপির অনেক প্রার্থী ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিক হলেও তাদের ছাড় দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে এনসিপি।

তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন দাবি করেছেন, আপিল শুনানিতে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা হয়নি। গতকাল রোববার শেষদিনের শুনানির পর রাতে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের জটিলতা থাকলে সে বিষয়ে ছাড় দেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কমিশন চায় সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক।

ওই সময় সিইসির পাশে থাকা নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘আমরা ঋণখেলাপি যাদেরকে ছাড় দিয়েছি, মনে কষ্ট নিয়ে দিয়েছি। শুধু আইন তাদের পারমিট করেছে বিধায়।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের মিত্র জাতীয় পার্টি (জাপা) নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছে। যদিও একাধিক ভাঙনে দলটির (জাপা) অবস্থা হ-য-ব-র-ল।

এ প্রেক্ষাপটে এবার বিএনপির প্রধান নির্বাচনী প্রতিপক্ষ জামায়াত। যদিও দল দুটি দীর্ঘদিন জোটসঙ্গী ছিল। এদিকে নানা নাটকীয়তার পর জামায়াতের নির্বাচনী জোটসঙ্গী হয়েছে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের গড়া দল এনসিপি। এ কারণে এনসিপির কেন্দ্রীয় বেশকয়েকজন নেতার পাশপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

বিএনপির অভিযোগ ইসি ‘অনেক ক্ষেত্রেই পক্ষপাতমূলক’ আচরণ করছে। কমিশনের কিছু কর্মকর্তা ‘জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে’ কাজ করছেন। গতকাল রোববার ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনকে এ অভিযোগ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে ব্রিফিংয়ে তিনি কোনো দলের নাম উল্লেখ করেননি।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) বলছে, ‘বিএনপির চাপের কাছে নতি স্বীকার করে’ ইসি ইতোমধ্যে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। তাই এই কমিশনের অধীনে এনসিপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশ করবে কিনা, সেটি পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। গতকাল রোববার রাতে ঢাকার বাংলামোটরে দলীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপির মুখপাত্র ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এ অভিযোগ তোলেন। তিনিও সরাসারি বিএনপির কথা বলেননি। তবে শেষদিনের শুনানির মাঝে সিইসির সঙ্গে বিএনপির প্রতিনিধি দলের বৈঠক এবং নির্বাচন ভবনের সামনে ছাত্রদলের ঘেরাও কর্মসূচির বিষয়টি সামনে এনেছেন।

ইসি ঘেরাও পোস্টাল ব্যালটে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষের অবস্থান প্রথম সারিতে না রেখে মাঝের দিকে থাকায় পক্ষপাতের অভিযোগসহ তিনটি ইস্যুতে সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) দ্বিতীয় দিনের মতো আগারগাঁওয়ে ইসির প্রধান কার্যালয় ঘেরাও করে ছাত্রদল। দাবি মানা না হলে ইসির প্রধান ফটক অবরোধ করার ঘোষণা দেয়া হয়।

ছাত্রদলের তিনটি ইস্যু হচ্ছেÑ ১. পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে। ২. বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে ইসি, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৩. বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ইসি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত।

পরে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজের সঙ্গে আলোচনা শেষে সন্ধ্যায় ঘেরাও কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে সাময়িকভাবে আন্দোলন স্থগিত করলাম। যদি আবারও কোনো গোষ্ঠী নির্বাচন কমিশনের ওপর অপকৌশলে চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে, তাহলে আমরা এর উপযুক্ত জবাব দেব।’

*অভিযোগ যমুনায়*

নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই- গতকাল রোববার জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে এমন অভিযোগ জানান। পরদিন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও প্রতিনিধি দল নিয়ে যমুনায় যান। তিনিও অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানকে একই অভিযোগ জানান।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার সপরিবারে যমুনায় গিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এক ঘণ্টারও বেশি সময়ের ওই সাক্ষাতের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।

দু’দিন পর জামায়াত নেতারা যমুনায় যান। তারা তাদের দলীয় প্রধান শফিকুর রহমানকে বিএনপি প্রধান তারেক রহমানের মতো নিরাপত্তা দেয়ার দাবি জানান। প্রধান উপদেষ্টাকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘একটি দলের প্রধানকে অতিরিক্ত প্রটোকল বা নিরাপত্তা দিয়ে সরকার পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে জামায়াতের আমিরকেও সমপরিমাণ প্রটোকল দিতে হবে।’ বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।

*প্রার্থিতা ফিরে পেলেন ৪১৭ জন*

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এবার মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের (মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের) বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করার সুযোগ ছিল। নির্ধারিত সময়ে মোট ৬৪৫টি আপিল ইসিতে জমা পড়ে।

টানা নয়দিনের শুনানি শেষ হয় গতকাল রোববার। প্রার্থিতা ফিরে পান মোট ৪১৭ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বৈধ হলেও আপিলে মনোনয়নপত্র বাতিল হয় ৬ জনের।

পোস্টাল ব্যালটে পক্ষপাতের অভিযোগসহ তিনটি ইস্যু নিয়ে গতকাল রোববার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইসির সামনে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। পক্ষপাত করে বা কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের পার করে দেয়ার চেষ্টা করলে ইসির বিরুদ্ধে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়ার হুঁশিয়ারি এর আগের দিন দিয়েছিল এনসিপি। এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল রোববার শুনানি শেষ করে কমিশন।

সংবিধান অনুযায়ী, কেউ দ্বৈত নাগরিক হলে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন। বাছাইয়ে বৈধ হলেও বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে ইসিতে আপিল হয়েছিল। ইসি এ ধরনের আপিলগুলোর সিদ্ধান্ত দেয় রোববার। এক্ষেত্রে ইসির মূল বিবেচ্য ছিল, সংশ্লিষ্ট প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনের আগে (২৯ ডিসেম্বরের আগে) বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করার জন্য আবেদন করেছেন কিনা, প্রয়োজনীয় ‘ফি’ জমা দিয়েছেন কিনা। এর পাশাপাশি প্রার্থীদের কাছ থেকে একটি হলফনামাও জমা নেয় ইসি। যারা এ কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন বলে প্রমাণ করতে পেরেছেন, তাদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়।

এমন বিবেচনায় গতকাল রোববার ফেনী-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম, দিনাজপুর-৫ আসনে এ কে এম কামরুজ্জামান, ঢাকা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনের মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে করা আপিল নামঞ্জুর করে ইসি। ফলে তাদের প্রার্থিতা বহাল থাকে।

সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করে ইসি। অন্যদিকে কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের বিরুদ্ধে করা আপিলের সিদ্ধান্ত গতকা্ল রোববার পর্যন্ত দেয়নি ইসি। এ বিষয়ে সোমবার সিদ্ধান্ত দেয়া হতে পারে ইসি সূত্র জানায়।

এর বাইরে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার অভিযোগে ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদ, সুনামগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহের রায়হান চৌধুরীসহ কয়েকজন প্রার্থীকে নিজ থেকে নোটিশ দিয়েছিল ইসি। শুনানি শেষে তাদের প্রার্থিতাও বহাল রাখে ইসি।

ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে একাধিক আপিল হয়েছিল। গতকাল রোববার ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও যমুনা ব্যাংক তার বিরুদ্ধে শুনানিতে অংশ নেয়। শুনানি শেষে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে ইসি।

এদিকে টাঙ্গাইল-৪ আসনে চারবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রার্থিতা ফিরে পান। তার মনোনয়ন চ্যালেঞ্জ করেন জাতীয় পার্টির নেতা লিয়াকত আলী।

কুমিল্লা-১০ আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজী নুর ই আলম সিদ্দিকীর চ্যালেঞ্জের কারণে বিএনপি প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের প্রার্থিতা বাতিল করে ইসি।

সম্প্রতি যাচাই-বাছাইয়ের সময় মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর কক্সবাজার-২ আসনের জামায়াত নেতা এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ তার প্রার্থিতা ফিরে পান। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা।

কুমিল্লা-৪ আসনে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর প্রার্থিতাও বহাল রয়েছে। তার প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর করা আপিল আবেদনটি নামঞ্জুর হয়ে যায়।

হাসনাতের আপিলের পর ইসি মঞ্জুরুল আহসানের প্রার্থিতা বাতিল করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ঋণখেলাপি এবং তথ্য গোপন করেছেন।

ইসি যশোর-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সাবিরা সুলতানার প্রার্থিতাও বহাল রাখে। পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুদ সাঈদী বিএনপি প্রার্থী আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেছিলেন। ইসি তা খারিজ করে দেয়।

ঋণখেলাপির অভিযোগে যশোর-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী টি এস আইয়ুবের আপিলও ইসি খারিজ করে দেয়। তবে একই আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তার ছেলে ফরহাদ সাজিদের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।

ঢাকা-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল হক আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান।

দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে চট্টগ্রাম-৯ জামায়াতের প্রার্থী একেএম ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করে কমিশন, কারণ তার মার্কিন নাগরিকত্ব ছিল।

জাতীয় পার্টির একাংশের নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদের প্রার্থিতা ইসি পুনর্বহাল করেনি।

কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এ এইচ এম কাইয়ুমের (হাসনাত কাইয়ুম) মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে ইসি, যদিও তার এক শতাংশ ভোটারের সই ছিল না।

আরও যারা প্রার্থিতা ফিরে পান তাদের মধ্যে রয়েছেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান (মাগুরা-১) এবং জামায়াতের তিন প্রার্থী মো. আব্দুল মমিন (চাঁদপুর-২), মো. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ (যশোর-২) ও মো. মুজিবুর রহমান আজাদী (জামালপুর-৩)।

*এক ধরনের নাটক*

রাতে বাংলামোটরে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে আসে এনসিপি। এতে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, প্রার্থিতা সংক্রান্ত আপিলের শুনানিতে ইসি প্রায় প্রত্যেক দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিকে ছাড় দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বৈধতা দিয়েছে। তিনি বলেন, শনি ও রোববার (গতকাল) আপিল শুনানির পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ইসি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক দল ও জনগণের যে আস্থা অর্জন করার কথা ছিল, সেটা হারিয়েছে।

তিনি জানান, গতকাল রোববার দুপুর থেকে ইসিতে আপিল শুনানিতে ছিলেন। তার অভিযোগ, শুনানি চলাকালে আইনি যুক্তির বাইরেও চাপ ও আবেগের ভিত্তিতে রায় দিয়েছে ইসি। পুরো বিষয়টা এক ধরনের নাটকের মতো মঞ্চায়িত হয়েছে। আপিল শুনানির শেষদিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে ইসির সামনে ছাত্রদলের দু-তিন হাজার নেতাকর্মী এক ধরনের মব তৈরি করে রেখেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে তারা এক ধরনের চাপ তৈরি করে রেখেছিলেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, শুনানির একটা পর্যায় শেষ হওয়ার পর এবং রায় দেয়ার আগমুহূর্তে দেড় ঘণ্টা ধরে যে ঘটনা ঘটেছে, তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। সে সময় ইসি বিএনপির মহাসচিবসহ দলটির পাঁচ সদস্যের একটা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করলেন। পরে তারা এসে রায় দিলেন। বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে থাকা আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজলও বিএনপির প্রতিনিধি দলে ছিলেন। ওই বৈঠকের পর যে রায় দেয়া হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণরূপে একপক্ষীয়।

*বৈধতা লঙ্ঘন*

নির্বাচন কমিশন অনেক বিতর্কিত প্রার্থীকে সংবিধান, আরপিও এবং প্রচলিত আরও কয়েকটি আইন লঙ্ঘন করে বৈধতা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘যদি এরকমভাবে নির্বাচনের কার্যক্রম সামনের দিকে যেতে থাকে, তাহলে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি যে এই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন বাস্তবায়ন করতে পারবে না।’

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আজকে স্পষ্টভাবে বলছি, সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এই নির্বাচন কমিশনের ওপর দল হিসেবে আমরা কোনো ধরনের কনফিডেন্স আজকের পরে আর পাচ্ছি না। এই পরিস্থিতিতে এসে আমরা এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব কিনা এটাও পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে বলে মনে করছি।’

*গণভোটের প্রচারণা*

গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে থাকার আহ্বান আগেই জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণায় যুক্ত করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এতে আইনগত কোনো বাধা নেই। তবে এটি ‘অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে সমালোচনা চলছে। তবে এই সমালোচনা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।

জামায়াত এবং এনসিপি জানিয়েছে, তারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে আছে। এজন্য প্রচারণাও চালাচ্ছে দল দুটি। গণভোটে যারা ‘হ্যাঁ’-এর বিপক্ষে যাবে তাদের সংসদ নির্বাচনে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

গণভোট নিয়ে সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘গণভোটের প্রচারণার দায়িত্ব বিএনপির নয়। জনগণের দায়িত্ব ভোট দেয়া, তারা হ্যাঁ বা না যেটা ঠিক করবেন সেটাই হবে।’

*প্রত্যাহারের শেষ দিন আজ*

নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আজ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার শেষ দিন। এরপর জানা যাবে, এই নির্বাচনে মোট কতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন। আগামীকাল প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে পৃথক ব্যালট পেপারে সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» অর্থ আত্মসাৎ: এস আলম ও পি কে হালদারসহ ১৩ জনের বিচার শুরু

» ডিগ্রি নয়, অর্জিত জ্ঞান দেশের কল্যাণে কাজে লাগানোই গুরুত্বপূর্ণ: শিক্ষা উপদেষ্টা

» নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বিক্রি করে শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ হচ্ছে

» ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

» আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় চিন্ময়সহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন

» সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ৬৪৫ ঘটনায় ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ নেই ৫৭৪টিতে: প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর

» গণভোট দেশের স্বার্থে, দলের নয়: আসিফ নজরুল

সম্প্রতি