জুলাই আন্দোলনের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
রায়ে ক্ষুব্ধ নিহত আনাসের মা সানজিদা খান, প্রশ্ন রায়ের যৌক্তিকতা নিয়ে
পুলিশের পাঁচ সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে দেয়া সাজা ন্যায়সঙ্গত হয়নি বলে দাবি চিফ প্রসিকিউটরের, করবেন সাজা বাড়ানোর আপিল
সোমবার, (২৬ জানুয়ারী ২০২৬) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার রায় পড়ে শোনান। রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল এই তিন আসামির সম্পদ জব্দের আদেশও দেয়।
তবে রায়ে ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের এবং শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। আর সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদ- দেয়া হয়েছে রায়ে। মামলার আসামিদের মধ্যে চারজন পলাতক। তারা হলেন হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল ও ইমরুল। গ্রেপ্তার আছেন আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল।
বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজ থেকে এই রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
এই মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড হলেও অন্য তিন কর্মকর্তার কারাদণ্ডের রায়ে ক্ষুব্ধ নিহত শাহারিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান। তিনি এই কর্মকর্তাদের ৩ বছরের সাজার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘সন্তানের যে খুনি, তার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও ৩ বছরের যদি কারাদণ্ড দেয়া হয়, তা কি আসলেই যৌক্তিক কোনো রায় হয়েছে বলে আপনারা মনে করেন? আমি তা মনে করি না। আমি আমার সন্তান হারাইছি। সব প্রমাণ দেয়ার পরও যদি তিন বছরের সাজা হয় তাহলে কি সঠিক বিচার হয়েছে ?’
এদিকে রায় ঘোষণার পর নিহত আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা কি কোনো সাজা হলো?’
অন্যদিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া পুলিশের পাঁচ সদস্যের সাজা ন্যায়সঙ্গত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এই পাঁচ আসামির সাজা বাড়ানোর জন্য আপিল করবেন বলেও জানান তিনি।
রায়ের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে তরতাজা তরুণেরা জীবন দিয়েছেন। যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছে, তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সাজা অল্প হওয়াটা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।’
তবে রায়ে তিন কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা যথার্থ হয়েছে বলে মনে করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে যখন তাদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, ব্যাপক মাত্রায় ও পদ্ধতিগত আক্রমণ প্রমাণিত হয়েছে, এই আসামিরা প্রকাশ্যে গুলি করেছিল, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এরপর তাদের যে সাজা দেয়া হয়েছে, তারা মনে করেন, সেটা ন্যায়সঙ্গত হয়নি। যদিও আদালতের আদেশ শিরোধার্য, তাদের মানতে হবে। কম সাজা যেটা দেয়া হয়েছে, সেই অংশের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তারা আপিল করবেন। যদিও পুরোপুরি রায় পাওয়ার পর আরও পর্যালোচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।’
জুলাই আন্দোলনের সময় ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে নেমেছিল পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আনাস। ওই দিন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগে চানখাঁরপুলে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। তাতে ১৬ বছর বয়সী আনাসসহ ছয়জন নিহত হন। অন্যরা হলেন শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ওই সময়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চানখাঁরপুল হত্যাকাণ্ডের মামলাটির রায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় রায় হলো। গত বছরের ১৭ নভেম্বর দেয়া প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে রাজসাক্ষী হওয়ায় অন্য আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে দেয়া হয় পাঁচ বছরের সাজা।
চানখাঁরপুলের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটিই ছিল প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল। একই বছরের ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিনই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ১৪ জুলাই ৮ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। একই বছরের ১১ আগস্ট এই মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। একই দিন চানখাঁরপুলে শহীদ শিক্ষার্থী শাহারিয়ার খান আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে এদিন এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়ছিল।
এ মামলায় সাক্ষ্য দেন সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। প্রসিকিউশন এই মামলায় ২৬ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। আসামিপক্ষও এ মামলায় সাক্ষী উপস্থাপন করে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হয়। এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় ২৪ ডিসেম্বর। গত ২০ জানুয়ারি এই মামলার রায় ঘোষণা করার কথা ছিল। তবে সেদিন রায় ঘোষণা করা হয়নি। রায় ঘোষণার জন্য সেদিন নতুন তারিখ ২৬ জানুয়ারি (সোমবার) নির্ধারণ করা হয়। সে অনুযায়ী, সোমবার রায় ঘোষণা করা হলো।