চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় ইসকনের সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। সোমবার, (১৯ জানুয়ারী ২০২৬) সকালে হাজতে থাকা চিন্ময়সহ ২৩ জনের উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাহিদুল হক এসব আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। একইসঙ্গে আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে সাক্ষীদের পর্যায়ক্রমে হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণেরও আদেশ দিয়েছেন।
এরমধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলাটির বিচার কার্যক্রম শুরু হল। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আকস্মিকভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের আন্দোলন শুরু করে লাইমলাইটে আসা চিন্ময় প্রথম কোনো মামলার বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায়। ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি খুন হন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৭,১৪৮, ১৪৯, ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় আনা অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে আদালত।
বাদীপক্ষের আইনজীবী কামরুল ইসলাম সাজ্জাদ জানান, আগামী ২ ফেব্রুয়ারি মামলার বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের সময় নির্ধারণ করেছে আদালত। আসামিদের অব্যাহতির আবেদন শুনানি শেষে নামঞ্জুর করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর এ আদেশ আদালত দিয়েছে।
এর আগে, সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চিন্ময়সহ ২৩ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি মিলিয়ে শতাধিক সদস্য আদালত প্রাঙ্গণে মোতায়েন করা হয়।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের হওয়া রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর রাতে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইসকনের বহিষ্কৃত সংগঠক ও সনাতনী জাগরণ জোট নামে একটি সংগঠনের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরদিন ২৬ নভেম্বর তাকে চট্টগ্রাম আদালতে হাজির করা হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কারাগারে পাঠানোর নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টি করে চিন্ময়ের অনুসারীরা। তারা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাকে বহনকারী প্রিজনভ্যান আদালত এলাকায় আটকে রাখে। একপর্যায়ে পুলিশ, বিজিবি লাঠিপেটা ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখনই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরবর্তীতে নগরীর লালদিঘীর পাড় থেকে কোতোয়ালি এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে আদালত প্রাঙ্গনের অদূরে নগরীর বান্ডেল সেবক কলোনির সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করা হয়। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন নগরীর কোতোয়ালি থানায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। আসামিরা সবাই চিন্ময়ের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে জামাল উদ্দিনের করা মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীর নাম ছিল না। ২০২৫ সালের ৫ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তদন্তে সম্পৃক্ততা পাবার তথ্য উল্লেখ করে চিন্ময়কে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন করেন। আদালত গেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন।
এরপর ২০২৫ সালের ১ জুলাই চিন্ময়কে প্রধান আসামি করে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। তবে অভিযোগপত্র গ্রহণের শুনানিতে আদালত মামলা থেকে একজন আসামির অব্যাহতির জন্য তদন্ত কর্মকর্তার সুপারিশ নাকচ করেন। এর ফলে ওই মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়াল ৩৯ জনে।
চিন্ময় বাদে বাকি আসামিরা হলেন- চন্দন দাস মেথর, রিপন দাস, রাজীব ভট্টাচার্য্য, শুভ কান্তি দাস, আমান দাস, বুঞ্জা, রনব, বিধান, বিকাশ, রমিত প্রকাশ দাস, রুমিত দাস, নয়ন দাস, ওমকার দাস, বিশাল, লালা দাস, সামীর, সোহেল দাশ রানা, শিব কুমার, বিগলাল, পরাশ, গণেশ, ওম দাস, পপি, অজয়, দেবীচরণ, দেব, জয়, লালা মেথর, দুর্লভ দাস, সুমিত দাস, সনু দাস, সকু দাস, ভাজন, আশিক, শাহিত, শিবা দাস, দ্বীপ দাস ও সুকান্ত দত্ত। মামলার ৩৯ জন আসামির মধ্যে ১৬ জন এখনও পলাতক আছেন। তাদের বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা আছে।
অভিযোগপত্রে আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতাকারী ও উসকানিদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, অন্য আসামিরা তার নির্দেশ ও প্ররোচনায় সংঘবদ্ধভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে।