ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন মুখর। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ প্রবেশ করেছে এক নতুন অধ্যায়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি, জামায়াত ইসলামী ও এনসিপিসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল। তবে এবারের নির্বাচনে চিরচেনা পোস্টারসর্বস্ব প্রচারণার বদলে ডিজিটাল মাধ্যমই হয়ে উঠেছে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র। পাশাপাশি প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
রাস্তাঘাট বা দেয়ালে পোস্টারের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই চলছে মূল প্রচারণা
প্রচারণার উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেও সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে, প্রথম দিনেই অন্তত ২৫ জন আহত
নির্বাচন বানচাল কারার চেষ্টা চলছে, সরকারকে অবশ্যই ভয়শূন্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে: মির্জা ফখরুল
নির্বাচন কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব ও পরিবেশ রাক্ষার স্বার্থে এবারের নির্বাচনে পোস্টার না ছাপানোর পরামর্শ মানা হচ্ছে, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিরল। ফলে রাস্তাঘাট বা দেয়ালে পোস্টারের বদলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, টিকটক, ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামেই চলছে মূল প্রচারণা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া তরুণ প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’ ভোটারদের লক্ষ্য করে গান, ছোট ভিডিও ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট তৈরি করছে দলগুলো। আগামী দিনগুলোতে প্রচার-প্রচারণা আরও তীব্র হওয়ার আভাস মিলছে, যেখানে উন্নয়ন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্র পরিচালনার ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে চলবে তুমুল প্রতিযোগিতা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে বিএনপি তাদের অনলাইন প্রচারণায় বেশ সক্রিয়। দলটি ‘ম্যাচ মাই পলিসি’ ওয়েবসাইট চালু করেছে এবং গান ও গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নীতিনির্ভর বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। একইভাবে জামায়াত ও নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ভিন্নধর্মী ডিজিটাল কৌশলে তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।
প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় কমানো এবং পরিবেশ রক্ষায় পোস্টারের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে পোস্টার না থাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। তরুণরা একে স্বাগত জানালেও স্মার্টফোনহীন প্রবীণ ভোটাররা প্রার্থীদের চিনতে সমস্যায় পড়ছেন। গাজীপুরের গাছা থানার খাইলকুরের বয়োজ্যেষ্ঠ বাসিন্দা রোকেয়া আক্তারের মতো ছাড়াও অনেকের মতে, পোস্টার না থাকায় এলাকায় কে প্রার্থী, তা বোঝা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
নির্বাচনী মাঠের প্রধান দলগুলো ভোটারদের মন জয়ে নানান প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিলেট থেকে দলটির প্রচারণা শুরু করে। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারনায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান তুলে ধরেছেন তিনি। তিনি ক্ষমতায় গেলে ৪ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের ‘কৃষি কার্ড’ এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ লবণ চাষিদের স্বার্থ রক্ষা ও স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটও অনলাইনে সক্রিয়। এনসিপি অনলাইন প্রচারণায় নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ভিন্ন কৌশলে। তাদের কনটেন্টে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য ব্যবহার করে তরুণ ভোটারের সঙ্গে আবেগী সংযোগ তৈরির চেষ্টা চালাতে দেখা যাচ্ছে। তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও কবর জিয়ারতের মতো ব্যতিক্রমী কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেছে। তাদের অঙ্গীকারের মধ্যে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ ও তরুণদের নেতৃত্বে নতুন রাজনীতি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঢাকা ও উত্তরবঙ্গে গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
প্রচারণার উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। প্রচারের প্রথম দিনেই অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী, লক্ষ্মীপুরে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ৭ জন এবং মুন্সীগঞ্জে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জন আহত হন। সিরাজগঞ্জ ও নাটোরে জামায়াতের নারী কর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে বিএনপির বিরুদ্ধে, যদিও বিএনপি তা অস্বীকার করেছে। এছাড়া কুমিল্লার হোমনা-তিতাসে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে ১২ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে কেরানীগঞ্জে বিএনপি নেতা হাসান মোল্লাকে গুলি করে গুরুতর আহত করা হয়। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করতে গুপ্ত হামলা চালানো হচ্ছে এবং সরকারকে অবশ্যই ভয়শূন্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ২৯৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১,৯৮১ জন প্রার্থী। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত ইসলামী, এনসিপিসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এরমধ্যে বিএনপির ২৮৮ জন, জামায়াতের ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৩ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৪৯ জন। এছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী সংখ্যা ১৯২, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩২ এবং এবি পার্টির ৩০ জন। দলীয় কার্যক্রম স্থগিত থাকা আওয়ামী লীগসহ সমমনা ৯টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
তফসিল অনুযায়ী আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারবেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করাই তাদের অগ্রাধিকার।
ডিজিটাল প্রচারণার আধুনিকতা এবং মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক উত্তাপ উভয়ের সংমিশ্রণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোটাররা এখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি তাদের চূড়ান্ত রায় দেয়ার অপেক্ষায়।