image

নীতি সংলাপে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বললেন, জাতীয় স্বার্থে একটি কার্যকর ও জনমুখী কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন

কুটনৈতিক বার্তা পরিবেশক

রাজধানীতে “বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক সম্পর্ক” শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে একটি কার্যকর ও জনমুখী কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে অভিমত দিয়েছেন। তারা বলেন, শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই জনগণের মধ্যে দৃঢ় জনভিত্তি তৈরি করা অতাবশ্যক।

আজ মঙ্গলবার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) এ সংলাপের আয়োজন করে। সংলাপে কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির বর্তমান বাস্তবতা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অংশীদারিত্বের প্রভাব, এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে বৈদেশিক নীতি - ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান আমেনা মহসিন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মহসিন আলী খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী, কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, সাবেক সংসদ সদস্য ও জনতা পার্টি বাংলাদেশ-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মিলন; খেলাফত মজলিস-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, সাবেক রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন, অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, এনসিপি’র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন প্রমুখ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’র সভাপতি জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জিল্লুর রহমান বলেন, দেশে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন হলেও বৈদেশিক নীতি নিয়ে আলাদা কোনো কমিশন হয়নি এবং এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগও দেখা যায়নি। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে। রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকলেও এর স্থায়ী সমাধানে বা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারেও পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একটি মাল্টি-পোলার কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে সব প্রধান শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক দরকষাকষি বা নেগোসিয়েশনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পাকিস্তান চীন থেকে অস্ত্র ক্রয় করলেও যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ বা বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েনি, যা তাদের দক্ষ কূটনীতিরই ফল।

তিনি বলেন, সরকার যদি জনভিত্তির ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে যে কোনো সরকারই কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত ও কার্যকর অবস্থান নিতে সক্ষম হবে।

আমেনা মহসিন বলেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাজনীতিকীকরণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে এবং ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাও একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরবর্তী সরকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

আতাউর রহমান ঢালী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতায় রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে কূটনীতির গুরুত্ব বেড়েছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, তিন দিক থেকে ভারতের সীমান্তঘেরা অবস্থান, অভিন্ন নদী ও পরিবেশগত নির্ভরতা এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তিনি সীমান্ত বিরোধ, অবৈধ বাণিজ্য ও অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, ভারতের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও সমুদ্রভিত্তিক যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের কারণে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের রপ্তানির সিংহভাগ এসব বাজারনির্ভর।

রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, তাঁর দলসহ বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো ইতিমধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যেখানে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ইশতেহারের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা এবং জনগণ ও দেশের স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন। পাশাপাশি উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি, বরং দুই প্রধান দলই প্রায় একই ধরনের পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের দায়িত্ব নির্বাচিত সাংসদ ও প্রতিনিধিদের হলেও বাস্তবে আমলাদের মধ্যে এক ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার কারণে তাদের প্রণীত নীতির বাইরে যাওয়া সম্ভব হয় না।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

সম্প্রতি