গাইবান্ধা জেলায় স্যানিটেশন ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কারণে প্রতিদিন অন্তত ১ লাখ ১১ হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে উন্মুক্ত স্থানে অথবা ঝোপঝাড়ে মলত্যাগ করছেন। জেলার সাতটি উপজেলার অন্তত ২৭ হাজার পরিবারের নিজস্ব কোনো ল্যাটট্রিন বা টয়লেট সুবিধা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্যে উঠে এসেছে এই চিত্র। পরিসংখ্যান ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলায় মোট পরিবারের সংখ্যা ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৩২০টি। এর মধ্যে প্রায় ৩.৭৪ শতাংশ অর্থাৎ ২৫ হাজর ৮শ পরিবারে কোনো ধরনের টয়লেট সুবিধা নেই। এই হিসেবে জেলার ১ লাখ ৫ হাজার মানুষ প্রতিদিন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উন্মুক্ত স্থানে প্রাকৃতিক কাজ সারছেন।
আবার যাদের টয়লেট আছে, তাদের মধ্যেও ১২ শতাংশ পরিবারের টয়লেট ব্যবস্থা অনিরাপদ। এছাড়া জেলার ৩২ শতাংশ পরিবার অন্য পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে টয়লেট ব্যবহার করে। স্যানিটেশন সুবিধায় উপজেলাভিত্তিক বৈষম্যও প্রকট পলাশবাড়ি উপজেলায় সর্বোচ্চ ৬১.৬৮ শতাংশ পরিবার নিরাপদ টয়লেট ব্যবহার করলেও, ফুলছড়ি উপজেলায় এই হার মাত্র ২৯.৮০ শতাংশ। চরের মানুষের দুর্ভোগ ও কারণ সরেজমিনে দেখা যায়, মূলত দারিদ্র্য এবং বারবার নদীভাঙনের কারণে বাড়িঘর টানাটানিতে চরাঞ্চলের মানুষ স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছেন না। সাঘাটা উপজেলার কালুরপাড়া হালিমা বেগম বলেন, ‘এক বছরে তিনবার নদীভাঙনে ঘর সরাতে পারলেও টয়লেটের রিং-স্লাব সরাতে পারিনি। তাই বাধ্য হয়ে কাশবনে গিয়ে কাজ সারতে হয়।’ একই গ্রামের মানিকজান বেওয়া বলেন, ‘ভিক্ষা করে সংসার চালাই, ল্যাটট্রিন বসানোর সামর্থ্য নেই। বাধ্য হয়ে কোনো কোনো সময়ে অন্যের বাড়িতে বা খোলা স্থানে যেতে হয়। তবে নারীদের জন্য এটি বেশ সমস্যার।’ ফুলছড়ি উপজেলার ফজলুপুর চরের শফিকুল ইসলাম জানান, পেটের ভাত জোগানো যেখানে কঠিন এবং প্রতি বছর বন্যয় ঘরবাড়ি ভাঙাগড়ার মধ্যে থাকতে হয়, সেখানে ল্যাটট্রিন নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ তাদের থাকে না। সাঘাটা হলদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান. চরাঞ্চলের প্রধান সমস্যা বন্যা ও নদীভাঙন। ইউনিয়ন পরিষদ ও এনজিও থেকে ল্যাটট্রিন দেওয়া হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে তা টেকে না। এ কারণেই সাঘাটা ও ফুলছড়ির চরাঞ্চলে স্যানিটেশন ব্যবস্থা সবচেয়ে নি¤œমানের। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম বলেন, ‘চরাঞ্চলের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে এমন ল্যাটট্রিন স্থাপন করতে হবে, যা ভাঙনের সময় সহজে সরিয়ে নেয়া যায়। শুধু বড় বন্যার দিকে তাকিয়ে না থেকে বন্যা পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ল্যাটট্রিন মেরামত ও সংস্কারে জোর দিতে হবে। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. রফিকুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাটট্রিন ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে রোগবালাই কমবে না। অস্বাস্থ্যকর পায়খানা ব্যবহারের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রোগব্যাধির সংখ্যা বাড়ছে।’
গাইবান্ধা জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার চারটি উপজেলার প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ নদী ও চরাঞ্চলে বাস করে। বন্যায় ল্যাটট্রিন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই তা মেরামত করতে পারেন না।
তবে চরাঞ্চল ছাড়াও মেইনল্যান্ডের দরিদ্র পরিবারেও স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাটট্রিন নেই এমন চিত্র অনেক। এজন্য স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাটট্রিন নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে চলমান রাখার অনুরোধ করেন ভুক্তভোগীরা।