ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের খবর এলেও বিগত অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটের মাঠের পরিবেশ ‘চমৎকার’ আছে বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
ভোটের মাঠের ‘পরিবেশ চমৎকার’, বাকযুদ্ধ ‘ইতিবাচক’: নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল
সভা-সমাবেশে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহারকে ঘিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য-বিবৃতিকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
আনোয়ারুল ইসলাম বলছেন, ‘নির্বাচন মানেই দল, প্রার্থীদের এজেন্ডা, ইশতেহার নিয়ে কথা হবে। বক্তৃতায়-বিবৃতিতে একজন আরেকজনের পজিটিভ-নেগেটিভ দিক তুলে ধরবেন, এর মধ্য থেকে জনগণ বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে যে কাকে ভোট দেবে।’
মঙ্গলবার, (২৭ জানুয়ারী ২০২৬) ঢাকার আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে সারাদেশে প্রচারে ব্যস্ত প্রায় দুই হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ইতোমধ্যে অনেক জেলায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল বলেন, ‘বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা যা খবর পাচ্ছি এবং বাস্তবে আমরা মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন করে যেটুকু দেখতে পাচ্ছি, সেদিক থেকে নির্বাচন কমিশন মনে করে অতীতের অনেক নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে মাঠের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার।’
কিন্তু ইতোমধ্যে কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে, অনেক প্রার্থী ও দলের পক্ষ থেকে ইসিতে অভিযোগ আসছে। অনেকে ভোটের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। এসব বিষয়ে সাংবাদিকরা আনোয়ারুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
জবাবে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আপনাদের দিক থেকে প্রশ্ন এসেছে যে অনেকেই এ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করছে। নির্বাচন কমিশন কোনো শঙ্কা প্রকাশ করছে না। পাশাপাশি প্রতিনিয়তই আমাদের রাজনৈতিক নেতারা আমাদের কাছে আসছে। উনাদের পরামর্শ, অবজারভেশন, পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিষয়গুলো আসছে, তাৎক্ষণিকভাবে কমিশন তা রিটার্নিং অফিসারদের নজরে আনছে বলে তার ভাষ্য। আনোয়ারুল বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাতে এসব ঘটনায় দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয় সেজন্য কমিশনও ‘ত্বরিৎ ব্যবস্থা’ নিচ্ছে।
কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘কমিশন বলতে রিটার্নিং অফিসার কমিশনেরই লোক এবং একটা আসনের জন্য রিটার্নিং অফিসারই সেখানে নির্বাচন কমিশন। তাকে সবধরনের ক্ষমতা দেয়া আছে।’ তিনি বলেন, ইসির কাছে কোনো অভিযোগ এলেও প্রাথমিক পর্যায়ে রিটার্নিং অফিসার, মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমান আদালত এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি ও বিচারক কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো আমলে নিচ্ছে। প্রতিদিনই তারা মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করছে।
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘প্রতিদিনই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি যে, মিনিমাম ৫০-৬০টি কেস রুজু হচ্ছে; কোথাও জরিমানা হচ্ছে; কোথাও শোকজ হচ্ছে। মানে কার্যক্রম আপনার জোরেশোরে চলছে।’
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে এ পর্যন্ত ১২৮টি নির্বাচনী এলাকায় ১৪৪টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ৯৪টি মামলা করা হয়েছে।
গণভোট, ইসির অবস্থান
আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘গণভোটের বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে গণভোটের জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। নির্বাচনী কাজের দায়িত্বে যারা থাকবেন, তারা আইনগতভাবে কোনো পক্ষে কাজ করবেন না। রিটার্নিং অফিসার, অ্যাসিস্টেন্ট রিটার্নিং অফিসার এবং অন্যান্য যারা নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন, তারা গণভোটের প্রচার করবেন, বাট পক্ষে-বিপক্ষে যাবেন না।’
সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার প্রচার চালাচ্ছেন। এটা কতটা আইনসংগত জানতে চাইলে এ নির্বাচন কমিশনার বলেন, আইনসংগত কিনা সেই ব্যাখ্যা দেবেন যারা আইনবিদ, তারা।
আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা একটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আমরা কারও কাছে দায়বদ্ধ নই। আমরা আইনের কাছে থাকবো। আরও স্পষ্ট করে বলি, সংবিধান এবং আইনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।’ তিনি বলেন, ‘রিটার্নিং অফিসার যখনই হয়েছে, তখনই সে কোনো পক্ষের লোক না। কোনো রিটার্নিং অফিসার, কোনো অ্যাসিস্টেন্ট রিটার্নিং অফিসার কোনো পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন না।’
আস্থার বহিঃপ্রকাশ
জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে অভিযোগ করছে। দল দুটি বলছে, তাদের প্রার্থীদের ওপর ‘হামলা’ হচ্ছে, নারী ভোটারদের ‘হয়রানি’ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এই দুটি দলের যে অভিযোগগুলো ছিল, প্রত্যেকটা অভিযোগই আমরা খুব মনোযোগের সঙ্গে শুনেছি এবং প্রত্যেকটা অভিযোগের সমাধানের জন্য আমরা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।’
‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকার অভিযোগও দলগুলো করেছে। সে বিষয়ে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কোনো জায়গায় নেই, কেন নেই সেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো যেগুলো দিয়েছেন, প্রত্যেকটাই আমরা কনসার্ন রিটার্নিং অফিসার এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে পাঠিয়েছি। তারা আইন অনুযায়ী সেগুলোর ব্যবস্থা নেবেন।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আস্থা-অনাস্থা হচ্ছে জনগণের বিষয়। আমরা তো মনে করি যে, শতভাগ আস্থার সঙ্গে জনগণ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিচ্ছে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশে মাঠে-ঘাটে নির্বাচনী প্রচার চলছে। এগুলো তো আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা রয়েছে কিনা সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আশঙ্কা থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন মনে করে কোনো আশঙ্কাই সঠিক হবে না। একটা সুন্দর, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হওয়ার যত কার্যক্রম এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন করতে পেরেছে, ইনশাআল্লাহ আগামী ১২ তারিখে আপনারা সবাই দেখবেন, জাতি দেখবে, বিশ্ব দেখবে, যে একটা সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’
‘জনগণ বিচার করে ভোট দেবে’
দলগুলো পাল্টাপাল্টি কথা বলছে- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘নির্বাচন মানেই তো তাদের এজেন্ডা। তাদের ইশতেহার নিয়ে কথা বলবে। পক্ষ-প্রতিপক্ষ সেটাকে ওভারকাম করার চেষ্টা করবে বক্তৃতায়-বিবৃতিতে, একজন আরেকজনের পজিটিভ-নেগেটিভ দিক তুলে ধরবেন, কিছু আক্রমণাত্মক কথা হবে। এর মধ্য থেকে জনগণ বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে যে কাকে ভোট দেবে।’
ভোটারদের কেন্দ্রে এসে অধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘আপনার যাকে খুশি তাকে ভোট দিন। নিশ্চয়তা শতভাগ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছে। এবং এটার জন্য সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী তারপরে নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ বাহিনী, আনসার বাহিনী এমনকি আমরা বিএনসিসিকেও অন্তর্ভুক্ত করছি, যাতে জনগণ বিশ্বাস করে যে সে ভোট কেন্দ্রে যাবে এবং ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়িতে ফিরবে।’