চুক্তি বাতিলের উদ্যোগের মধ্যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে আদানি

সংবাদ অনলাইন রিপোর্ট

আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে একদিকে ব্রিটিশ একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগ। অন্যদিকে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এসেছে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে ভারতীয় কোম্পানি আদানি পাওয়ার।

দুর্নীতির প্রমাণ ছাড়া সার্বভৌম চুক্তি বাতিল করা যায় না। এ সংক্রান্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ

এই চুক্তির কারণে ২৫ বছর মেয়াদে বাংলাদেশ থেকে ‘এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে’ আদানি: জাতীয় কমিটি

২০২৩ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু। বিগত সময়ে বড় অঙ্কের বকেয়া ছিল। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বকেয়ার অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল আদানি পাওয়ার

পরবর্তী সময়ে বন্ধ না করলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় কোম্পানিটি

এরপর বাংলাদেশের তরফে ‘ধীরে ধীরে’ বকেয়া পরিশোধ করা হয়

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তিতে ‘ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে’- চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই দাবি করে আদানির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করার সুপারিশ করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটি। এতে বলা হয়েছে, এই চুক্তির কারণে ২৫ বছর মেয়াদে বাংলাদেশ থেকে এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে আদানি।

তবে দুর্নীতির প্রমাণ ছাড়া সার্বভৌম চুক্তি বাতিল করা যায় না। এ কারণে তথ্য যাচাই-বাছাই করতে ব্রিটিশ একটি আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যদিও আদানি পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, তারা এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কিছুই জানে না। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কমিটি বা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।

বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি নথির বরাত দিয়ে বুধবার, (২৮ জানুয়ারী ২০২৬), সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি কিলোওয়াট, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৮ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটতে থাকে, যার প্রভাব দুই দেশের বিদ্যুৎ কেনাবেচার বাণিজ্যেও পড়ে।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশে আদানি যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, তার দাম পড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে বকেয়ার অর্থ না পেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুঁশিয়ারি আসে আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে।

পরবর্তী সময়ে বন্ধ না করলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দেয় ভারতীয় কোম্পানিটি। অন্যদিকে বাংলাদেশের তরফে ‘ধীরে ধীরে’ বকেয়া পরিশোধের খবর আসে।

সর্বশেষ গত রোববার ঢাকায় বিদ্যুৎ ভবনে জাতীয় কমিটি সংবাদ সম্মেলন করে আদানির চুক্তি বাতিলের সুপারিশ করলে, আদানি তাৎক্ষণি প্রক্রিয়ায় জানায়, অনেক বকেয়া থাকার পরও তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তারা পরিশোধের অনুরোধ জানায়। অন্যথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রমে জটিলতা তৈরী হবে বলেও ইঙ্গিত আসে ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।

এমন পরিস্থিতিতে বুধবার, আদানির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়ার খবর প্রকাশ করলো রয়টার্স।

২০২৩ সালের শুরুতে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে আদানি। এর মধ্যে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অবনতি ঘটলেও বিদ্যুতের কেনাবেচা বাড়ছে। কূটনেতিক টানাপড়েনের অংশ হিসেবে দুই দেশই ভিসা সেবা স্থগিত করেছে। এমনকি নানা সময়ে একে অপরের কূটনীতিকককে তলব করার ঘটনাও ঘটেছে।

রয়টার্সের বলছে, বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে কয়লা আমদানি ৩৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪ হাজার টনে পৌঁছেছে। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়া এবং এলএনজির সঞ্চালন ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা থাকায় বাংলাদেশ গ্যাস সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের তথ্যানুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন গেল বছর রেকর্ড পরিমাণে কমে দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ৬ শতাংশে। কিন্তু ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক দশকে মোট বিদ্যুতের দুই-তৃতীয়াংশই আসতো গ্যাস থেকে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আদানি পাওয়ার মূলত এই ঘাটতি পূরণ করছে। তারা ২০২৫ সালে বাংলাদেশে রেকর্ড ৮৬৩ কোটি কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, যা মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি থেকে আমদানি সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ লাখ ৯২ হাজার কিলোওয়াট।

এদিকে গত রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা জাতীয় কমিটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে, তাতে বল হয়- ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো সংশোধন করা দরকার। যেসব চুক্তি বেশি রক্তক্ষরণ ঘটায়, সেগুলোর অস্ত্রোপচার দরকার। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ চুক্তি। তাই এটা দিয়ে শুরু করা যায়। এদের ধরতে পারলে অন্যদের সঙ্গে রাষ্ট্রের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।’

এই কমিটি বিগত সরকারের আমলে করা বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতি হলে চুক্তি অনুযায়ী তার দায় নিতে হবে বাংলাদেশকে। ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম যখন ৪ দশমিক ৪৬ সেন্ট ছিল, তখন আদানির সঙ্গে ৮ দশমিক ৬১ সেন্টে চুক্তি করা হয়। দাম নির্ধারণে এক অদ্ভূত সূচক দেয়া আছে চুক্তিতে। এতে আদানিকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৪০-৫০ শতাংশ বেশি দাম দেয়া হচ্ছে। প্রতিবছর আদানি বাড়তি নিচ্ছে ৪০-৫০ কোটি ডলার (৫-৬ হাজার কোটি টাকা)। ২৫ বছর চুক্তির মেয়াদে এক হাজার কোটি ডলার বাড়তি নিয়ে যাবে তারা।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আদানি নিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রামাণ্য-তথ্য পাওয়া গেছে। এ রকম চুক্তি শুধু দুর্নীতির মাধ্যমেই হতে পারে। দুর্নীতির তথ্য আদানিকে জানিয়ে দিয়ে তাদের উত্তর চাওয়া উচিত এবং তারপর দ্রুত সিঙ্গাপুরে চুক্তিসংক্রান্ত সালিসি মামলার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বিলম্ব করলে মামলা আইনি কারণে দুর্বল হয়ে যাবে।

পর্যালোচনা কমিটির সদস্য মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘যেসব তথ্য আছে, তা দিয়ে আদানির চুক্তি বাতিল করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ সরকার হয়তো শেষ সময়ে এটা পারবে না, নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার করতে পারে।’

তবে চুক্তি বাতিলের ক্ষেত্রে দেশের মানুষকে ত্যাগ স্বীকারে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলে মনে করেন মোশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘চুক্তি বাতিলের দিকে গেলে স্বল্প মেয়াদে তারা বিদ্যুৎ বন্ধ করতে পারে। এতে লোডশেডিং হতে পারে। ২৫ বছরের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে মানুষকে এই কষ্ট মেনে নিতে হবে। যে সরকারই আসুক, জনগণকে এক হতে হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্নীতি মামলায় বিশেষজ্ঞ যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তারা আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করছে। দুদকের কাছেও এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতেও আদানিসংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞসহ সবাই একমত, দুর্নীতি ছাড়া এ চুক্তি করা সম্ভব নয়। তবে দুর্নীতির প্রমাণ ছাড়া সার্বভৌম চুক্তি বাতিল করা যায় না।

‘দেশের বাইরে বসে বিদ্যুৎ, কিন্তু ঝুঁকি বাংলাদেশে’ আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এমন শিরোনামে আখ্যায়িত করেছে জাতীয় কমিটি। কমিটি জানায়, স্থান নির্ধারণ, দাম নির্ধারণ ও শর্ত আরোপ এমন তিন খাতে আদানির চুক্তি নিয়ে অনিয়ম বের করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে কক্সবাজারের মহেশখালী ও ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডা আলোচনায় ছিল শুরুতে। কিসের ভিত্তিতে গোড্ডা বাছাই করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই সরকারি নথিতে। ঝাড়খন্ডের কয়লা রপ্তানিতে ব্যবহার করা যায় না। আমদানি করা কয়লায় সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলো।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর অধীন সম্পাদিত চুক্তিসমূহ পর্যালোচনার জন্য ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ওই বছরের নভেম্বরে বিশেষ আইনটি রহিত করা হয়। বিশেষ আইনের অধীন করা বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে কমিটির প্রতিবেদনে।

কমিটি বলে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় থেকে সরাসরি নির্দেশে এসব চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে চুক্তির সঙ্গে জড়িত অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হিসাবে কয়েক মিলিয়ন ডলারের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর লাভ নিশ্চিত করাই ছিল এসব চুক্তির মূল লক্ষ্য।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের পাওয়ার গ্রিডের তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম ২৭ দিনে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ১০ শতাংশ এসেছে আদানির কাছ থেকে।

‘জাতীয়’ : আরও খবর

» বিএমইউ প্রো-ভাইস চ্যান্সেলরের সঙ্গে জাপানের জিচি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের সভা অনুষ্ঠিত

» আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো নির্বাচনী প্রস্তুতি সিলেটে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

» জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও নাগরিকবান্ধব আচরণে গুরুত্বারোপ করেন সেনাপ্রধান

» ডেঙ্গু: আরও ২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি মোট আক্রান্ত ১,০২৫ জন, মৃত্যু ২

» সাংবাদিক আনিস আলমগীর এবার দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার

» ট্রাইব্যুনাল: যাত্রাবাড়ীতে তাইম ‘হত্যা’, হাবিবুরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের শুনানি ২ ফেব্রুয়ারি

» হাদি হত্যা: ফয়সালের ‘ঘনিষ্ঠ সহযোগী’ রুবেল আবারও তিনদিনের রিমান্ডে

» ভারত তাদের কূটনীতিকদের পরিবারের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বাংলাদেশকে জানায়নি: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

সম্প্রতি