রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের একটি আবাসন প্রকল্পে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান মুকুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রাজধানী ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ওই আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি নিয়ে আদালতের দেয়া স্থিতিবস্থা ‘অমান্য করে অবৈধভাবে’ ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্প এবং নকশা ও নির্মাণ অনুমোদন নেয়ার অভিযোগের পাশাপাশি মামলায় ‘অবৈধভাবে’ সরকারি খাস জমি ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার, (২২ জানুয়ারী ২০২৬) দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের মামলা করার তথ্য দেন। তিনি বলেন, সংস্থার উপ-সহকারী পরিচালক আফিয়া খাতুন বাদী হয়ে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ মামলাটি দায়ের করেছেন।
এতে চেয়ারম্যান ছাড়াও রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ৪৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ‘রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন না করে রূপায়ণের আবেদনে ব্যবহৃত রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই না করে এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি সরেজমিনে সার্ভে-পরিদর্শন না করে ‘অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে পরস্পর যোগসাজস, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে’ ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, বিশেষ প্রকল্পের ছাড়পত্র এবং নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনে সহযোগিতা করেছেন।’
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক বলেছে, রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের সঙ্গে অভিযোগকারী মোস্তফা জামানের ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল ২ দশমিক ৫১ একর জমির ওপর বায়না ও সমঝোতা চুক্তি হয় (দলিল নং ৩৯৩৫)। পরে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করেই রূপায়ণের পক্ষে ভূমি বিভাগের প্রধান সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ঘোষণামূলক মামলা করেন; যার ওপর আদালতের স্থিতিবস্থা আদেশ ছিল এবং সেটি ‘অদ্যাবধি বহাল রয়েছে’।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় রূপায়ণের পক্ষে বিভিন্ন ছাড়পত্রের আবেদন করা হলে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী জমির দলিল, খতিয়ান, মালিকানা স্বত্ব, ভূমি উন্নয়ন করসহ অন্যান্য রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই ছাড়াই সেগুলোর অনুমোদন দেন।
ভূমি মালিকের সঙ্গে বিবাদের বিষয়ে মামলায় বলা হয়, উভয়পক্ষের সম্মতিতে আরবিট্রেটর নিয়োগের পর ২০১৮ সালে আরবিট্রেটর অভিযোগকারী পক্ষের অনুকূলে রায় দেন।
প্রতি কাঠা ১ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা হিসেবে মোট ১৯২ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়। পরে সেই রায় বাতিল বা বাস্তবায়ন নিয়ে পৃথক মামলা হয়। আর আদালতের আদেশ অমান্য করে নির্মাণ কাজ চলমান থাকায় ২০১৯ সালে ভায়োলেশন মামলা (১২২/১৯) দায়ের হয়, যা ‘অদ্যাবধি বিচারাধীন’।
রেকর্ড পর্যালোচনার তথ্যের ভিত্তিতে দুদক এজাহারে অভিযোগ করেছে, রূপায়ণ পাঁচটি ধাপে ৪১ দশমিক ৫৪৮ একর জমির ওপর পরিকল্পনার পাস করালেও রাজউকে কাগজপত্র জমা দিয়েছে ১৬ দশমিক ৩২ একর জমির। বাকি ২৫ দশমিক ২২৮ একর জমির কাগজপত্র রাজউক থেকে সরবরাহ করতে পারেনি। কিছু সিএস দাগের তথ্যও রাজউকের সরবরাহ করা কাগজ পাওয়া যায়নি।
‘কিছু জমি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত এবং কিছু জমি কোর্টস অব ওয়ার্ডসের (ভাওয়াল রাজ এস্টেট) লিপিবদ্ধ সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও মালিকানা নিরঙ্কুশ না থাকায় বিশেষ প্রকল্প ছাড়পত্র বা নকশা অনুমোদনের সুযোগ ছিল না’
এক্ষেত্রে ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০০৮ এর বিভিন্ন বিধি (বিশেষ প্রকল্প বাতিল, সত্যায়িত দলিল দাখিল, মালিকানা নিরঙ্কুশ থাকা ইত্যাদি) তুলে ধরে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
এজাহারে ঘটনার সময় বলা হয়েছে, ২০১১-২০২২ পর্যন্ত। স্থান হিসেবে রাজউক ও রূপায়ন সিটি, উত্তরা, ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গার কথা বলা হয়েছে।
মামলায় রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুকুলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার সঙ্গে রূপায়ণের পরিচালক রোকেয়া বেগম নাসিমা, মাহির আলী খান রাতুল, ফরিদা বেগম ও আলী আকবর খান রতনকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ভূমি কর্মকর্তা সাজ্জাদ হুসাইনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রাজউকের তরফে সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে সংস্থার উপ-নগর পরিকল্পবিদ কামরুল হাসান সোহাগ, রেখাকার আলমগীর কবীর, উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম, নকশাকার এমদাদুল হক মুনসী, ফটোগ্রাফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট এমরান হোসেন সুমন এবং ড্রাফটসম্যান নাজমুল হক।
রাজউকের অন্য আসামিরা হলেন- সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটি-২, অঞ্চল-ক এর চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান (এনডিসি); সদস্য (উন্নয়ন) ও বিসি কমিটি-২, অঞ্চল-খ এর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান; সদস্য (পরিকল্পনা) ও বিসি কমিটি-২ এর চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল মান্নান; বিসি কমিটির সদস্য নির্বাহী প্রকৌশলী মোবারক হোসেন, গণপূর্ত প্রকল্প বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও সদস্য আব্দুল্লাহ মো. জুবাইর; পরিচালক (আইন) রোকন উদদৌলা, প্রধান প্রকৌশলী এমদাদুল ইসলাম, পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১) গোলাম মোস্তফা ও মুহাম্মদ মোশরফ হোসেন, পরিচালক (জোন-২) আনন্দ কুমার বিশ্বাস এবং অথরাইজড অফিসার মিজানুর রহমান, পারভেজ খাদেম ও আশরাফুল ইসলাম আহমেদ।
এছাড়া আইন ও নকশা শাখার সঙ্গে যুক্ত মাহফুজুল করিম, আইনজীবী ও রাজউকের সহকারী আইন পরামর্শক মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, সহকারী স্থপতি তাওফিকুজ্জামান, সহকারী অথরাইজড অফিসার জান্নাতুল নাইমা, তামান্না বিনতে রহমান, এস এম এহসানুল ইমাম ও খায়রুজ্জামানকেও আসামি করা হয়েছে।
আরও আসামি হয়েছেÑ প্রধান ইমারত পরিদর্শক আব্দুস সালাম, আব্দুল গনি ও বিল্লাল হোসেন, পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম, ইমারত পরিদর্শক মাসুদুর রহমান, প্রধান ইমারত পরিদর্শক আবু শামস রকিব উদ্দিন আহমেদ, সহকারী পরিদর্শক জ্ঞানময় চাকমা, এস্টেট পরিদর্শক তৌফিকুল ইসলাম ও জরিপকার আলী আজগরকে।